ঘরের অস্পষ্ট আলোয় পুরোনো সতীর্থদের চিনে নিচ্ছিল আদিত্য।
উৎপল, উদয়ন, রূপক, শুভেন্দু, নরোত্তম, কমলেশ, শান্তনু, আরও সবাই।
এমন সময় আর একজন এসে ঘরে ঢুকল।
আদিত্য তাকে চিনতে পারল সহজেই : চঞ্চল। ওর পাশেই বসত। পড়াশোনায় তেমন দক্ষ না হলেও ভীষণ ভালো ছেলে ছিল। চুয়াল্লিশ পেরোনো কালো ছেলেটার মুখে আজও সেই একইরকম অপ্রস্তুত মিষ্টি হাসি।
ঘরে যে এসে ঢুকছে তাকেই হইহই করে স্বাগত জানাচ্ছে শান্তনু, কমল, উৎপল, সুজিত। তারপরইঃ অ্যাই, আগে পরীক্ষা দে। এক এক করে সবার নাম বল। বল, এটা কে বসে আছে?
উত্তর ঠিক হলে পর একপ্রস্ত হইচই, আর না হলে পরে বকুনি। তবে পরীক্ষায় পাস বা ফেল যা-ই হোক না কেন, হাত ধরে চেয়ারে বসিয়ে সামনে এগিয়ে দেওয়া হচ্ছে কোল্ড ড্রিঙ্কস।
সুব্রতর কথা মনে পড়ছিল আদিত্যর। ওর সামনের বেঞ্চে বসত। লেখাপড়ায় দারুণ ছিল। দুরন্তপনাতেও। আদিত্যকে কখনও দিতু কখন তু-তু বলে খেপাত। আদিত্য অন্যমনস্ক হলেই মাথায় চঁটি মেরে অন্য দিকে তাকিয়ে ভিজে বেড়ালের মতো বসে থাকত। ছোট গোলগাল মুখ, মাথার চুলগুলো খাড়া-খাড়া।
সুব্রত খুব প্রাণবন্ত ছিল, ছটফটে ছিল। একটুখানি ডাকাবুকোও।
আদিত্যর মনে পড়ছিল, একবার ট্রামে ওর সঙ্গে কী নিয়ে যেন ঝগড়া হয়েছিল। আদিত্য সুব্রতকে এক ধাক্কা মেরেছিল। কিন্তু ওর সঙ্গে গায়ের জোরে পারবে কেন! সুব্রত এক টানে ওর ব্যাগের ফিতে ছিঁড়ে ব্যাগটা ফেলে দিয়েছিল মেঝেতে।
কিন্তু শুধুই কি ঝগড়া! সুব্রত ওকে ভালোও বাসত। টিফিনে ছোলাভাজা, কুল বা হজমি কিনলে আদিত্যকে ভাগ দিত, আর বলত, জানিস দিতু, স্কুলের টিফিনে আমার পেট ভরে না।
এই ছোলাভাজাটা খেয়ে দ্যাখ। কী দারুণ, না? ফ্যানটাসটিক!
কথায় কথায় কী দারুণ, না? ফ্যানটাসটিক! বলাটা সুব্রতর যেন মুদ্রাদোষ ছিল।
এতদিন সুব্রতর স্মৃতিটা কীরকম ঝাপসা ছিল। সংসারের নানান সমস্যার মাঝে ওকে মনেই পড়ত না। অথচ আজ এই টাইম-মেশিনে ঢুকে সুব্রত স্মৃতির পিছনের সারি থেকে একেবারে সামনে চলে এসেছে।
সুব্রত আজ আসেনি। এলে ওকে সঙ্গে-সঙ্গেই চিনতে পারত আদিত্য। ওকে ভোলা যায় না। ক্লাসে বরাবর ফার্স্ট হত, কিন্তু সকলের সঙ্গে সহজভাবে মিশত, মজা করত। গরমের ছুটি পড়ার দিন স্যারদের আপ্যায়নের অনুষ্ঠানের ব্যাপারে সুব্রত যেমন উৎসাহী ছিল, তেমনটাই ছিল সরস্বতী পুজোর ব্যাপারে।
একবার স্কুল ছুটির সময়ে পেয়ারা কিনতে গিয়ে দুটো ছেলের সঙ্গে আদিত্যর প্রায় হাতাহাতি হয়। ছেলে দুটো ওকে একা পেলে মারবে বলে ভয় দেখায়। আদিত্য খুব ভয় পেয়ে গিয়ে সুব্রতকে ব্যাপারটা বলেছিল। শুনে বেপরোয়া সুব্রত গালাগাল দিয়ে বলেছিল, কোন শালা তোকে মারবে বলেছে! দেখি কার হিম্মত তোর গায়ে হাত দেয়–
সুব্রত সেদিন আদিত্যকে সঙ্গে করে বাড়ি পৌঁছে দিয়েছিল।
হঠাৎই আদিত্য চমকে উঠল।
ওই তো সুব্রত! ঘরের পিছনের দেওয়াল ঘেঁষে একটা টেবিলের ওপরে বসে আছে। বসার ভঙ্গিটা রকে আড্ডা মারার মতো, কিন্তু আবছায়া মুখে বিষণ্ণ ছাপ। আধো-আঁধারিতে চুপচাপ বসে আছে–যেন সম্প্রতি কোনও মানসিক আঘাত পেয়েছে।
ঘরের মধ্যে নানান কথার কলরোল। তাকে ছাপিয়ে মাঝে-মাঝেই শোনা যাচ্ছিল মেঘের ডাক।
টেপ রেকর্ডারের সামনে নিজেদের অনুভবের কথা এক এক করে বলছিল সকলে। পুরোনো দিনের কথা, স্যারদের কথা, স্কুল স্পোর্স-এর কথা, সরস্বতী পুজোর কথা।
উৎপল হঠাৎই হাত তুলে সবাইকে থামতে বলল। তারপর একটা জীর্ণ মলিন বই তুলে দেখাল সকলকে।
এটা আমাদের ক্লাস এইটের বাংলা বই
আদিত্য হাতে নিয়ে দেখল বইটা। নাম সাহিত্য মুকুল। সেলাই ছিঁড়ে গেছে, পৃষ্ঠাগুলো ক্ষয় ধরা হলদে। অতীতের চিহ্ন অতি সহজেই চলে এসেছে বর্তমানে। তারপর ওদের সবাইকে টেনে নিয়ে যেতে চাইছে অতীতে।
বইটা হাতে নিয়ে অদ্ভুত লাগছিল আদিত্যর। অতীত, না বর্তমান কোনটা বেশি সত্যি? বর্তমানের জন্মের বীজ লুকিয়ে থাকে অতীতে। অতীত কায়া, বর্তমান তার ছায়া।
বইটা সবাই হাতে-হাতে দেখতে লাগল।
বাইরে মেঘের ডাক বাড়ছিল। বৃষ্টি শুরু হওয়ার আগের বাতাস স্কুলের ভোলা উঠোনে পাক খেয়ে ঢুকে পড়ছিল ঘরের ভেতরে।
উৎপল আর একটা খাতা তুলে দেখাতে চাইল সবাইকে।
এই খাতায় আমাদের কয়েকজনের লেখা কবিতা আর গদ্য রয়েছে। ক্লাস সিক্সে এগুলো আমি লিখিয়ে নিয়েছিলাম। জিতেনবাবু মনে আছে, আমাদের বাংলা পড়াতেন? উনি একদিন বলেছিলেন, কে জানে, তোদের মধ্যে কেউ হয়তো একদিন নোবেল প্রাইজ পেয়ে যেতে পারে–
একথা শুনে অনেকে হেসে উঠল।
উৎপল একটু চুপ করে থেকে বলল, ক্লাস সিক্সে ব্যাপারটা আমি ঠাট্টা বলে ভাবিনি। তাই যারা নোবেল প্রাইজ-টাইজ পেতে পারে বলে আমার মনে হয়েছিল, তাদের দিয়ে এই খাতাটায় কিছু লিখিয়ে নিয়েছিলাম। তার মধ্যে শান্তনুর একটা লেখা ছিল আমার প্রিয় বই। ও আরণ্যক-এর কথা লিখেছিল। সেই লেখার প্রথম কয়েকটা লাইন আজকের দিনটার সঙ্গে অদ্ভুত ভাবে মিশে গেছে। আমি পড়ে শোনাচ্ছি–
শান্তনু নোবেল প্রাইজ পায়নি। জামশেদপুরে টিসকোয় ম্যানেজার। সেই ছোটবেলা থেকেই বাংলায় মাস্তান ছিল। নানা জায়গায় বিতর্ক প্রতিযোগিতায় প্রাইজ পেত।
উৎপল পড়তে শুরু করল, স্মৃতি সততই সুখের। স্মৃতি যেন অধরা মাধুরী। ধরা-ছোঁওয়ার বাইরে বলেই স্মৃতি এত আকাঙ্ক্ষার। এমন কোনও জীবন নেই যে-জীবনে কোনও পিছুটান নেই। স্মৃতির পথ আমাদের পৌঁছে দেয় অতীতের নানা সুখের দিনে, ভালোবাসার দিনে।
