আদিত্যর বুকের ভেতরটা ঠান্ডা পাথর হয়ে গেল। হাত-পাগুলো যেন জেলির তৈরি। ওর মাথা টলে গেল, চোখ ঝাপসা হয়ে গেল। কিন্তু তা সত্ত্বেও ও ঘরের কোণে সুব্রতকে দেখতে পাচ্ছিল। ওর শরীর বৃষ্টিতে ভেজা, নীলে নীল।
ঝমঝম বৃষ্টির মধ্যে সকলের বলা শেষ হল। তারপর শান্তনুর প্রস্তাবে সবাই মিলে গান ধরল : পুরানো সেই দিনের কথা…।
আদিত্য লক্ষ করল, সুব্রত ঠোঁট নাড়তে নাড়তে ওর কাছে এগিয়ে আসছে। ওর নীল গাল বেয়ে জলের ফোঁটা গড়িয়ে পড়ছে।
আদিত্যর খুব কাছে এসে দাঁড়াল সুব্রত।
গান শেষ হলে পর ঝুঁকে পড়ে আদিত্যর কানে কানে ফিশফিশ করে বলল, ফ্যানটাসটিক!
আদিত্যর কান্না পেয়ে গেল। এই টাইম-মেশিন ছেড়ে বেরিয়ে যেতে কিছুতেই ওর মন চাইছিল না।
ঠিক এইভাবেই সিদ্ধার্থকে বলত নিনি। যেন জন্মদিনের পার্টিতে ওকে ইনভাইট করছে। বিয়ের আগে যখনই রাস্তাঘাটে, মেট্রো রেলের কাউন্টারের সামনে, কিংবা সিনেমা হলে সিদ্ধার্থর সঙ্গে ওর অ্যাপয়েন্টমেন্ট থাকত তখন এইভাবেই জোর দিয়ে বলত নিনি। অথচ ও নিজেই দেরি করে আসত–সবসময়। এ নিয়ে সিদ্ধার্থ কিছু বলতে গেলেই হাউমাউ করে বাধা দিয়ে বলত, মেয়েদের ওরকম একটু দেরি হয়। পরে আসব না তো কি আগে এসে ভোম্বল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকব!
এখন অন্ধকারে বসে সেসব কথা মনে পড়ছিল আর চোখের কোণে জল আসছিল। আজ আসবে তো সিদ্ধার্থ? নাকি আসবে না?
ঘরের এককোণে ধূপ জ্বলছিল। অন্ধকারে উজ্জ্বল লাল ডগাগুলো গুনল নিনি। তেরোটা। সাগরিকা বলেছে, তেরোটা ধূপ জ্বালালে ভালো হবে। বেশ স্পিরিট-ফ্রেন্ডলি অ্যাটমসফিয়ার তৈরি হবে।
নিনির সামনে গোলটেবিল। টেবিলের ঠিক মাঝখানটিতে একটা লম্বা মোমবাতি। একপায়ে দাঁড়িয়ে জ্বলছে। সেই মলিন আলোয় কালচে টেবিলের কাঠ অল্পসল্প চকচক করছিল। সেখানে একটা সাদা কাগজ পাতা, তার ওপরে ধ্যাবড়া করে খানিকটা সিঁদুর মাখানো। আর সেই সিঁদুরের ওপরে ত্রিভুজের চেহারায় সাজানো তিনটে কড়ি। কড়ির গায়ে মোমের আলো হাইলাইট তৈরি করছে।
নিনির বাঁ-পাশ থেকে সঙ্গীতা ফিশফিশ করে বলল, অ্যাই, নড়িস না। কনসেনট্রেট কর। একমনে সিদ্ধার্থর কথা ভাব…।
টেবিলটাকে ঘিরে বসে আছে ওরা চারজন।
নিনি, সাগরিকা, সঙ্গীতা আর সন্দীপন।
আজকের মেইন আইডিয়াটা সন্দীপনের। তাতে ওর বউ সঙ্গীতা, আর নিনির বেস্ট ফ্রেন্ড সাগরিকা উৎসাহের ইন্ধন জুগিয়েছে। নিনির একেবারেই মত ছিল না। কিন্তু তিনজনের চাপের কাছে ও শেষ পর্যন্ত হেরে গেছে।
সিদ্ধার্থ অ্যাকসিডেন্টে মারা গেছে আজ কতদিন? কুড়ি পেরিয়ে একুশদিন।
চারতলার ছাদে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছিল। রাত তখন বড়জোর এগারোটা। নিনিও ছাদে ছিল। আকাশের তারা আর উড়ে যাওয়া এরোপ্লেনের আলো দেখছিল। একইসঙ্গে ছুটে আসা বাতাসের আদর উপভোগ করছিল।
হঠাৎ কী যে হয়ে গেল! একটা আচমকা আর্ত চিৎকার : নিনি–।
চমকে ঘুরে তাকিয়েছিল। অন্ধকার পাঁচিলের ওপরে সিদ্ধার্থের সিলুয়েট আর দেখা যাচ্ছে। না। সিগারেটের আগুনের বিন্দুটাও আর নেই।
ছুটে পাঁচিলের কাছে গিয়ে ঝুঁকে পড়েছিল নিনি। অনেক নীচে, গুলি খাওয়া বেলে হাঁসের মতো, এলোমেলো হয়ে পড়ে আছে সিদ্ধার্থ।
নিনির মাথাটা কেমন পাক খেয়ে গিয়েছিল। শুধু মনে আছে, ছাদে লুটিয়ে পড়ার আগে ও আকাশের তারা দেখতে পেয়েছিল।
সেইদিন থেকে সংসারে নিনি একা হয়ে গেল। বাবা চলে গেছেন সেই কোন ছোটবেলায়। মা-ও চলে গেছেন চারবছর আগে। ভাই-বোন কেউ ছিল না। তাই শুধু সিদ্ধার্থকে জড়িয়ে ও বেঁচে ছিল।
অন্ধকারে একটা খসখস আওয়াজ হল।
সঙ্গে-সঙ্গে সন্দীপনের চাপা গলা শোনা গেল, কেউ কি এসেছেন?
চাপা কাশির শব্দ শোনা গেল।
নিনির হাতের ওপরে সঙ্গীতার হাতের চাপ বেড়ে গেল। ডানদিকে বসা সাগরিকার শুধু হাতের চাপ বাড়ল না, হাতটা তিরতির করে কাঁপতে লাগল।
কেউ কি এসেছেন? আবার সন্দীপন।
কাপড়ে কাপড় ঘষার শব্দ হল। অচেনা একটা গলা অস্পষ্টভাবে বলে উঠল।
নিনি ভয় পেয়ে গেল। যদিও প্ল্যানচেট-ফ্যানচেটে ওর এতটুকুও বিশ্বাস নেই। সে কথা ও বারবার বলেছে। কিন্তু ওরা তিনজন শুনলে তো!
সন্দীপন একই প্রশ্ন তৃতীয়বার এবং চতুর্থবার করল, কিন্তু আর কোনও সাড়াশব্দ পাওয়া গেল না।
ঘরের চতুর্দিকে তাকাল নিনি। মোমের আলোর পরিধি পেরিয়ে ঘরের অন্ধকার আনাচেকানাচে ওর সন্ধানী চোখ ঘুরে বেড়াল। কোনও অস্বাভাবিক বাড়তি ছায়া কি নজরে পড়ছে?
সিদ্ধার্থর চলে যাওয়াটা খুব দুঃখের হলেও তার মধ্যে একটা সান্ত্বনার ছোঁয়া আছে। কয়েকদিন আগে ওকে খুশি রাখার চেষ্টা করতে করতে সাগরিকা হঠাৎ বলে ফেলেছে, শোন, সিদ্ধার্থর ব্যাপারটা খুব স্যাড মানছি–বাট এটা তো ঠিক যে, এখন তুমি ব্যাপক বড়লোক। লাইফে সেফটির জন্যে টাকা একটা মেজর ফ্যাক্টর। সিদ্ধার্থর সবকিছু তো তুই-ই পাবি। যে যাওয়ার সে গেছে কিন্তু তোমার মুখের রুপোর চামচ কেউ কেড়ে নিতে পারবে না…।
না, সাগরিকা কিছু ভুল বলেনি। সিদ্ধার্থর সাম্রাজ্য নেহাত ছোট ছিল না। কিন্তু বিয়ের পর থেকে নিনির কোনও স্বপ্নকে আমল দেয়নি ও। ওর কাছে জীবন বলতে ভালো থাকা-খাওয়া, বেড়াতে যাওয়া, গাড়ি, বাড়ি, হইহুল্লোড়, ফুর্তিব্যস।
