নিমাই সরকার সিগারেট বের করে আমাকে দিলেন, নিজে একটা ঠোঁটে রাখলেন। তারপর দেশলাই জ্বেলে দুটো সিগারেটে আগুন ধরিয়ে একমুখ ধোঁয়া ছাড়লেন। ধীরে-ধীরে বললেন, মোহনবাবু, মাত্র মাসখানেক হল আমি কৃষ্ণনগরে বদলি হয়ে এসেছি। সেখানে ঘর পেতে অসুবিধে হচ্ছিল, তখন পরিচিত একজন গাঙনাপুরে একটা বাড়ির সন্ধান দেয়। বেশ সস্তায়। ফলে রাজি হয়ে গেলাম। সেখানে থেকেই কৃষ্ণনগরে ডেইলি প্যাসেঞ্জারি করি। আমার বাড়িটা একতলা। গুটি তিনেক ঘর, বাথরুম, রান্নাঘর, আর ছোট্ট এক টুকরো বাগান মতো আছে পিছনদিকে। আমার সংসার ছোট। স্ত্রী আর দুই ছেলে। বড় ছেলে বিনোদ একটা ওষুধ কোম্পানির সেলসম্যান, আর ছোট ছেলে রূপক ক্লাস টেন-এ পড়ে। আমি বদলি হওয়ায় ও একমাস হল রানাঘাট হাই স্কুলে পড়ছে। আগে আমরা কলকাতায় ছিলাম। তখন ও হিন্দু স্কুলে পড়ত। পড়াশোনায় বেশ ভালো। তবে দিন পনেরো হল ওকে নিয়েই গোলমালটা শুরু হয়েছে।
রিকশা গতি নিয়েছে। শীতের বাতাস গায়ে বিঁধছে ছুঁচের মতো। আকাশে আধখানা চাঁদ আর কুচি কুচি তারা। আমি নিমাইবাবুর দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম। আমার আগ্রহ ক্রমশ বাড়ছিল।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে উনি আবার বলতে শুরু করলেন ও রূপকের একটা বদ অভ্যেস আছে। ও ঘুমের মধ্যে প্রায়ই কথা বলে। কিন্তু সে-কথার মাথামুন্ডু কিছুই বোঝা যায় না। তা ছাড়া মাঝে-মাঝে ও কোনও-কোনও কাজ করে যা পরে ওর একদম মনে থাকে না। বেমালুম ভুলে যায়। অথচ পড়াশোনার ক্ষেত্রে এরকম ভুল ওর হয় না। যাই হোক, এ নিয়ে আমরা তেমন দুশ্চিন্তায় পড়িনি। ভেবেছি, বড় হলে সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু দিন পনেরো আগে একটা ঘটনা আমাদের সবাইকে ভয় পাইয়ে দিল।
নিমাইবাবু সিগারেটে গভীর টান দিলেন। একটা ছোট কাশি সামলে নিয়ে বললেন, বিনোদ প্রায় দিন কুড়ি আগে কোম্পানির কাজে ট্যুরে গিয়েছিল। ও থাকলে দু-ভাই একসঙ্গেই শোয়। বিনোদ চলে যাওয়ার পর রূপক একাই শুতে চাইল। ওর মা-কে স্পষ্ট জানিয়ে দিল, একা শুতে ওর একটুও ভয় করে না। আমরাও আর জোর করিনি। কিন্তু দিন পনেরো আগে, একটু আগে যা বলছিলাম, দেখি ঘুম থেকে উঠে রুপু খুব খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে আয়নায় মুখ দেখছে। একটু পরে ও আমার কাছে এসে বলল ভালো করে ওর মুখটা দেখতে। ছেলেটা কেমন যেন দিশেহারা হয়ে গিয়েছিল। একটু ভয়ও পেয়েছিল বোধহয়…।
আমি আর থাকতে না পেরে জিগ্যেস করলাম, কী কী দেখলেন ওর মুখে?
সামনের আঁধারি পথের দিকে চোখ রেখে ক্লান্ত স্বরে নিমাইবাবু বললেন, ছোট-ছোট কয়েকটা আঁচড়ের দাগ। দেখে নখের আঁচড় বলেই মনে হল। ধারালো নখের সূক্ষ্ম আঁচড়।
নিমাইবাবু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। আমাদের রিকশা এখন চূর্ণি নদীর ব্রিজের ওপর দিয়ে চলেছে। আমি গায়ের শালটাকে আরও ভালো করে জড়িয়ে নিলাম। হাতের সিগারেটে শেষ টান দিয়ে টুকরোটা ছুঁড়ে ফেলে দিলাম। বললাম, তারপর?
তারপর আর কী! পরদিনও আবার সেই নখের আঁচড়! মুখে আর হাতে। লক্ষ করলাম, দু-এক জায়গায় বিন্দু বিন্দু রক্তও জমাট বেঁধে রয়েছে। অথচ রুপু এর বিন্দুবিসর্গও কিছু জানে না। মোহনবাবু, এদিকটা বেশ খোলামেলা জায়গা, গাছগাছালিও কম নয়। সুতরাং নানা জাতের পাখিও অনেক আছে। আমি ভেবেছি, রাত-বিরেতে আঁধারকানা কোনও পাখি হয়তো জানলা-টানলা দিয়ে ঢুকে পড়েছে রূপকের শোওয়ার ঘরে। তারপর অন্ধকারে দিশেহারা হয়ে ঘরময় উড়ে বেড়িয়েছে, আর তখনই রুপুর হাতে-মুখে তার নখের আঁচড় লেগেছে। রুপু হয়তো অঘোরে ঘুমোচ্ছিল, তাই টের পায়নি। পরে পাখিটা জানলা দিয়েই কোনওরকমে আবার উড়ে বেরিয়ে গেছে। তবে একটা কথা, এরকম সন্দেহ আমার হয়েছিল বটে, কিন্তু পাখির ওড়াউড়ির জন্যে ঘরের কোনও জিনিস ওলটপালট অবস্থায় দেখিনি। সে যাই হোক, তৃতীয় রাতে রুপুকে সব জানলা-দরজা ভালো করে ছিটকিনি এঁটে ঘুমোতে বললাম। কিন্তু পরদিনও একই ব্যাপার। বরং আঁচড়ের চিহ্ন যেন আরও বেশি।
ঘরে ঘুলঘুলি আছে? আমি নিমাইবাবুকে বাধা দিয়ে প্রশ্ন করলাম।
–আছে, তবে সেগুলো সিমেন্টের ঢালাই করা। একটা চড়ুই পাখিও গলতে পারে না।
–তারপর?
–তারপর আর কী! একদিন দু-দিন ছাড়া-ছাড়া ওই একই ব্যাপার। আমি ওর সঙ্গে রাতে শুয়ে দেখেছি, কিন্তু কিচ্ছু টের পাইনি। ওর মা শুয়েছে, কিন্তু আঁচড়ের চিহ্ন ঠেকাতে পারেনি। বিনোদ দিন চারেক আগে ফিরে এসে সব শুনেছে। শুনে সারা রাত্তির জেগে ছোটভাইকে পাহারা দেওয়ার চেষ্টা করেছে, কিন্তু মাঝরাতে আচমকাই ও ঘুমের ঘোরে ঢলে পড়েছে। ঘুম ভেঙেছে সেই সকালে। রূপকের হাতে-মুখে তখন নতুন নখের আঁচড় পড়েছে। আমি আর আমার স্ত্রীও রাত জেগে রুপুকে পাহারা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু আমাদের অবস্থাও হয়েছে ঠিক বিনোদের মতো। হঠাৎই যেন গাঢ় ঘুমে তলিয়ে গেছি।
চূর্ণি নদী পেরিয়ে গাঙনাপুরে কিছুটা ঢুকে পড়েছি। পিছনে তাকিয়ে অনন্তর রিকশাটাকে একবার দেখে নিলাম। নিমাইবাবু পুরোনো সিগারেট শেষ করে নতুন একটা ধরিয়েছেন। তাতে কয়েকটা টান দিয়ে আমার দিকে তাকালেন। আলো-আঁধারির মধ্যেও তাঁর চোখ স্পষ্ট দেখতে পেলাম। তিনি যেন নীরবে আমাকে অনুনয় করে বলছেন, মোহনবাবু, কিছু বলুন।
