রূপক খুব স্বাভাবিক ও অভ্যস্তভাবে বিছানা থেকে নেমে এল। জামা সোয়েটার সব ঝটপট গায়ে চড়িয়ে নিল। তারপর ঘরের দরজার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল।
আমি উত্তেজিত হয়ে ডাকলাম, রূপক! রূপক!
ও ভ্রূক্ষেপও করল না। মনে হল না আমার ডাক শুনতে পেয়েছে। দরজার দিকে তড়িঘড়ি এগোতে গিয়ে রূপক চেয়ারে টেবিলে ধাক্কা খেল–অনেকটা অন্ধ মানুষের মতো। কিন্তু যন্ত্রণা বা বিরক্তির কোনও শব্দ বেরিয়ে এল না ওর মুখ থেকে। পরক্ষণেই আমাকে পাশ কাটিয়ে ও দরজার কাছে পৌঁছে গেল। তারপর ছিটকিনি খুলে দরজা হাট করে সোজা ঘরের বাইরে।
আমি অনন্তকে বৃথাই আরও বারদুয়েক ডাকলাম। তারপর টর্চ আর হকি স্টিক বাগিয়ে ধরে রূপককে অনুসরণ করে ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম।
বাইরে বারান্দায় এসে রূপক জুতো পরে নিল। তারপর সদর দরজা খুলে বেরিয়ে গেল বাড়ির বাইরে।
ওকে অনুসরণ করতে আমার বেশ কষ্ট হচ্ছিল। যেন ভারী বাতাস ঠেলে লড়াই করে এগোতে হচ্ছে। কিন্তু চটি জোড়া পায়ে গলিয়ে চটপট বাইরে আসতেই দমচাপা আবহাওয়াটা যেন একটু হালকা হল।
এপাশ-ওপাশ তাকাতেই রূপককে দেখতে পেলাম। ডানদিকে বাঁক নিয়ে ও বাড়ির পিছনদিকে যাচ্ছে। আধখানা চাঁদের আবছায়া আলোয় ওকে দেখতে তেমন অসুবিধে হচ্ছিল না। কিন্তু যখন ও ফাঁকা জমিতে এসে পড়ল তখন যেন মনে হল একটা কুৎসিত কালো কুয়াশা ওকে ঘিরে রয়েছে। ফলে রূপক অনেকটা অস্পষ্ট হয়ে পড়েছে আমার চোখে।
রূপককে অনুসরণ করে কতক্ষণ পথ চলেছি মনে নেই। অন্ধকার মাঠ, গাছপালা, ডোবা পুকুর, সব পেরিয়ে অবশেষে যেখানে এসে ও থামল, সে-জায়গাটা ঘুটঘুটে অন্ধকার। একপাশে একটা উঁচু পাঁচিল, আর তার গা ঘেঁষে বিশাল বিশাল একজোড়া বটগাছ। তাদের ডালপালা, পাতা, ঝুরি সব মিলে চাঁদের আলোকে রুখে দিয়েছে।
আমি কিছুটা দূরত্ব রেখে রূপককে অনুসরণ করছিলাম। অন্ধকার জায়গাটায় ঢুকে পড়তেই আমি রূপককে আর দেখতে পেলাম না। নিঝুম রাতের কনকনে শীতে আমার হাত-পা কাঁপছিল। মনে হচ্ছিল, হকি স্টিকটা এই বুঝি মুঠো থেকে আলগা হয়ে পড়ে যাবে। নিতান্তই মনের জোরে সামনে এগিয়ে চললাম।
এদিকটায় কোনও বসতি নেই। সামনে উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা যে-পুরোনো আমলের বাড়িটা দেখতে পাচ্ছি সেটা বোধহয় পরিত্যক্ত। হয়তো কোনওকালের রাজবাড়ি কি জমিদারবাড়ি হবে। আর একটু এগোতেই অন্ধকার এবং পাঁচিল বাড়িটাকে সম্পূর্ণ আড়াল করে দিল। তারপরই একটা উৎকট দুর্গন্ধ আমার নাকে এল।
গাঢ় অন্ধকারের ভিতরে পুরোপুরি ঢুকে পড়তেই একটা খসখস শব্দ আমার কানে এল। তরপরই ঝটপটানির শব্দ এবং কয়েকটা চাপা কর্কশ চিৎকার। আমি টর্চ জ্বেলে ওঠার আগেই হুটোপুটি আরও বেড়ে গেল, বেড়ে উঠল চিৎকার।
টর্চ জ্বালতেই এক অদ্ভুত দৃশ্য চোখে পড়ল।
প্রকাণ্ড মাপের চার-পাঁচটা শকুন জোড়া-বটগাছের গুঁড়ির কাছে রূপককে ঘিরে ঝটপটিয়ে বেড়াচ্ছে। আঁধারকানা হয়ে শকুনগুলো ছেলেটাকে আঁচড়াচ্ছে, ঠোকরাচ্ছে, বিশাল ডানা ঝাঁপটে কর্কশ চিৎকার করছে। কিন্তু ছেলেটার সেসব দিকে কোনও ভ্রূক্ষেপ নেই। যেন শকুনগুলোর কোনও অস্তিত্বই ও টের পায়নি। ও একমনে বটগাছের গুঁড়ির কাছে এখানে-ওখানে বিক্ষিপ্তভাবে মাটি খুঁড়তে চেষ্টা করছে। মনে হচ্ছে, লুকোনো কিছু যেন মরিয়া হয়ে খুঁজছে।
টর্চের আলো একটু বাঁদিকে ঘোরাতেই দুর্গন্ধের উৎসটাও খুঁজে পেলাম। মৃত পশুর একটা ভাগাড়। শেয়াল-শকুনে খুবলে খাওয়া গলিত শবদেহের নরক। কয়েকটা কালো শকুন সেখানে বসে আছে। উশখুশ করছে।
আমি হাতের টর্চটা জুলন্ত অবস্থাতেই মাটিতে রাখলাম। তারপর হকি স্টিক নিয়ে এগিয়ে গেলাম আচ্ছন্ন রূপককে শকুনের হিংস্র নখের আঁচড়ের হাত থেকে বাঁচাতে। ও তখনও বটগাছের গোড়ায় মাটি খোঁড়ার চেষ্টা করছে।
আমি বারকয়েক এলোপাতাড়ি স্টিক চালাতেই শকুনগুলো তীব্র চিৎকার করে সরে গেল তফাতে। আমার গায়ের শালটা খুলে পড়ে গেল। আমি তখনও ক্ষিপ্তের মতো হকি স্টিক চালাচ্ছি। কনকনে শীতের অনুভূতি মুহূর্তেই যেন উবে গেছে।
রূপকের নাম ধরে কয়েকবার ডাকলাম। ও শুনতেই পেল না। তখন ঝুঁকে পড়ে ওর হাত ধরে এক হ্যাঁচকা টান মারলাম। কিন্তু ও ঝটকা দিয়ে আমার হাত ছাড়িয়ে নিল। আবার মাটি খুঁড়তে লাগল।
শকুনগুলো আবার ধেয়ে এসেছে আমাদের কাছে। ঠোঁট নখে আক্রমণ করতে চেষ্টা করছে। ওদের শরীরের বিশ্রী গন্ধে যেন বমি পেয়ে যাবে এখুনি। আমি স্টিক ঘুরিয়ে আবার ওদের হটিয়ে দিলাম। তারপর রূপকের হাত ধরে প্রাণপণে টান মারলাম। ও বাধা দিতে চেষ্টা করল। টের পেলাম, রোগা ছেলেটার শরীরে কী অস্বাভাবিক ক্ষমতা! যেন অলৌকিক কোনও শক্তি ভর করেছে। তবে আমি হাল ছাড়লাম না। ওর সঙ্গে ধস্তাধস্তি চালিয়ে গেলাম পুরোদমে। ওকে ঘিরে থাকা একটা রহস্যময় কুয়াশা আমার এই আক্রমণে অস্থিরভাবে পাক খেতে লাগল। একটা বুনো গন্ধ নাকে আসছিল–আমার চেতনা অবশ করে দিতে চাইছিল যেন। আমি লড়াই করে চললাম–শরীর ও মনের লড়াই।
হঠাৎই কুয়াশাটা কেটে গেল। মনের চাপটাও হালকা হয়ে গেল একইসঙ্গে। দড়ি টানাটানির খেলায় আচমকা কেউ যেন অন্য প্রান্তের মুঠো আলগা করে দিয়েছে।
রূপকের প্রতিরোধ শিথিল হয়ে এল। ওকে টেনে দাঁড় করিয়ে ছুটতে চেষ্টা করলাম। হকি স্টিক ফেলে রেখে জ্বলন্ত টর্চটা তুলে নিলাম। টর্চের আলোর তেজ কিছুটা কমে এলেও একেবারে অকেজো হয়ে যায়নি। কোথা থেকে দু-টুকরো ছেঁড়া মেঘ এসে চাঁদকে আড়াল করে দিয়েছে। ফলে ফেরার পথে টর্চের আলো কাজে লাগল। ঘোলাটে অন্ধকারে দ্রুত পা ফেলে আমরা ফিরে চললাম। রূপকের মুখে কোনও কথা নেই। যন্ত্রের মতো আমার পাশে পাশে পা চালিয়ে চলেছে। শকুনগুলোর ডানা ঝাপটানির শব্দ এখন কানে আসছে না বটে, তবে তাদের কর্কশ ডাকের বিক্ষিপ্ত অংশ এখনও শোনা যাচ্ছে।
