ভদ্রলোকের পরনে ছাই রঙের ঢোলা ফুলপ্যান্ট। গায়ে ঢোলা একটা হাতকাটা বাদামি সোয়েটার। আর গলায় হলদেকালো চেক চেক কম্বল মাফলার। এককালে বোধহয় স্বাস্থ্য ভালো ছিল, এখন ভেঙে গিয়ে পোশাকগুলো ঢিলেঢালা হয়ে গেছে।
ভদ্রলোকের চোখের দিকে তাকালে বয়েস পঞ্চাশের এপিঠে বলে মনে হয়, কিন্তু তার ভাঙা গাল, খোঁচা খোঁচা দাড়ি, চোখের নীচে কালি, এসব দেখামাত্রই বয়েসটা একলাফে ষাটের ওপিঠে চলে যেতে চায়।
টুলে বসে ভদ্রলোক গ্রিনরুমটা জরিপ করছিলেন। নানারকম জিনিসে ছোট্ট ঘরটা একেবারে জবরজং। পোশাক, টুল, কাঠের বাক্স, রঙিন ফিতে, বিচিত্র আসবাব, মুখোশ, পাখির খাঁচা, আরও কত কী! ভদ্রলোক বোধহয় কোনও ছোটখাটো জাদুকরের গ্রিনরুমে কখনও ঢোকেননি।
মিছিমিছি সময় বয়ে যাচ্ছিল দেখে শেষ পর্যন্ত আমিই মুখ খুললাম, বলুন, কী দরকার?
ভদ্রলোকের কপালে ভাঁজ পড়েছিল দুশ্চিন্তায়। আমার দিকে ফিরে কপাল সাফ করে হাসতে চেষ্টা করলেন। বললেন, মোহনবাবু, আমার নাম নিমাইচন্দ্র সরকার। চূর্ণি নদী পেরিয়ে গাঙনাপুরে আমি থাকি। এই সাতদিনে সাতবার আমি আপনার ম্যাজিক দেখেছি। দেখে মনে হয়েছে আপনিই আমাকে বাঁচাতে পারবেন, আমার ছেলেকে বাঁচাতে পারবেন।
আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। সব কিছু গুলিয়ে যাচ্ছিল। সাতবার আমার ম্যাজিক দেখে নিমাইবাবুর মনে হয়েছে আমি ওঁকে, ওঁর ছেলেকে বাঁচাতে পারি! ভদ্রলোক বলছেন কী! ওঁর মাথার গোলমাল হয়নি তো!
কিন্তু আমি কিছু বলে ওঠার আগেই ঠিক আমার মনের কথাটি পড়ে নিয়ে তিনি বললেন, মোহনবাবু, আমি পাগল নই। তবে মরিয়া মানুষ বোধহয় পাগলের মতোই আচরণ করে। আপনার ভাসমান তরুণীর খেলা দেখে আমি বুঝেছি আপনি সত্যি-সত্যি হিপনোটিজম জানেন। আর যে ভয়ানক বিপদে আমি পড়েছি তাতে হিপনোটিজম জানা কোনও বিশেষজ্ঞ ছাড়া বোধহয় আমার গতি নেই। অবশ্য তাতেও যদি সমস্যার সমাধান না হয় তা হলে ধরে নেব গোটা ব্যাপারটা অলৌকিক, ভূতপ্রেতের নিষ্ঠুর খেলা।
ভাসমান তরুণীর খেলায় আমি একজন পঙ্গু যুবতাঁকে সম্মোহিত করে শূন্যে ভাসিয়ে দিই। তারপর তার শরীরের ওপরে বিভিন্ন মুদ্রায় হাত চালিয়ে তাকে সম্পূর্ণ সুস্থ করে তুলি। বলা বাহুল্য, তরুণীটি মোটেই পঙ্গু নয়, আর পুরো ব্যাপারটাই স্রেফ ম্যাজিকের কৌশল। তবে আলোছায়াময় পরিবেশে অনন্তর দক্ষ পরিচালনায় আর আমার নিখুঁত উপস্থাপনায় ওই ম্যাজিকটা সব দর্শকদের একেবার মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখে। ম্যাজিকটা শেষ হলে সকলে যেন স্বপ্ন ভেঙে চেতনা ফিরে পায়।
নিমাইবাবু বললেন, মেয়েটিকে মঞ্চের ওপরে হিপনোটাইজ করার সময়ে আমি আপনার হাত চালানোর ভঙ্গি প্রতিদিনই খুব খুঁটিয়ে লক্ষ করেছি। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আপনি হিপনোটিজম জানেন..ভালোরকমই জানেন। দয়া করে অস্বীকার করবেন না। আমাকে আপনি বাঁচান, প্লিজ, মোহনবাবু।
ভদ্রলোক সোজা উঠে এসে আমার দু-হাত চেপে ধরলেন। ঝুঁকে পড়ে আর্ত অনুনয়ের সুরে বললেন, আমার যথাসাধ্য আপনাকে আমি দেব। দয়া করে এই হতভাগা বাপটাকে নিরাশ করবেন না।
আমি খুব দোটানায় পড়ে গেলাম।
মঞ্চের ব্যাপারটা অভিনয় হলেও হিপনোটিজম যে আমি জানি না তা নয়। অনেকের মতে বেশ ভালোই জানি। আর সেইসঙ্গে পড়তে শুরু করেছি সম্মোহনবিদ্যাসংক্রান্ত নানান বইপত্র। বহু দেশি-বিদেশি বই গুলে খেয়েছি, অভ্যাস করেছি দিনরাত, পরিশ্রম করেছি প্রাণপাত। এ পর্যন্ত সম্মোহন বা জাদুবিদ্যা কতখানি আয়ত্ত করতে পেরেছি জানি না, তবে জাদুকর মোহনকুমারের নাম পশ্চিমবাংলার লোকের কাছে এখন আর একেবারে অজানা নয়।
কিন্তু কাল ভোরেই যে সদলবলে আমাকে কৃষ্ণনগরে রওনা হতে হবে। আবার নিমাইবাবুর সমস্যাটা শুনতেও কৌতূহল হচ্ছে খুব। ভদ্রলোক এখনও আমার হাত দুটো আঁকড়ে ধরে রয়েছেন।
আমি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললাম, আপনি এখানে বসুন। আমি একটু কথা বলে দেখি–
বেরিয়ে এসে দ্বিতীয় বড় গ্রিনরুমটায় অনন্তকে খুঁজে পেলাম। ওকে একপাশে ডেকে নিয়ে সংক্ষেপে সব জানালাম। ও খুব অবাক হয়ে গেল। চোখে-মুখে কৌতূহল ফুটে উঠল। আমি বললাম, অনন্ত, তুমি আর সবাইকে সবকিছু বুঝিয়ে-সুঝিয়ে কৃষ্ণনগরে রওনা করে দাও। আমরা দুজন আর একটা-দুটো দিন এখানে কাটিয়ে যাই। কৃষ্ণনগরে দুদিন দেরির ব্যাপারটা পরে ম্যানেজ করে নেব। এরকম বিচিত্র অভিজ্ঞতার সুযোগ আর বোধহয় আসবে না।
অনন্ত এককথায় রাজি।
আমি ফিরে এসে নিমাইবাবুকে সিদ্ধান্তের কথা বললাম। উনি প্রায় কেঁদে ফেললেন। নিজেকে কোনওরকমে সামলে নিয়ে বললেন, আপনারা তা হলে আমার বাড়িতে চলুন। দুটো দিন আমার অতিথি হয়ে সেখানেই থাকবেন। যেতে যেতে ঘটনাটা সবিস্তারে আপনাকে খুলে বলব।
আমি নিমাইবাবুর আশায় উজ্জ্বল শীর্ণ মুখটা দেখছিলাম। আমি কি পারব ওঁকে কিংবা ওঁর ছেলেকে বাঁচাতে?
.
সামান্য লটবহর নিয়ে অনন্ত একটা সাইকেল রিকশায় উঠল। অন্য একটা রিকশায় উঠলাম আমি ও নিমাইবাবু। রিকশা গাঙনাপুরের পথে রওনা হতেই ঘড়ি দেখলাম। সাড়ে নটা। আমাদের রিকশা অনন্তকে পথ দেখিয়ে চলল। এর মধ্যেই রানাঘাটের আলো-জনরব স্তিমিত হয়ে চারপাশে ঘুম নেমে আসছে। রিকশার হর্ন বলতে গেলে বাজাতেই হচ্ছিল না।
