কমলেশ বসে পড়তেই শান্তনু-উদয়ন-রূপক একসঙ্গে চেঁচিয়ে উঠল, গাছটা এখনও আছে। ইচ্ছে করলে ওটার মহানুভবতায় এখনও সিনেমা দেখা যায়।
সুজিত উঠে দাঁড়িয়ে বলল, একটা দুঃখের খবর দিই। কমলেশ যার কথা বলল, তিনি আর আমাদের মধ্যে নেই। বছর ছয়েক আগে সুকুমারবাবু সুইসাইড করেছেন।
সুকুমারবাবুর চাপড়, কানমলা আর রদ্দা বিখ্যাত ছিল। জর্দা-পান খেতেন। গলা ফাটিয়ে হাসতেন। দেখে মনে হত, কোনও দুঃখ-কষ্ট নেই। সেই মানুষটা আত্মহত্যা করতে গেল কেন? সুকুমারবাবুকে হিংসে হল অদিত্যর। ওর যদি ওরকম সাহস থাকত।
সুব্রত দূরে একটা চেয়ারে বসে দোল খাচ্ছিল। ওর মুখে কোনও অভিব্যক্তি নেই। গায়ের রং কেমন কালচে নীল দেখাচ্ছে।
বাইরে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। মেঘের ডাকও শোনা যাচ্ছে ঘন-ঘন। ভোলা জানলা দিয়ে বৃষ্টির ছাট ঢুকে পড়ছে ঘরে। সুব্রতর মাথার কাছেই জানলাটা। ওর গায়ে জল লাগছে। কিন্তু ওর কোনও ভ্রূক্ষেপ নেই। ও চুপচাপ দোল খাচ্ছে।
এক-একজনের কথা শেষ হওয়ার পর তুমুল হাততালির মধ্যে সুব্রতর কথা শুনতে পাচ্ছিল আদিত্য। অন্তত ওর তাই মনে হচ্ছিল।
কী দারুণ, না? ফ্যানটাটিক!
উৎপল বলল, আমাদের প্রত্যেকের লেখাগুলো নিয়ে জেরক্স করে একটা বই তৈরি করে আমি নিয়ে এসেছি। সব বই এখনও তৈরি হয়নি। তা ছাড়া কভারটা এখনও কমপ্লিট হয়নি। নরোত্তম কভার আঁকছে।
নরোত্তমের হাতের লেখা ছিল অপূর্ব, আর ছবিও আঁকত খুব সুন্দর। যাক, এই তিরিশ বছরে ও তাহলে আঁকার অভ্যেসটা ছেড়ে দেয়নি। ভাবতে ভালো লাগল আদিত্যর। কারণ, এই তিরিশ বছরে ওকে অনেক কিছু ছাড়তে হয়েছে।
উৎপলের দেওয়া বইটা সবাই একে-একে নিয়ে দেখতে লাগল।
উৎপল বলল, এরপর আর একদিন আমরা মিট করব। সেদিন বইটা সবাইকে দিতে পারব।
আদিত্য প্রত্যেকের জীবনী উলটেপালটে পড়ছিল। পড়তে-পড়তে ওর মনে হল, দীপক খুব একটা মিথ্যে বলেনি। ওদের বেশিরভাগই প্রতিষ্ঠিত, সফল। কিন্তু এটাই তো একমাত্র ছবি নয়। এটা প্রত্যেকের জীবনের মলাট। মলাটের ওপিঠেই রয়েছে আসল জীবন। সেটার খবর কে রাখে!
তৃতীয় পার্থ, পার্থসারথি চক্রবর্তী, তখন উঠে দাঁড়িয়ে নিজের জীবনের কথা বলছিল। ওর চোখে চশমা। মাথার সব চুল প্রায় সাদা করে ফেলেছে। ও এখন সরকারি-আমলা, জিওলজিতে ডক্টরেট।
অরিন্দম বলছিল, এসব করে কী লাভ। প্রথমে বুঝতে পারিনি কী লাভ…কিন্তু এখন বুঝতে পারছি। অসম্পূর্ণ কখনও পূর্ণের স্বরূপ বুঝতে পারে না। ময়ুর কখনও জানতে পারবে না আকাশে ডানা মেলে উড়ে যাওয়ার কী স্বাদ। তাই সে বলবে, উড়ে লাভ কী। যাই হোক, আমি বরাবরই ভাই কলকাতায় আছি। প্রত্যেক বছর সরস্বতী পুজোর দিন আমি স্কুলে আসি…।
বাইরে বৃষ্টির শব্দ রিমঝিম করে বাড়ছে। সেই সঙ্গে শনশন হাওয়া। একটা অদ্ভুত আমেজ অদিত্যকে জড়িয়ে ধরছিল।
আমাদের সময়েও এই ঘরটাতেই সরস্বতী পুজো হত। তখন সরস্বতীর দুপাশে ধুতি-পাঞ্জাবি পরা দুটি বালকের মূর্তি হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে থাকত। এখন আর সেই মূর্তি দুটো থাকে না। আমি প্রত্যেক বছর সরস্বতী পুজোর দিন এখানে এসেছি…কিন্তু কেন এসেছি জানি না। একটু হাসল পার্থ ও এসে কী লাভ হয়েছে তা-ও বুঝিয়ে বলব? ধরা যাক, একটা ঘরের একটা জানলা বহুদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। হঠাৎই যদি সেই জানলাটা খুলে দেওয়া হয় তা হলে প্রথম যে-বাতাসটা ঘরে ঢোকে তার একটা অদ্ভুত ঘ্রাণ আছে। তার মধ্যে এক অদ্ভুত প্রাণ থাকে। সেটা ঠিক ভাষায় বুঝিয়ে বলা যায় না। আজকের সন্ধেটা আমার কাছে ঠিক সেইরকম…।
সকলে হাততালি দিয়ে হইহই করে উঠল।
আদিত্য দেখল, ঘরের এক অন্ধকার কোণে দাঁড়িয়ে সুব্রত ঠোঁট নাড়ল। বোধহয় ফ্যানটাটিক বলল। তারপর আলতো হাততালি দিল। অথচ ওর চোখমুখে কোনও খুশির ভাব নেই।
আদিত্য ইশারা করে ওকে কাছে ডাকল।
সুব্রত মাথা নাড়ল এপাশ-ওপাশ। ওর নীলচে মুখে কেমন অভিমানের ছাপ।
দীপক চেঁচিয়ে পার্থসারথিকে মন্তব্য ছুঁড়ে দিল, তুই এত ভালো বাংলা শিখলি কোত্থেকে!
পার্থ দূরের একটা টেবিলে চড়ে বসেছিল। হেসে জবাব দিল, জানো না, আমার ফাদার বাংলার টিচার ছিল!
ঘরের মধ্যে এলোমেলো হইচই হচ্ছিল। একটা বাচ্চা ছেলে কোথা থেকে এসে কেটলি আর ভঁড় নিয়ে ঢুকে পড়ল। ঘরের মাঝবয়েসি বাচ্চাগুলোকে একে-একে চা দিতে লাগল।
না, উৎসুক আয়োজনে কোনও ত্রুটি রাখেনি।
এমন সময় কে যেন বলে উঠল, অ্যাই সুজিত, আমাদের মধ্যে আজ কারা কারা আসেনি, কে কোথায় আছে একটু পড়ে শোনা তো। জেরক্স করা বইটা যখন হাতে পাব তখন ধীরেসুস্থে পড়ে দেখব।
উৎপল চেঁচিয়ে সবাইকে থামাতে চেষ্টা করল।
সুজিত একগোছা কাগজ নিয়ে মনিটরের ভঙ্গিতে পড়তে লাগল ও এই লিস্টটা আমি পড়ে শোনাচ্ছি। পরে সবাইকে এটার একটা কপি দিয়ে দেব…।
সুজিতের লিস্ট পড়া শেষ হল। ক্লাস ইলেভেনে ওরা একচল্লিশ জন ছিল। আজ সতেরোজন আসতে পারেনি। কেউ কলকাতার বাইরে, কেউ বিদেশে, আর কেউ-বা খুব জরুরি কাজে আটকে গেছে।
আদিত্য চব্বিশজনকে গুনছিল, খুঁটিয়ে দেখছিল আবার।
ঠিক তখনই কে যেন বলল, সুব্রত চার বছর আগে মারা গেছে। সিমলিপালে বেড়াতে গিয়েছিল। সেখান থেকে ফিরে এসে তিনদিনের জ্বরে মারা যায়। অসুখের কারণটা ডাক্তাররা ধরতে পারেননি।
