আপনাদের চার্জটা বড় বেশি। শত্রুজিৎ অনুযোগ করে বলেছিল।
তখন আলটিমেট সিকিওরিটি-র অফিসারটি হেসে বলেছে, উই আর বেস্ট ইন দ্য গেম। কে-২০৪-এর সঙ্গে শুধু আমাদের কোম্পানিরই ইমপোর্ট এগ্রিমেন্ট হয়েছে। সুতরাং আপনি যা পাচ্ছেন তা হল সেরা নিরাপত্তা–আলটিমেট সিকিওরিটি। তারপর গলায় বাঁধা টাইয়ের নটটা ঠিক করতে করতে সামান্য ইতস্তত করে অফিসারটি বলেছে, শুধু একটা ছোট্ট প্রবলেম আছে..।
কী প্রবলেম? কৌতূহলে শত্রুজিতের ভুরু কুঁচকে গেছে।
মানে, ঝুমকির গলার স্বরটা মেটালিক..যেটাকে পরিভাষায় ধাতব কণ্ঠস্বর বলে–মানে, আদ্যিকালের সিনেমাগুলোর রোবটের গলা যেমন শোনায় আর কী!
হাসল শত্রুজিৎ ও গলার স্বর মেটালিক হোক বা পেটালিক হোক, আমার কাজ নিয়ে কথা!
শত্রুজিতের বলা কথাগুলো রাজরীতার মনে পড়ছিল। তবে ওই কোম্পানি থেকে এটা বলে দেয়নি যে, ঝুমকি ঘুমোতে ভীষণ ভালোবাসে। একটু ফাঁক পেলেই চট করে একপ্রস্ত ঘুমিয়ে নেয়।
ঝুমকিকে দেখেই নিকি আর ভিকি থমকে গেল। কিন্তু সে এক লহমার জন্য। তারপরই অশ্লীল উল্লাসে ওদের হাসি চওড়া হল।
নিকি, আমাদের লাক দারুণ! ম্যাডামকে আর শেয়ার করতে হবে না।
নিকি তখন রাজরীতার শরীরের উত্তর গোলার্ধে ব্যস্ত ছিল। হাসতে হাসতে ও জবাব দিল, তুই ওকে নে। ম্যাডামকে ছাড়া আমি বাঁচব না।
শেষ কথাটা ন্যাকা-ন্যাকা সুরে বলেই রাজরীতার দিকে দ্বিগুণ মনোযোগ দিল নিকি। আর ভিকি অ্যাথলিটের ক্ষিপ্রতায় দৌড়ে গেল ঝুমকির দিকে। এবং কেউ কিছু আঁচ করে ওঠার আগেই এক হ্যাঁচকায় ঝুমকিকে কোলে তুলে নিল।
ভিকি মরশুম-খ্যাপা কুকুরের মতো ঝুমকিকে আদর করছিল। আর হিউম্যানয়েড ঝুমকি অবাক হয়ে লোকটার পাগলামো দেখছিল।
এদিকে রাজরীতা নিজেকে বাঁচানোর জন্য নিকির সঙ্গে প্রাণপণে ধস্তাধস্তি করছিল। আর একইসঙ্গে ভাবছিল, ব্যাপারটা কতদূর গড়াবে। রেপ, নাকি রেপ অ্যান্ড মার্ডার? কিন্তু ঝুমকির বেলায় কী হবে? ও তো মানুষ নয়! যদিও বাইরে থেকে ওর সবকিছুই আর পাঁচটা সাধারণ মানুষের মতো।
আমাকে ছেড়ে দিন। আমি হিউম্যানয়েড। আমাকে ছেড়ে দিন। আমি হিউম্যানয়েড। আমাকে…। অবাক চোখে ভিকির দিকে তাকিয়ে থেকে একঘেয়ে ধাতব সুরে বলে চলল ঝুমকি।
ওর গলার স্বরে চমকে উঠল ভিকি। এক ঝটকায় ওকে মেঝেতে নামিয়ে দিল।
নিকিও তখন নিজের জরুরি কাজ ছেড়ে হাঁ করে রোগা ফরসা মেয়েটির দিকে তাকিয়ে আছে।
ঝুমকি তখন বলছে, আমাকে ছেড়ে দেওয়ার জন্যে ধন্যবাদ। আমি এই ফ্ল্যাটের সিকিওরিটি গার্ড। আপনারা দয়া করে এক্ষুনি ফ্ল্যাট ছেড়ে চলে যান, নইলে আপনাদের বিপদ হবে। সে-বিপদ থেকে আর ফেরা যায় না। আশা করি আপনারা আমার অনুরোধ রাখবেন। আমার অনুরোধ রাখবেন। আমার অনুরোধ…।
রাজরীতাও অবাক হয়ে ঝুমকির কাণ্ড দেখছিল। ভয়ংকর দুজন ক্রিমিনালকে ও যেন নিশ্চিন্তে গীতা পাঠ করে শোনাচ্ছে।
প্রথম বিস্ময়ের ধাক্কাটা ভিকি সামলে নিয়েছিল। ঝুমকির কথা শুনে ও ব্যঙ্গ করে বলল, আমরা দয়া করে এক্ষুনি ফ্ল্যাট ছেড়ে চলে যাব। তার আগে চটপট আমাদের কাজটা সেরে নিতে দাও। এসো, কাছে এসো–।
আমি মানুষ নই হিউম্যানয়েড। হিউম্যানয়েড। হিউম্যানয়েড। ঝুমকি নির্বিকার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে মন্ত্র পড়ার মতো করে কথাগুলো উচ্চারণ করল।
আরে বাইরে তো কোনও ফারাক নেই–ওতেই আমার কাজ মিটে যাবে! অধৈর্যভাবে বলল ভিকি।
আমার ভেতরে ব্যাটারি আছে। আমি মানুষ নই হিউম্যানয়েড। হিউম্যানয়েড। হিউম্যানয়েড..।
এসো, ব্যাটারির সুইচটা একটু খুঁজে দেখি। ঝুমকির দিকে অশ্লীল ইঙ্গিত করে বলল ভিকি, এবং ঝুমকিকে আবার জাপটে ধরল।
ওর গায়ে মুখ ঘষতে-ঘষতে ভিকি বলল, কই, সবই তো দেখছি মানুষের মতো। এতেই আমার কাজ চলে যাবে। দেখি তো, তোমার ব্যাটারির সুইচটা কোথায়!
ঝুমকি যান্ত্রিকভাবে আগের কথাগুলোই বারবার বলছিল, কিন্তু ভিকি ওর কথায় কোনওরকম আমল দিচ্ছিল না। একমনে নিজের কাজ করছিল।
নিকি এতক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়েছিল। বিপদের জন্য আগাম সতর্ক হয়ে টেবিলে রাখা ব্যাগের দিকে দু-পা এগিয়েও গিয়েছিল–যাতে দরকার হলেই ব্যাগ থেকে একটা অস্ত্র বের করে নেওয়া যায়।
এখন ভিকিকে নিজের কাজে মত্ত হতে দেখে নিকির শরীরের টান-টান ভাবটা ঢিলে হল। ও আবার পা বাড়াল রাজরীতার দিকে।
কিন্তু ঠিক তখনই একটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটল।
নির্লিপ্ত ঝুমকি ওর বাঁ-হাতের তালুটা বইয়ের পাতার মতো চোখের সামনে মেলে ধরল। সঙ্গে-সঙ্গে তালুটা গনগনে আঁচের মতো লাল হয়ে গেল। ওর হাতের পাতায় ফুটে উঠল কয়েকসারি বোতাম–অনেকটা ক্যালকুলেটরের মতো। ডানহাতের তর্জনী দিয়ে চটপট কয়েকটা বোতাম টিপল ঝুমকি।
ভিকি মেঝেতে হাঁটুগেড়ে বসে ঝুমকিকে আঁতিপাঁতি করে আদর করছিল। হঠাৎই ও যেন ইলেকট্রিক শক খেয়ে ছিটকে পড়ল তিন হাত দূরে। সঙ্গে-সঙ্গে ঝুমকি হাওয়ায় শিস তুলে চোখের পলকে পৌঁছে গেল সিগনাল জ্যামিং-এর যন্ত্রটার কাছে। ভিকির কাছ থেকে যন্ত্রটার কাছে পৌঁছোনোর সময় রাজরীতা ওকে একটা ঝাপসা নীল ঝিলিকের মতো দেখতে পেল।
ঝুমকি ক্যানটা হাতে তুলে নিয়ে চটপট কয়েকটা বোতাম টিপল। ওর বাঁ-হাতের তালু তখনও লাল ফ্লুওরেসেন্ট বাতির মতো জ্বলছিল। ক্যানটা রেখে দিয়ে ও এবার হাতের তালুর কয়েকটা বোতাম টিপে দিল। সঙ্গে-সঙ্গে ক্যানের গায়ে দপদপ করতে থাকা এলইডি বাতিটা নিভে গেল।
