অথচ নিনির আরও পড়াশোনা করার ইচ্ছে ছিল, ছবি আঁকা শিখে বড় পেইন্টার হওয়ার সাধ ছিল। ও ভেবেছিল, আমেরিকায় গিয়ে এই সাধগুলো ও পূরণ করবে, কিন্তু হয়নি। সিদ্ধার্থ ওর ইচ্ছেগুলোয় সায় দেয়নি। বরং ওর পেইন্টার হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে কখনও-সখনও বাজে ঠাট্টা করেছে। ওর সঙ্গে এ নিয়ে তর্কাতর্কিও করেছে নিনি। তারপর তর্ক থেকে ঝগড়া।
কিন্তু শুধু এই সমস্যাটুকু ছাড়া সিদ্ধার্থর আর কোনও সমস্যা ছিল না। হি ওয়াজ আ গুড হাজব্যান্ড।
হঠাৎই ফিশফিশে গলায় কে যেন টেনে-টেনে উচ্চারণ করল, নি—নি–।
নিনির গায়ে কাঁটা দিল। এই প্রথম ওর মনে হল ও যেন প্রাণ খুলে সিদ্ধার্থকে বলতে পারছে না, তোমার আসা চাই! বরং যেন মনে হচ্ছে, এই অন্ধকার ঘরে ও যেন না আসে। ও যদি প্রেতলোকে এখন থেকে থাকে তা হলে সেখানেই থাক। কিন্তু সিদ্ধার্থ কি এখন নিনির কথা শুনবে? ও কি নিনির চিন্তা টের পাচ্ছে?
আবার পা টেনে চলার ঘষটানির শব্দ। এবং হালকা অস্পষ্ট গলায় কে যেন বলল, নিনি। নিনি–আমি এসেছি।
নিনির মনে হল, এই কাঁপা কাঁপা ফিশফিশে স্বর যেন অন্য কোনও হিমশীতল জগৎ থেকে ভেসে আসছে।
কিন্তু এ অসম্ভব! নিনি ভালো করেই জানে ভূত-প্রেত বলে কিছু নেই। ওরকম যা-কিছু শোনা যায় সবই মনের ভুল–দেখা কিংবা শোনার ভুল। এখন ও যে কথাগুলো শুনছে সবই হ্যাঁলুসিনেশন।
নিনি…নিনি..আমি..আমি এসেছি…।
সঙ্গে-সঙ্গে তীব্র ভয়ের চিৎকার।
মেয়েলি গলায় ওদেরই কেউ চিৎকার করেছে। মনে হল, চিৎকারটা নিনির ডানদিক থেকে এল।
চিৎকারের তীব্রতায় নিনি আঁতকে উঠল। সন্দীপন হঠাৎই জোরালো গলায় বলল, কোনও ভয় নেই। কোনও ভয় নেই। আমি আলো জ্বালছি…।
আলো জ্বলে উঠল।
সাগরিকা মুখে হাত চাপা দিয়ে ফুঁপিয়ে-ফুঁপিয়ে কাঁদছে। সঙ্গীতা আর সন্দীপন ওকে শান্ত করার চেষ্টা করছে।
হঠাৎই সন্দীপন দু-হাতের একটা ভঙ্গি করে বলল, ও. কে. বাবা! সরি। সরি এভরিবডি, সরি। ওইসব ভূতের আওয়াজ আমি করেছি। আর নিনির নাম ধরে ফিশফিশ করে ভুতুড়ে কথাগুলো আমিই বলেছি। স্রেফ মজা করার জন্যে আর নিনিকে আওয়াজ দেওয়ার জন্যে। ও সবসময় বলে ভূত বলে কিছু নেই। সাগরিকার মাথায় হাত বোলাল সন্দীপন: সাগরিকা, কাম ডাউন লেডি। আই সেইড আই অ্যাম সরি….।
নিনি একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। এতক্ষণ ওর কেমন যেন দম আটকে আসছিল।
শেষ পর্যন্ত বহু তোয়াজ করে সাগরিকাকে শান্ত করা গেল। সন্দীপন মজা করে একথাও বলল, আচ্ছা, এবার চুপ কর–তোকে একটা এক্সট্রা-লার্জ ক্যাডবেরি খাওয়াব।
প্ল্যানচেট-পর্ব এভাবেই শেষ হল।
একটু পরে ওরা তিনজন চলে গেল। আড়াইহাজার স্কোয়ার ফুটের ফ্ল্যাটে নিনি এখন একা। গেস্ট বেডরুমের দরজায় দাঁড়িয়ে ও গোলটেবিলটার দিকে তাকাল। নিভিয়ে দেওয়া মোমবাতিটা একপায়ে দাঁড়িয়ে। ধূপকাঠিগুলো জ্বলে-জ্বলে শেষ হয়ে গেছে। সিঁদুর মাখানো কাগজ আর কড়িগুলো এখন কত নিরীহ দেখাচ্ছে।
সন্দীপনটা বরাবরই একটু ফাজিল। প্র্যাকটিক্যাল জোক করে অন্যকে হেনস্থা করে। তবে মানুষটা ভালো। হয়তো নিনির মন ভালো করার জন্যই ও এরকম একটা ভয়ের নাটক করেছে।
গেস্ট বেডরুমের আলো নিভিয়ে দিল নিনি। বাইরে বেরিয়ে দরজাটা বন্ধ করে দিল।
লম্বা করে একটা শ্বাস ফেলল। এখন ও কত একা! কিন্তু একইসঙ্গে কত স্বাধীন!
গুনগুন করে দু-লাইন গান গাইল নিনি। অতীত এখন অতীত। এখন ওকে তাকাতে হবে ভবিষ্যতের দিকে। ওর ইচ্ছেগুলো এখন ইচ্ছেমতো ডানা মেলতে পারে।
হঠাৎই দরজায় নক করার শব্দ শুনতে পেল।
চমকে উঠল নিনি। আওয়াজ লক্ষ করে ফিরে তাকাল।
গেস্ট বেডরুমের দরজার ওপাশ থেকে কেউ আলতোভাবে নক করছে। ঠকঠক। ঠক ঠক।
নিনির নার্ভ মোটেই কমজোরি নয়। ও একটুও ভয় পেল না। উলটে বন্ধ দরজাটার খুব কাছে এগিয়ে গেল।
দরজাটা খুলবে না কি?
আবার নক করার শব্দ।
তারপর ফিশফিশে গলায় কেউ ডেকে উঠল, নিনি, আমি এসেছি।
সন্দীপন কি ঘরের মধ্যে লুকিয়ে থেকে মজা করছে?
অসম্ভব! কারণ, ওরা তিনজন অনেকক্ষণ আগে চলে গেছে। নিনি ওদের ফ্ল্যাটের দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়েছে। তারপর নিজের হাতে দরজা লক করেছে। এতে কোনও ভুল নেই, ভ্রান্তি নেই।
আবার ডাকল সে, নিনি, দরজা…খোলো। আমি…আমি এসেছি…। যন্ত্রণায় কাতর একটা মানুষ হাঁপাতে হাঁপাতে শ্বাস টেনে-টেনে কথা বলছে।
নিনি পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
তুমি তো সবসময় বলতে, তোমার আসা চাই। তাই আমি এসেছি। দরজা খোলো, নিনি– তোমার সঙ্গে কথা আছে….। ।
নিনি একটু ভয় পেল এবার। উদভ্রান্ত চোখে চারপাশে তাকাল। কী করবে ভেবে পেল না।
নক করার শব্দ ক্রমশ জোরালো হতে লাগল। হতে-হতে সেটা ধাক্কায় বদলে গেল।
নিনি! নিনি!
গলাটা এবার সিদ্ধার্থর মতো লাগছে না?
এখন নিনি কী করবে? চিৎকার করবে? অন্য ফ্ল্যাটের লোকজনদের ডাকবে?
কে? কে তুমি? নিনি মরিয়া হয়ে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল।
নিনি, তুমি দরজা না খুললে…..আমি…দরজা…ভেঙে…।
না! তুমি সিদ্ধার্থ নও! তুমি…তুমি…।
হ্যাঁ, আমি সিদ্ধার্থ। আমি জানি…সেদিন রাতে…ছাদে স্মোক করার সময়…কে আমাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছিল। আর তুমিও সেটা ভালো করে জানো, নিনি। আমরা দুজন ছাড়া আর কেউ একথা জানে না। এবার বিশ্বাস হল তো! নাউ বি আ গুড গার্ল…অ্যান্ড ওপেন দিস ড্যাম ডোর, উইল য়ু?
দধীচি সংবাদ (নভেলেট)
আমার হাতে ধরা কিম্ভুতকিমাকার বস্তুটার দিকে কিংকর্তব্যবিমূঢ় দৃষ্টিতে চেয়ে রইল কিম্ভুতকিমাকার লোকটা। গলার কণ্ঠাকে অতিকষ্টে কয়েকবার ওঠানামা করিয়ে প্রশ্ন করল, ওটা কী?
