ঝুমকি রাজরীতার দিকে তাকিয়ে ধাতব গলায় বলল, বউদি, সিগনাল জ্যামিংটা অকেজো করে দিলাম। অকেজো করে দিলাম। অকেজো করে…।
ঝুমকির কাণ্ড দেখে নিকি হতভম্ব হয়ে আবার থেমে গিয়েছিল। এইবার হঠাৎই সংবিৎ ফিরে পেয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল টেবিলে রাখা ব্যাগটার ওপরে। হাঁপাঁক করে কোনওরকমে ব্যাগ থেকে একটা খাটো বন্দুক বের করে নিল। ব্যাগটা উলটে পড়ে গেল টেবিল থেকে। নিকি বন্দুকের লেসার পয়েন্টারটা ঝুমকির দিকে তাক করে ট্রিগার টিপল।
ঝুমকি এক অলৌকিক প্রক্রিয়ায় ওর শরীরটা উলটোদিকে বাঁকিয়ে দিল। ওর ঝুলে পড়া রেশমি চুল মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল।
বন্দুকের চাপা শব্দে রাজরীতা কেঁপে উঠল। ওর সিকিওরিটি গার্ডের এইসব অদ্ভুত কাণ্ড ওকে অবশ করে দিচ্ছিল। ও ক্লান্ত শরীরে মেঝেতে বসে পড়ল। কপালের পাশটায় হঠাৎই দপদপ করে একটা ব্যথা শুরু হয়ে গেল। কিন্তু তা সত্ত্বেও ও ঝুমকির দিক থেকে চোখ সরাতে পারছিল না।
নিকি দ্বিতীয় এবং তৃতীয় গুলি করল। ঝুমকি অপার্থিব ঢঙে অনায়াসে সেগুলো এড়িয়ে গেল। তারপর বাঁ-হাতের জ্বলন্ত তালু তুলে ধরল নিকিকে লক্ষ করে।
যেন ভীষণ গরম একটা কিছু ধরে হাতে ছাঁকা লেগে গেছে এইরকম ভঙ্গি করে বন্দুকটা ছেড়ে দিল নিকি। তারপর ডানহাতের কবজি চেপে ধরে ছটফট করতে লাগল।
ঝুমকি তখন বাঁ-হাতের তর্জনী মেঝেতে ঠেকিয়ে চক দিয়ে গণ্ডি টানার মতো দাগ টানতে শুরু করল।
ভিকি ততক্ষণে অনেকটা সামলে নিয়ে উঠে বসেছে। অবাক হয়ে ঝুমকির কাণ্ড দেখছে।
ঝুমকির তর্জনীর টান মেঝেতে একটা উজ্জ্বল নীল রঙের দাগ তৈরি করেছিল। বাজির সলতে পোড়ার মতো হিসহিস শব্দ হচ্ছিল একইসঙ্গে। যেন ওর আঙুলের ছোঁয়ায় ঘরের মেঝে পুড়ে যাচ্ছে।
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই নিকি আর ভিকিকে ঘিরে একটা আঁকাবাঁকা গণ্ডি সম্পূর্ণ করল ঝুমকি। তারপর সোজা হয়ে উঠে দাঁড়াল। বাঁ-হাতের তালুর কয়েকটা বোতাম চটপট টিপে হাসিমুখে তাকাল রাজরীতার দিকে।
আরও কোনও ভয় নেই, বউদি। টাইম লাইন দিয়ে ওদের ঘিরে দিয়েছি। ওরা এখন বন্দি। আপনি ইচ্ছে করলে সিকিওরিটি পুলিশকে খবর দিতে পারেন। খবর দিতে পারেন। খবর দিতে…।
টাইম লাইন মানে! হতভম্ব রাজরীতা কোনওরকমে বলতে পারল।
ঝুমকি ধাতব গলায় জবাব দিল, থ্রি ডায়মেনশন থেকে ফোর্থ ডায়মেনশনে যাওয়ার বরডার। মানে, কেউ এটা পেরোলেই আমাদের এই জগৎ থেকে সোজা ফোর্থ ডায়মেনশনে চলে যাবে। তাকে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। খুঁজে পাওয়া যাবে না। খুঁজে পাওয়া…।
ভিকি চিৎকার করে উঠল : রাবিশ! অল বুলশিট! নিকি, এই হুঁড়িটার একটা কথাও বিশ্বাস করবি না! সব ব্লাফ! মিছিমিছি আমাদের ভয় দেখাচ্ছে।
ঝুমকি ভিকির দিকে ঘুরে তাকিয়ে নিপ্রাণ ধাতব গলায় বলল, আপনারা কেউ দাগের বাইরে যাবেন না। দাগের বাইরে যাবেন না। দাগের বাইরে…।
ওর কথার প্রতিধ্বনি শেষ হওয়ার আগেই নিকি আর ভিকি দাঁত খিঁচিয়ে ছুটে গেল ঝুমকির দিকে।
এবং দাগ পেরোনোমাত্রই ওরা দুজন স্রেফ হাওয়ায় মিলিয়ে গেল।
রাজরীতা টলতে টলতে উঠে দাঁড়াল।
ওরা কোথায় গেল! ওরা কোথায় গেল!
ঝুমকি বাঁ-হাতের তালুর বোতাম টিপতে টিপতে জবাব দিল, ওরা ফোর্থ ডায়মেনশনে চলে গেছে। হয়তো মহাকাশের কোনও নির্জন জায়গায় ওরা অন্ধকারে ঠান্ডায় ভেসে বেড়াচ্ছে। ভেসে বেড়াচ্ছে। ভেসে বেড়াচ্ছে…।
এবার দরজার কাছে এগিয়ে গেল ঝুমকি। একটু পরেই বলল, দরজার লকটাকে ঠিক করে দিলাম। ঠিক করে দিলাম। ঠিক করে…।
ততক্ষণে ঘরের মেঝেতে আঁকা নীল দাগটাও মিলিয়ে গেছে।
দেওয়ালের টিভির প্রোগ্রাম এক মুহূর্তের জন্যও থামেনি। কিন্তু এতক্ষণ রাজরীতার সে খেয়াল ছিল না। এখন ও হঠাৎ করে যেন টিভির শব্দ শুনতে পেল, দেখতে পেল ছবি। ওর মনে পড়ল মনোরমের কথা, শত্রুজিতের কথা। শত্রুজিতকে এক্ষুনি একটা ফোন করতে হবে। কিন্তু তার আগে কৃতজ্ঞতা জানানো উচিত এই রোগা ফরসা মেয়েটাকে–থুড়ি, হিউম্যানয়েডটাকে।
ঝুমকি!
ঝুমকি রাজরীতার দিকে এগিয়ে আসছিল। রাজরীতা ছুটে গিয়ে ওকে একেবারে জাপটে ধরল। ওর গালে ভালোবাসার চুমু খেয়ে বলল, তোমার জবাব নেই।
ঝুমকি চোখ পিটপিট করল কয়েকবার। তারপর রাজরীতার আলিঙ্গন থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বলল, আমি যাই। আমার ভীষণ ঘুম পাচ্ছে। ভীষণ ঘুম পাচ্ছে। ভীষণ ঘুম পাচ্ছে…।
দৃশ্য-শেষ
যেন দূর থেকে ভেসে আসা কুকুরের চিৎকার কমলেশের কানে এল। আর ঠিক তার পনেরো সেকেন্ড পরেই শোনা গেল দূর থেকে ভেসে আসা কোনও এরোপ্লেনের গুঞ্জন। সেই গুঞ্জন ধীরে-ধীরে পালটে গেল গর্জনে। কানফাটানো বিকট শব্দ তুলে প্লেনটা বাড়িটার ঠিক ওপর দিয়ে চলে গেল।
ঘরে একটা অল্প পাওয়ারের বালব জ্বলছে। তারই আলোয় কমলেশ ঘড়ি দেখল। রাত দুটো বেজে বত্রিশ মিনিট পনেরো সেকেন্ড।
এবার ও খাটের ওপর উঠে বসল। চোখ বুলিয়ে ঘরটাকে আর-একবার দেখতে লাগল : চোদ্দো ফুট লম্বা, বারো ফুট চওড়া বড় সাইজের ঘর। ঘরে জানলার কোনও বালাই নেই। একটামাত্র দরজা : পুরু শাল কাঠের তৈরি। ঘরের চার দেওয়াল নিরেট কংক্রিটের। সেটা ডিঙিয়ে যখন আওয়াজ আসছে তা হলে কুকুরটা নিশ্চয়ই কাছাকাছি কোনও জায়গা থেকে চিৎকার করছিল। কিন্তু এই পুরু দেওয়ালের জন্য মনে হয়েছে চিৎকারটা দূর থেকে ভেসে আসছে।
