কমলেশের বুক ঠেলে বেরিয়ে এল দীর্ঘশ্বাস। সে বন্দি! এই ছোট্ট ঘরটায় অসহায় পাখির মতোই ডানা ঝাঁপটে তাকে শেষ হয়ে যেতে হবে। কেউ খোঁজও পাবে না…।
কিন্তু কতক্ষণ ধরে ও এখানে রয়েছে? একদিন? দু-দিন? উঁহু, মাত্র আট ঘণ্টা। কিন্তু একা একা এতক্ষণ কাটানোর ফলে মনে হচ্ছে, হয়তো আট ঘণ্টা নয়–আটদিন।
ঘটনায় আবর্ত শুরু হয়েছে এখন থেকে আট ঘণ্টা আগে। সেই সন্ধে ছটা থেকে। ভগবান জানেন, এর শেষ কোথায়।
কমলেশ সন্ধের মুখে গাড়ি নিয়ে বাড়ি ফিরেছিল। গ্যারেজে গাড়িটা রেখে সুরকিঢালা পথ ধরে বাড়ির দিকে পা বাড়াতেই অন্ধকারের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসেছে দুই ছায়ামূর্তি : দুজনের মুখেই কালো মুখোশ এবং হাতে অটোমেটিক কোল্ট।
ভীষণভাবে চমকে উঠেছে কমলেশ। কিন্তু ভয় পেলেও বিচারবুদ্ধি হারিয়ে ফেলেনি। তাই সঙ্গে-সঙ্গেই মাথার ওপর দু-হাত তুলে ধরেছে এবং বলে উঠেছে, টাকাটা নেওয়া হয়ে গেলে ব্যাগটা আবার ফেরত দিয়ো। কারণ, ওর পকেটে ক্যাশ টাকা ছাড়াও ছিল গাড়ির ড্রাইভিং লাইসেন্স, আইডেনটিটি কার্ড, তা ছাড়া কিছু দরকারি কাগজপত্র। কিন্তু ওদের কেউই পকেটের ব্যাগের দিকে হাত বাড়ায়নি। অর্থাৎ, ব্যাগের ওই সামান্য টাকার লোভে ওরা আসেনি। লম্বা, দোহারা চেহারার লোকটি রিভলভার নাচিয়ে কমলেশকে এগোতে নির্দেশ করেছে, এবং কমলেশ বুদ্ধিমানের মতো সেই নির্দেশ অমান্য করেনি।
বাড়ির এলাকা ছাড়িয়ে ওরা বাইরে এসে দাঁড়াতেই কোথা থেকে হুউস করে এগিয়ে এসেছিল একটা কালো ডেমলার গাড়ি। হাত-পা, চোখ বেঁধে, কমলেশকে পিছনের সিটে ফেলে ওরা গাড়ি ছেড়ে দিয়েছে।
প্রথম-প্রথম কমলেশ মনে-মনে হিসেব রেখেছে, গাড়িটা কখন কোনদিকে মোড় নিচ্ছে– কিন্তু একটু পরেই সেটা অনর্থক বুঝে ও আর চেষ্টা করেনি।
ঘণ্টাখানেক একটানা চলার পর গাড়ি থেমেছে। গাড়ি থামামাত্রই কমলেশের হাত আর পায়ের বাঁধন খুলে দেওয়া হয়েছে। বেশ কিছুক্ষণ হাঁটার পর কমলেশের কানে এসেছে একটা দরজা খোলার শব্দ। তারপর দরজা পেরিয়ে, ওই চোখ বাঁধা অবস্থাতেই, ওকে উঠতে হয়েছে গোটা বিশেক সিঁড়ির ধাপ–অবশেষে ও এই কংক্রিটের ঘরে এসে পৌঁছেছে।
চোখের বাঁধন খুলে দিতেই কমলেশের চোখে পড়েছে ঘরের এককোনায় দাঁড়িয়ে থাকা একটা খাটের দিকে। এ ছাড়া কাছেই, খাটের বিপরীতদিকে, রাখা হয়েছে একটা টেবিল আর একটা চেয়ার। ভালো করে তাকাতেই কমলেশ লক্ষ করল, টেবিলের ওপর কিছু কাগজ এবং একটা কলমও রয়েছে। তা হলে কি…?
ঠিক তাই! কমলেশের উপলব্ধির প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই বিশাল চেহারার লোকটি কর্কশ স্বরে আদেশ করেছে, বসুন। আপনাকে একটা চিঠি লিখতে হবে, আপনার ওয়াইফের কাছে। দু-লাখ টাকা আমাদের চাই।
কমলেশ এর উত্তরে বেশ কিছুক্ষণ চেয়ে থেকেছে মুখোশধারী লোকটার দিকে : আপনমনেই বিড়বিড় করেছে, দু-লাখ টাকা!
লোকটির কালো মুখোশের আড়ালে যেন ভেসে উঠেছে একটুকরো বাঁকা হাসি : ঠিক ধরেছেন স্যার, দু-লাখ টাকা। আশা করি এবারে বুঝেছেন, আপনাকে কেন আমরা তুলে এনেছি?
কমলেশ জিভটাকে শুকনো ঠোঁটজোড়ার ওপরে বুলিয়ে উত্তর দিয়েছে, হ্যাঁ বুঝেছি। আমার ওয়াইফের কাছ থেকে আপনারা টাকাটা আদায় করতে চান। কিন্তু আপনি বোধহয় জানেন না, লাস্ট উইকে আমার বউ ওর মা-কে নিয়ে দিল্লি রওনা হয়ে গেছে।
এই অভাবনীয় উত্তরে মুখোশধারী লোক দুজন একে অপরের দিকে চেয়ে মুখ চাওয়াচাওয়ি করেছে। ওদের একটু যেন দ্বিধাগ্রস্ত মনে হয়েছে কমলেশের। অবশেষে বিশাল চেহারার লোকটি তার অটোমেটিক কোল্ট উঁচিয়ে ধরেছে, বলেছে, বুঝেছ বাবু, দু-লাখ টাকা আমাদের চাই-ই চাই। কোনওরকম কায়দায় আমরা ভুলছি না। তুমি কীভাবে টাকার জোগাড় করবে সে আমাদের জানার দরকার নেই। আমাদের শুধু মালটা পেলেই হল।
লোকটির নির্দেশে কমলেশ সামনের চেয়ারে গিয়ে বসল, অমিতাভ রায় আমার ল-ইয়ার। সে-ই আমার সবকিছু দেখাশোনা করে। একমাত্র ওকে লেখা ছাড়া আর তো কোনও উপায় দেখছি না।
লোকটির হাতের বন্দুক আরও একবার নেচে উঠেছে, এবং সেইসঙ্গে শোনা গেছে তার আদেশ, তা হলে তাই লেখো। পেন নিয়ে রেডি হও।
এরপর কমলেশের তলিপি লেখা যখন শেষ হয়েছে তখন দোহারা চেহারার লোকটি সেটা ওর কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে পড়েছে :
প্রিয় অমিতাভ,
যে করে হোক দু-লাখ টাকা আমার চাই। দেখিস, পঞ্চাশটাকার নোটের চেয়ে বড় নোট যেন না থাকে। টাকাটা জোগাড় করার পর কী করতে হবে সেটা পরে জানাব। পুলিশে যোগাযোগ করার কোনও চেষ্টা করিস না। তা যদি করিস, তবে আমাকে আর জীবিত অবস্থায় দেখতে পাবি না।
ইতি– কমলেশ (সেন)
পুনশ্চ : ভীষণ বিপদে পড়ে তোকে এ-চিঠি লিখলাম। তোর ওপর আমার বাঁচা মরা নির্ভর করছে।–ক।
চিঠিটা পড়ার পর সন্তুষ্ট হয়ে দুজনেই ঘাড় নেড়েছে। তারপর কমলেশকে ঘরে একা রেখে ওরা চলে গেছে। যাওয়ার আগে ঘরের একমাত্র দরজার তালা দিয়ে গেছে।
কমলেশ আবার খাটে শুয়ে পড়ল। চোখ বন্ধ করে ভাবতে লাগল নিজের জটিল অবস্থার কথা।
টাকাটা পেয়ে গেলে ওরা কি কমলেশকে খুন করবে? কিন্তু তাই যদি ওদের ইচ্ছে হয় তা হলে মুখোশ-টুখোশ পরে পরিচয় গোপনের এত চেষ্টা কেন? হঠাৎ নিষ্ঠুর বাস্তবের মতোই কমলেশ বুঝতে পারল, যতক্ষণ ওরা মুখোশ পরে থাকবে, ততক্ষণই কোনও ভয় নেই। কমলেশ পরে ওদের আর চিনতে পারবে না।
