পথের পাঁচালি র লেখকের স্মৃতিপথের পাঁচালি আরণ্যক।
উৎপল থামল।
আদিত্য মুগ্ধ হয়ে শুনল। ক্লাস সিক্সের এক বালক এইরকম লেখা লিখেছে! শান্তনুর দিকে দেখল আদিত্য। ওকে তখন বাহবা দিচ্ছে কয়েকজন সহপাঠী।
সুজিত আর কমল কখন যেন ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। হঠাৎই ওরা হইহই করে ঘরে ঢুকল। সঙ্গে গেঞ্জি আর হাফপ্যান্ট পরা একটি ছেলে। তার কাঁধের ঝুড়িতে ছোট ছোট মিষ্টির বাক্স।
সুজিত চেঁচিয়ে বলল, বন্ধুগণ, আমাদের ছেলেবেলায় সেই পুঁটিরামের প্যাকেট। মনে পড়ছে, পুঁটিরামের মিষ্টির দোকান?
মনে পড়ছে না আবার! সুতরাং ঘর জুড়ে তুমুল হাতহালি।
হাতে-হাতে সবার কাছে পৌঁছে গেল মিষ্টির বাক্স। খাওয়া শুরু হল। উৎপল সেই ফাঁকে টেপ রেকর্ডারে ক্যাসেটটা উলটে দিল।
আদিত্য বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করছিল। শশাঙ্ক মাঝে মাঝে দু-চার লাইন করে কবিতা আবৃত্তি করছিল। আবার কখনও ছোটখাটো ম্যাজিক দেখাচ্ছিল।
হঠাৎই কমল চেঁচিয়ে উঠল, অ্যাই, চুপ কর সবাই। অরিন্দম এবার বলবে।
অরিন্দমের স্বাস্থ্যবান চেহারা, চাপদাড়ি, মুখে একটা ব্যবসায়ী ভাব। উঠে দাঁড়িয়ে বলল, আজকের দিনটার কোনও মানে হয় না। এই স্কুলে একসঙ্গে পড়েছি তো কী হয়েছে? স্কুল শেষ হয়েছে, স্কুল-লাইফও শেষ হয়ে গেছে। যা শেষ হয়ে গেছে তা নিয়ে নাচানাচি করে লাভ কী? এখন লাইফে অনেক প্রবলেম। সব কিছু লাভ-ক্ষতি দিয়ে বিচার করতে হয়।
আচমকা কথা শেষ করে অরিন্দম বসে পড়ল।
আদিত্যর ওকে কসাই মনে হচ্ছিল। জীবনের সব অঙ্কই কি লাভ-ক্ষতির অঙ্ক? ওর দেবিকার কথা মনে পড়ল। বিয়ের পর থেকেই দেবিকার এক অভিযোগ ও আদিত্য মোটেই প্র্যাকটিক্যাল নয়। সেন্টিমেন্টাল ফুল। আবেগপ্রবণ গণ্ডমূর্খ। হয়তো কথাটা সত্যি। সেইজন্যই বোধহয় আদিত্য নিজেকে শামুকের মতো গুটিয়ে নিয়েছে। আগে ও অনেক কথা বলত, যার মধ্যে বেশিরভাগটাই বাজে কথা। আকাশে প্রকাণ্ড চাঁদ উঠলে কি অপরূপ ঘন মেঘ করলে ও আর দেবিকাকে ডাকে না, দেবিকা তখন হয়তো কোনও কাজ নিয়ে ব্যস্ত।
আদিত্যর ছেলে সুমিত ক্লাস এইটে পড়ে। কিন্তু এরই মধ্যে সে মায়ের জীবনতত্ত্বে দীক্ষা নিয়েছে। আদিত্য বুঝতে পারে।
সুমিত আদিত্যকে ভীষণ ভালোবাসে। কিন্তু সেই ভালোবাসার মধ্যেও ওর প্রয়োজনটা জানাতে কখনও ভুল হয় না। একটা বাচ্চা ছেলে তার প্রয়োজনের কথাটা কখনও ভুলবে না? কখনও বাজে খরচ করতে চাইবে না? অপচয়ের মধ্যেই যদি মানুষকে চেনা যায় তাহলে ছেলেকে আদিত্য আলাদা করে চিনবে কেমন করে!
শুভেন্দুর কথায় আদিত্য জেগে উঠল। ও তখন টেপ রেকর্ডারের সামনে কথা বলছে। বালক বয়েসের মতোই রোগা-সোগা চেহারা, চোখে রিমলেস শৌখিন চশমা, মাথায় কয়েক গাছা পাকা চুল। ক্লাসে শুভেন্দু বেশ মজা করে কথা বলত।
আমি একটা ছোটখাটো ব্যবসা করি। লাভ-ক্ষতির হিসেব আমাকেও করতে হয়। অরিন্দমের মতো। সোজা কথায়, রাত-দিন টুপি পরানোই আমার কাজ। কখনও ব্যাঙ্ককে টুপি পরাচ্ছি। কখনও সাপ্লায়ারকে টুপি পরাচ্ছি। আর কখনও কাস্টমারকে। সেইজন্যেই আজকের সন্ধেটা আমার দারুণ লাগছে। আমি মনে প্রাণে এই ভেবে খুশি যে, এখন আমাকে কাউকে টুপি পরাতে হবে না। সোজা কথা ভাই, রোজকার জীবনে টুপি পরাতে-পরাতে আমি টায়ার্ড হয়ে গেছি।
শুভেন্দুর পর দীপক। ময়লা রং, সরু গোঁফ, চঞ্চল চোখ। একটা সদাগরি অফিসে সামান্য কেরানির চাকরি করে। ঘরে ঢোকার পর দীপক প্রথম প্রথম একটু আড়ষ্ট ছিল। এখন অনেকটা সহজ হয়ে গেছে।
দীপক বলতে শুরু করল, এখানে আসার কথায় আমার একটু কিন্তু কিন্তু লাগছিল। তোরা সব বিরাট পোস্টে চাকরি করিস, কেউ বা বিশাল বিজনেসম্যান। আর আমি বারোশো টাকা মাইনের কেরানি। যে-কোনও দিন চলে যেতে পারে এমন একটা চাকরি। তাই এখানে আজ এসে মনে হচ্ছিল আমার অবস্থা অনেকটা হংস মধ্যে বকো যথা। কিন্তু টেরই পাইনি কখন যেন আমি বক থেকে হাঁস হয়ে গেছি। তোদের মাঝে একাকার হয়ে গেছি।
দীপকের পর কমলেশ। ও এখন সাহা ইন্সটিটিউটে বিশাল বিজ্ঞানী থিয়োরিটি ক্যাল ফিজিসিস্ট।
আমি নতুন কথা কী আর বলব! বরং স্কুলে আমার প্রথম দিনটার কথা বলি। আমি হুগলির এক গ্রামের স্কুল থেকে এসে এই স্কুলে ভরতি হয়েছিলাম। বাবা বদলি হয়ে কলকাতায় এসেছিলেন, তাই আমাকেও স্কুল বদল করে এখানে এসে ক্লাস সেভেনে ভরতি হতে হয়েছিল। প্রথম দিন স্কুলে এসে আমার মাথা ঘুরে গিয়েছিল। প্রকাণ্ড বিল্ডিং, সারি সারি অসংখ্য ক্লাস-ঘর। তো আমি ভুল করে ক্লাস এইটের বি সেকশানে ঢুকে পড়েছিলাম। ভুল যে করেছি সেটা পরে বুঝেছিলাম। যাই হোক, ঘরে ঢুকে দ্বিতীয় না তৃতীয় বেঞ্চে বসেছি–দেখি, ক্লাসে যে-টিচার ছিলেন তিনি প্রথম বেঞ্চ থেকে শুরু করে প্রত্যেকটি ছেলেকে একে-একে কাছে ডাকছেন। তারপর জম্পেশ করে তার কর্ণমর্দন করে ঘাড়ে একটি রদ্দা বসিয়ে দিচ্ছেন। তার এই অমানুষিক আক্রমণ থেকে কেউই বাদ যাচ্ছে না। ব্যাপারটা ক্রমশই আমার কাছে এগিয়ে আসছিল। ভয়ে আমার তখন হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেছে। এমন সময়ে একজন বেয়ারা একটা নোটিস নিয়ে ক্লাসে আসে। সেই সুযোগে আমি ক্লাস রুমের পেছনের দরজা দিয়ে চম্পট দিই। একটু থামল কমলেশ। তারপর বলল, আর-একটা ব্যাপার মনে পড়ছে। দোতলায় ক্লাস সেভেন এ-র ঘরে পাশের পার্ক থেকে একটা গাছের ডাল ঢুকে পড়েছিল একটা জানলা দিয়ে। টিফিনের সময় কেউ-কেউ ওই ডাল বেয়ে পালিয়ে গিয়ে মুনলাইট হলে সিনেমা দেখত। জানি না, ওই ডালটা এখনও আছে কি না।
