আমি জিগ্যেস করলাম, রূপককে ডাক্তার দেখিয়েছেন?
ক্লান্তভাবে নিমাই সরকার বললেন, হ্যাঁ, এমনিতেই তো আঁচড়ের জন্যে টেট ভ্যাক ইঞ্জেকশান দিতে হয়েছে। তা ছাড়া একজন সাইকিয়াট্রিস্ট-এর সঙ্গেও কথা বলেছি। ভদ্রলোক কৃষ্ণনগরে বসেন। উনি সব শুনে-টুনে বেশ ঘাবড়ে গেলেন। তারপর বললেন, ঘুমের ঘোরে ও নিজেই নিজের হাতে মুখে আঁচড় কাটে না তো! তখন আমি বলেছি, না, কারণ আঁচড়গুলো বেশ সূক্ষ্ম–অনেকটা সুতোর মতো। মানুষের নখে হওয়ার কথা নয়। পরে আমি এক সকালে রুপুর নখ পরীক্ষা করে দেখেছি। সেখানে ছাল-চামড়া বা রক্তের কোনও চিহ্ন দেখিনি।
নিমাই সরকার হতাশার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, এই ঘটনার যুক্তিসঙ্গত কোনও ব্যাখ্যা খুঁজে না পেয়ে সাইকিয়াট্রিস্ট ভদ্রলোক আমাকে সমনামবুলিজম, হিপনোটিজম, মেসমেরিজম, এইসব ভারী-ভারী শব্দ শুনিয়েছিলেন। তার মধ্যে হিপনোটিজম শব্দটাই আমার যা একটু চেনা। তখন হিপনোটিজম নিয়ে কয়েকদিন বেশ পড়াশোনা করলাম, কিন্তু রহস্যের কিনারা করতে পারলাম না। পরে আমার স্ত্রী কমলাকে হিপনোটিজম-এর কথা বলতেই সে আপনার কথা আমাকে বলল। পোস্টার না হোর্ডিং কিসে যেন সে দেখেছে আপনি রানাঘটে আসছেন সাতদিনের শো করতে। এমনিতে আমরা তো খুবই ভেঙে পড়েছিলাম, তা ছাড়া পাড়া-প্রতিবেশী বন্ধুবান্ধবদের নানারকম উপদেশ আর পরামর্শে আমি কীরকম যেন বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছিলাম। ফলে কমলার কথাটা বেশ মনে ধরল…।
ডানদিকের একটা পুকুরে চাঁদের ছায়া পড়েছিল। সেদিকে এক পলক চোখ রেখেছিলাম। হঠাৎই টের পেলাম নিমাইবাবুর কর্কশ হাতের চেটো আমার হাতের ওপরে। তিনি চাপা গলায় বললেন, এখন আপনিই আমাদের শেষ ভরসা, মোহনবাবু!
তারপর একটু থেমে গলার স্বর স্বাভাবিক করে আবার বললেন, আমরা এসে গেছি।
চোখে পড়ল, সামনে খানিকটা ফাঁকা জমিতে একটা একতলা বাড়ি। তার থেকে বেশ কিছুটা দূরে দু-চারটে একই ঢঙের বাড়ি দাঁড়িয়ে। তারও ওপিঠে কয়েকটা আলোর বিন্দু, গাছগাছালি, আর অন্ধকার।
রিকশা থেকে নেমে নিমাইবাবুর বাড়িতে ঢোকামাত্রই আমার কেমন শীত শীত করে উঠল।
.
পরিচয় এবং খাওয়াদাওয়ার পালা শেষ করে আমি আর অনন্ত রূপকের শোবার ঘরে এলাম। ও তখন পড়াশোনা শেষ করে সবে লেপ মুড়ি দিয়ে শুয়েছে। বিনোদ একপাশে একটা চেয়ারে বসে একটা বই পড়ছিল। আমাদের ঢুকতে দেখেই উঠে দাঁড়াল। ওর হাতে একটা টর্চ ছিল। সেটা আমাকে দিয়ে মলিন হেসে বলল, এটা রাখুন। একটু থেমে আবার বলল, আমি তা হলে যাই। রাত-বিরেতে কোনও দরকার পড়লেই ডাকবেন কিন্তু।
লক্ষ করলাম, বাইশ-তেইশ বছরের যুবকটিকে এখনই কেমন বুড়োটে দেখাচ্ছে। নিমাইবাবু আমাদের পিছনে-পিছনে ছেলেদের শোওয়ার ঘরের দরজা পর্যন্ত এসেছিলেন। চাপা গলায় আয় বিনু বলে বিনোদকে ডেকে নিলেন।
ওঁরা চলে যেতেই টর্চটা পকেটে রেখে আমি চটপট দরজা বন্ধ করে দিলাম। শুধু-শুধু দেরি করে লাভ নেই। অনন্ত তখন ঘরের প্রতিটি ইঞ্চি খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে দেখছে। আর রূপক শুয়ে-শুয়েই কৌতূহলী চোখে আমাদের দুজনের দিকে তাকিয়ে।
বাড়িতে এসে কমলাদেবীর সঙ্গে আলাপ হয়েছে। ভদ্রমহিলা যে ভীষণ ভেঙে পড়েছেন তাতে সন্দেহ নেই। রূপকের কথা বলতে গিয়ে কেঁদে ফেলছিলেন বারবার। বড় ভাই বিনোদ খুব কম কথা বলছিল। ছোট ভাইকে সুস্থ করতে না পারার গ্লানি বোধহয় ওকে ভিতরে ভিতরে কষ্ট দিচ্ছিল।
রূপককে সেই তুলনায় বেশ হাসিখুশি দেখছি। মা-বাবা-দাদার মনমরা ভাব ওকে সে সামান্য অবাক করেছে তা-ও ওর অভিব্যক্তিতে স্পষ্ট ছিল। প্রথম পরিচয়ের সুযোগেই ওর সঙ্গে বেশ আলাপ জমিয়ে নিয়েছি। এমনকী দু-চারটে চটজলদি ম্যাজিক দেখিয়ে ওকে একেবারে তাক লাগিয়ে দিয়েছি। বলেছি, চলে যাওয়ার আগে অনেক ম্যাজিক ওকে শিখিয়ে দিয়ে যাব। অনন্তও ম্যাজিকের নানান গল্প করে ওর সঙ্গে বেশ বন্ধুত্ব করে ফেলেছে। খেতে বসে লক্ষ করছিলাম, ওরা একমনে গল্প করে চলেছে, আর মাঝে-মাঝেই হেসে উঠছে একসঙ্গে।
আমি রূপকের কৌতূহলে ভরা মিষ্টি মুখটা দেখলাম। অলৌকিক আঁচড়ের চিহ্নগুলো এক নিষ্ঠুর ছবি এঁকে দিয়েছে সেখানে। তবে কোনও আঁচড় থেকেই ঘা হয়নি। নিমাইবাবুর কাছে শুনেছি, ওকে নিয়মিত অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ানো হচ্ছে। তা ছাড়া টেট ভ্যাক ইঞ্জেশান তো নেওয়াই রয়েছে। সেইজন্যেই জ্বালাযন্ত্রণা থেকে রেহাই পেয়েছে বেচারা।
অনন্তকে বললাম, ঘরের সব জানলা ভালো করে বন্ধ করে ছিটকিনি এঁটে দাও।
অনন্ত কোনও প্রশ্ন না করে কাজে লেগে গেল। আমি ঘরের ভিতরে অনুসন্ধানী চোখ বুলিয়ে নিলাম। একটা ডবল বেড খাট-রূপক আর বিনোদের জন্যে। একজোড়া চেয়ার, একটা টেবিল, টেবিলের পাশে দেওয়ালের তাকে রূপকের বই-খাতা, টেবিলেও তার কিছু কিছু ছড়ানো। দেওয়ালে দুটো ক্যালেন্ডার–দুটোই ওষুধ কোম্পানির। একটা দেওয়াল-আয়না, তাছাড়া দুর্গা ও সরস্বতীর ফটো ফ্রেমে বাঁধানো। খাটের তলায় দুটো ট্রাঙ্ক আর একটা বেতের মোড়া।
ঘরে মোট চারটে জানলা, একটা দরজা, আর দুটো ঘুলঘুলি। ঘুলঘুলির ফাঁকগুলো খুব ছোট যেমনটি নিমাইবাবু বলেছিলেন।
আমার কথায় চারটে জানলার কাচের পাল্লাই অনন্ত ঠিকঠাক এঁটে দিল। তারপর খাটের ওপরে গিয়ে বসল। রূপককে জিগ্যেস করল, ভয় করছে?
