কিন্তু ওরা কিছু না করে স্রেফ গাড়ি নিয়ে চলে গেল।
অন্ধকারে বেশ কষ্ট করে হাতঘড়ি দেখল কমলেশ। রাত বারোটা।
টলতে-টলতে ও উঠে দাঁড়াল। চোখে পড়ল, বহু দূরে কয়েকটা আলোয় বিন্দু। ক্লান্ত পায়ে ও সেদিকে হাঁটতে শুরু করল। অমিতাভকে ফোন করে খবর দিতে হবে। তারপর চলবে পুলিশের কাছে জবাবদিহির পালা।
.
রাত দুটোর সময় পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের হাত থেকে রেহাই পেল কমলেশ।
থানা থেকে বেরোতেই দেখল দরজায় দাঁড়িয়ে ওর জন্য অপেক্ষা করছে অমিতাভ। ওকে দেখেই হাসল, তোকে তা হলে ছাড়ল। ওঃ, আমাকেও কি কম হ্যারাস করেছে। এখন বাড়ি যাবি তো?
হ্যাঁ, কিন্তু আর চলতে পারছি না, ভীষণ ক্লান্ত লাগছে। অবসন্ন স্বরে জবাব দিল কমলেশ।
তা হলে আমার বাড়িতেই চল। ওখান থেকে তোর বাড়িতে একটা ফোন করে দিবি যে, তুই কাল সকালে বাড়ি ফিরবি, তা হলেই হবে।
অমিতাভর কথায় রাজি হয়ে ওর গাড়িতে গিয়ে উঠল কমলেশ।
কিছুক্ষণ পরেই অমিতাভর বাড়ির দরজায় ওদের গাড়ি এসে থামল। কমলেশ গাড়িতে বসে ঝিমোচ্ছিল, অমিতাভর ধাক্কায় সংবিৎ ফিরে পেয়ে গাড়ি থেকে নামল।
বসবার ঘরে দুজনে আরাম করে সোফায় বসে কথা বলছিল। হঠাৎই অমিতাভ বলল, কীরে, একটু ইয়ে চলবে নাকি? তা হলে এই ম্যাজম্যাজে ভাবটা কেটে যেত।
কমলেশ আপত্তি করল না।
অমিতাভ পাশের ঘরে গেল গেলাস আনতে। কমলেশ এদিক-সেদিক তাকাতে লাগল। চোদ্দো ফুট বাই বারো ফুট বসবার ঘর। প্রচুর টাকা খরচ করে এটাকে মনের মতো করে সাজিয়েছে অমিতাভ। একা মানুষ, বেশ সুখেই আছে।
এসব কথা ভাবতে-ভাবতে তন্ময় হয়ে পড়েছিল কমলেশ। দেওয়াল-ঘড়ির ঢং-ঢং শব্দে ওর চমক ভাঙল। রাত আড়াইটা বাজে। ঠিক তখুনি দুটো ভরতি গেলাস নিয়ে ফিরে এল অমিতাভ। সোফায় বসে সামনের টেবিলের ওপরে গেলাস দুটো নামিয়ে রাখল ও নে, শুরু কর।
একটা গেলাস হাত বাড়িয়ে তুলে নিল কমলেশ।
অমিতাভ ওর গেলাসে ছোট্ট একটা চুমুক দিয়ে গেলাসটা টেবিলে রাখল, বলল, তোর কী মনে হয়? পুলিশ কি ওই লোকদুটোর কোনও হদিস পাবে?
কমলেশ একটু অন্যমনস্ক ছিল। অমিতাভর কথায় ওর দিকে ফিরে তাকাল। বেঁটেখাটো অমিতাভ রায় তখন ডানহাত দিয়ে নিজের বাঁ-হাতের নখ খুঁটছে।
কমলেশ অবাক হল। এক-দু-সেকেন্ড অপেক্ষা করার পর হাসল । তুই কি সত্যি জানতে চাস?
তার মানে? অবাক হল অমিতাভ।
এমন সময় কমলেশের কানে এল দূর থেকে ভেসে আসা কোনও কুকুরের চিৎকার। যে চিৎকার ও বন্দি অবস্থায় প্রতিদিন রাত দুটো বত্রিশে শুনে এসেছে।
নিজের হাতঘড়ির দিকে তাকাল কমলেশ। ঠিক ২-৩২ মিনিট।
তুই কি সত্যি-সত্যি জানতে চাস? আবার একই প্রশ্ন করল কমলেশ।
হ্যাঁ, চাই। অমিতাভ অবাক হয়ে জবাব দিল।
তা হলে তোকে আর মাত্র পনেরো সেকেন্ড ওয়েট করতে হবে। বলতে বলতে হুইস্কির গেলাস হাতে উঠে দাঁড়াল কমলেশ। একদৃষ্টে হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে এরোপ্লেনের শব্দটার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো। ওর হাতঘড়ির সেকেন্ডের কাঁটা ঘুরে চলল। কমলেশ দেখতে লাগল–একসেকেন্ড দু-সেকেন্ড–তিনসেকেন্ড–চারসেকেন্ড–পাঁচসেকেন্ড–ছ-সেকেন্ড টিক টিক টিক টিক– টিক।
নখের আঁচড়
শো শেষ করে গ্রিনরুমে এসে ধড়াচূড়া ছাড়ছি, পরদা সরিয়ে অনন্ত এসে ঘরে ঢুকল। বলল, মোহনদা, একজন ভদ্রলোক আপনার সঙ্গে দেখা করতে চান। বাইরে অপেক্ষা করতে বলে এসেছি।
অনন্ত আমার ফাস্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট। ভীষণ কাজের ছেলে। ম্যাজিশিয়ান হিসেবে আমার যেটুকু নামডাক তার অনেকটাই অনন্তর জন্যে। ছেলেটার বুদ্ধি আছে, নিয়মমাফিক কাজ করে, আর খাটতেও পারে খুব। আমার সারা বছরের প্রোগ্রাম ও-ই ঠিক করে। বলতে গেলে অনন্ত একরকম আমার ম্যানেজার, ডান হাত, ফার্স্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট, সবকিছু। সেই গোড়া থেকেই ও আমার ম্যাজিকের দলে রয়েছে।
পাগড়ি, আলখাল্লা, সিল্কের পাজামা খুলে গুছিয়ে রাখতে রাখতে অনন্তকে বললাম, মিনিট দশেক পরে ঘরে পাঠিয়ে দিয়ো।
অনন্ত ঘাড় নেড়ে ব্যস্তভাবে চলে গেল। আজ ওর ব্যস্ত থাকার কারণ আছে। সাতদিনের শো করতে আমরা রাণাঘাটে এসেছিলাম। আজ তার সপ্তম দিন শেষ হল। কাল ভোরেই আমরা রওনা হব কৃষ্ণনগরের দিকে। সেখানে দশদিনের প্রোগ্রাম আছে। সুতরাং শেষ রজনীর শো খতম হওয়ামাত্রই অনন্ত গোছগাছের তত্ত্বাবধানে লেগে পড়েছে। দলে আমি আর অনন্ত ছাড়া আছে আরও চোদ্দোজন মেয়ে-পুরুষ। তাদের সবরকম দায়দায়িত্বই অনন্তর একার কাঁধে।
পাজামা-পাঞ্জাবি পরে গায়ে একটা শাল জড়িয়ে নিলাম। শীতটা এবারে যেন বেশ জাঁকিয়ে পড়েছে। তাঁবুর ভেতরেও কাঁপুনি ধরে যায়।
একটু পরেই পরদা সরিয়ে একজন বয়স্ক ভদ্রলোক এসে ঘরে ঢুকলেন। তার ঠিক পিছনেই অনন্ত। ওর সঙ্গে চোখাচোখি হতেই ও ভদ্রলোকের দিকে ইশারা করে ঘর ছেড়ে চলে গেল। আমি একটা টুল এগিয়ে দিয়ে তাঁকে বসতে বললাম।
আমি এখনও অটোগ্রাফ দেওয়ার মতো নামি ম্যাজিশিয়ান হইনি। ভোলা মাঠে তাঁবু ফেলে ম্যাজিক শো করাই আমার অভ্যেস। থিয়েটার হলের জাতে উঠতে পারিনি। সুতরাং আমার সঙ্গে লোকজন দেখা করতে আসে সাধারণত দুটো কারণে কোথাও শো করতে নিয়ে যাওয়ার চুক্তি করতে, কিংবা কোনও ম্যাজিকের কৌশল জানতে। প্রথমটির জন্যে আসে বয়স্করা, আর শেষের কারণে আসে ছেলে-ছোকরারা। এই ভদ্রলোক আমাকে কোথায় কল-শোর আমন্ত্রণ জানাতে চান?
