রূপক বলল, না।
তারপর একটু চুপ করে থেকে আমার দিকে তাকিয়ে ও প্রশ্ন করল, মোহনদা, তোমরা ওটাকে ধরতে পারবে তো?
আমি অবাক হয়ে বললাম, কাকে?
রূপক চোখ বড় বড় করে বলল, ওই কালো ভ্যাম্পায়ারটাকে। যেটা মাঝরাতে এসে আমার গায়ে আঁচড় কেটে রক্ত খেয়ে যায়।
–এসব কথা তোমাকে কে বলেছে?
–ইস্কুলের বন্ধুরা। গল্পের বইয়ে নাকি এরকম লেখা আছে।
আমার খুব কষ্ট হল। ক্লাস টেনের ছেলে, কিন্তু মনটা এখনও অনেক কচি কাঁচাও বলা যায়।
আমি ওর কাছে গিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে বললাম, ওসব বাজে কথা। তুমি ঘুমিয়ে পড়ো। আমি আর অনন্তদা তোমার অসুখ সারিয়ে দেব। কোনও ভয় নেই। কাল থেকে তোমার গায়ে কেউ আর আঁচড় কাটবে না।
রূপক আশ্বস্ত হয়ে চোখ বুজল। কিন্তু আমার কথাগুলো নিজের কানেই কেমন ফাঁকা আওয়াজের মতো শোনাল। নিমাইবাবু তিনটে কথা আমাকে বলেছিলেন ও সমবুলিজম, হিপনোটিজিম আর মেসমেরিজম। কেন যেন মনে হচ্ছে এর মধ্যেই কোথাও রহস্যের সূত্র লুকিয়ে আছে। এর ওপর ভিত্তি করে একটা থিয়োরিও আমি খাড়া করেছি।
পাশের ঘরের দেওয়াল-ঘড়িতে ছমছমে শব্দ করে রাত এগারোটা বাজল। রূপক পাশ ফিরে গুটিশুটি মেরে শুল। মনে হল ঘুম আসতে ওর দেরি হবে না। আমি এপাশ-ওপাশ তাকিয়ে একটা লাঠি জাতীয় অস্ত্র খুঁজছিলাম, হঠাৎই চোখ গেল রূপকের পড়ার টেবিলের পিছনে। দেওয়ালের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড় করানো রয়েছে একটা হকি স্টিক। এগিয়ে গিয়ে সেটা বের করে নিলাম। বেশ মজবুত। অনন্ত প্রশ্ন ভরা চোখে আমাকে লক্ষ করছিল। তাই হেসে ছোট্ট করে বললাম, সাবধানের মার নেই।
অনন্ত বলল, আমাদের যেমন করে তোক জেগে থাকতেই হবে, মোহনদা। হঠাৎ করে ঘুমে ঢলে পড়লে চলবে না।
আমি বললাম, নিশ্চিন্ত থাকো, সে ভয় নেই। আমি দরজার কাছে চেয়ার নিয়ে বসছি। তুমি বিছানায় থাকবে। নাও, এবারে আলো নিভিয়ে দাও।
অনন্ত উঠে গিয়ে সুইচ টিপে আলো নিভিয়ে দিল। ঝুপ করে অন্ধকার লাফিয়ে নেমে এল ঘরে। শরীরের প্রতিটি স্নায়ু উল্কণ্ঠা ও উত্তেজনায় টানটান। অপেক্ষা করছি কোনও ভয়ংকর ঘটনার জন্য। তবে কী সে ঘটনা তা জানি না। আর আজ রাতে সে-ঘটনা ঘটবে কি না তা-ও জানি না। কিন্তু তবুও সজাগ থাকতেই হবে। নিষ্পাপ ছেলেটাকে বাঁচাতেই হবে এই নিষ্ঠুর অভিশাপ থেকে।
অন্ধকার ভেদ করে রূপকের লেপে মোড়া দেহটা অস্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। অনন্তর চেহারাও খানিকটা বোঝা যাচ্ছে। জানলার কাচের শার্সির ওপিঠে শীতের রাত ঘুটঘুটে অন্ধকার। গাছপালা আকাশ কিছুই প্রায় চেনা যাচ্ছে না। খুব ভালো করে নজর করলে কয়েকটা তারার ফুটকি শুধু চোখে পড়ে। মাঝে-মাঝে ভেসে আসছে রাতপাখির ডাক আর শেয়ালের আর্তকান্না।
অপেক্ষায় কতক্ষণ কেটে গেছে জানি না, হঠাৎই একটা অদ্ভুত তন্দ্রার আমেজ আমার কাঁধে চেপে বসল। চোখের পাতা হঠাৎই হয়ে উঠল লোহার মতো ভারী, আর মনটা যেন পলকে কুয়াশা মোড়া ঝাপসা হয়ে গেল। কিন্তু তখনও স্পষ্ট অনুভব করতে পারছি, একটা গাঢ় থমথমে বাতাস যেন ঘরের ভিতরে জাঁকিয়ে বসছে। ঠিক ফুটবলে পাম্প করা বাতাসের মতো ঘরের বাতাসের চাপ বাড়ছে…ক্রমেই বাড়ছে। চোখ বুজে আসতে চাইছে। আর নাম-না-জানা এক বুনো গন্ধ নাকে ঢুকে পড়ে সমস্ত চেতনাকে যেন অবশ করে দিচ্ছে।
আমি এক ঝটকায় চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম। হকি স্টিকটাকে শব্দ করে মেঝেতে ঠুকলাম একবার। কিন্তু কোনও অলৌকিক বাতাস যেন আমার শরীরের সমস্ত শক্তি ক্রমশ শুষে নিচ্ছে। আর কতক্ষণ আমি দুপায়ে খাড়া থাকতে পারব জানি না। প্রাণপণ চেষ্টায় হকি স্টিকটা মেঝেতে আবার ঠুকলাম। এপাশ-ওপাশ ঝটকা মেরে মাথা ঝাঁকিয়ে ডেকে উঠলাম, অনন্ত! অনন্ত!…তার পর পকেট থেকে টর্চ বের করে খাট লক্ষ্য করে বোতাম টিপলাম।
কোনও উত্তর নেই। অনন্ত আর রূপক দুজনেই ঘুমে অসাড়। টর্চ নিভিয়ে দিলাম।
বন্ধ কাচের জানলার বাইরে রাতের চেয়েও গাঢ় অন্ধকার কোনও ছায়া যেন নেমে এসেছে। ঘিরে ধরেছে নিমাই সরকারের ছোট্ট বাড়িটাকে।
আমার ইচ্ছাশক্তির সঙ্গে অন্য কারও ইচ্ছাশক্তির প্রচণ্ড লড়াই চলছিল। আড়ালে থেকে কেউ যেন শুষে নিতে চাইছে আমার মনের জোর, মনের সমস্ত প্রতিরোধ। আমি আবার চিৎকার করে অনন্তর নাম ধরে ডেকে উঠলাম।
কোনও সাড়া নেই। তবে রূপক ঘুমের ঘোরেই জড়ানো গলায় কী যেন বলে উঠল।
এবারে স্পষ্ট বুঝলাম, আড়ালে অদৃশ্য থেকে কেউ আমাদের সম্মোহিত করতে চাইছে! কে সে? কোন সম্মোহন-বিশারদ?
প্রাণপণ জেদ আর প্রতিজ্ঞায় নিজেকে সচেতন রাখলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার তন্দ্রার ভাবটা কেটে গেল। বুঝলাম, লড়াইয়ে জিতে গেছি। কিন্তু তখনও মাথাটা সামান্য ঝিমঝিম করছিল।
বিনোদ বলেছিল রাত-বিরেতে কোনও দরকার পড়লেই ডাকতে। অতএব বেশ চিৎকার করেই বিনোদ এবং নিমাইবাবুর নাম ধরে কয়েকবার ডাকলাম। ফল যা আশা করেছিলাম তাই হল : কোনও সাড়া নেই।
ঠিক কী যে ঘটতে চলেছে সেটা স্পষ্ট বুঝে উঠতে না পারায় কিছুটা দিশেহারা হয়ে পড়েছিলাম। আবার টর্চ জ্বেলে অন্ধকার ঘরের নানান কোণে সতর্কভাবে নজর করে দেখলাম। ভাবলাম, ঘরের আলোটা জ্বেলে দিই, কিন্তু কাজে তা করে ওঠার আগেই দেখি এক ঝটকায় লেপ সরিয়ে রূপক বিছানায় উঠে বসেছে। সঙ্গে সঙ্গে টর্চ নিভিয়ে দিলাম। হকি স্টিকটা শক্ত মুঠোয় চেপে ধরে ওকে লক্ষ করতে লাগলাম।
