অতএব সমস্ত চেতনা কেন্দ্রীভূত হল বইয়ের পাতায়…ক্রমে-ক্রমে পেরিয়ে গেল লুসি ও উন্মাদ আশ্রমের রোগী রেনফিল্ডের অধ্যায়। যখন রেনফিল্ডের মৃত্যু হল তখন আমার চমক ভাঙল দেওয়াল-ঘড়ির ঘণ্টার শব্দে। সন্ধে সাতটা বাজে। অবাক হলাম, শমিতা আমাকে একবারের জন্যেও ডাকতে আসেনি বলে। বইটা রেখে শোওয়ার ঘরে গিয়ে দেখি ও তখনও ঘুমোচ্ছে। বেশবাসের পারিপাট্য স্বভাবতই আয়ত্তের বাইরে। সুন্দর ফরসা মুখের পর তিন ভাঁজওয়ালা নিটোল গলা..আমার মনে পড়ল অসহায় লুসির কথা। বইয়ের গল্পটার মতো এখানেও শমিতার মাথার কাছের জানলাটা খোলা। কিন্তু বাইরের আঁধারি আকাশে কোনও উড়ন্ত স্থৈর্যশীল কালো বাদুড়কে দেখা যাচ্ছে না। ঠিক ওই মুহূর্তে একটা বাদুড়ের অভাব অনুভব করলাম। যদি একটা বাদুড় পেতাম! তখনই মনে মনে ঠিক করলাম, একটা বাদুড় আমাকে জোগাড় করতেই হবে–তা সে যেমন করেই হোক!
কিছুক্ষণ দ্বিধার পর ঝুঁকে পড়লাম শমিতার ওপর। আমার ঠোঁট আলতোভাবে স্পর্শ করল ওর ঠোঁট, তারপর ধীরে-ধীরে নেমে এল গলায়…।
এক ভয়ংকর আর্তচিৎকার করে বিস্ফারিত চোখে এক ঝটকায় উঠে বসল শমিতা। আমি মুহূর্তের জন্যে দিশেহারা হয়ে পড়লেও নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে সময় লাগল না। চেষ্টা করে কাষ্ঠহাসি হাসলাম।
ও, তুমি! শমিতার নিশ্বাস গম্ভীর হয়ে উঠেছে। ও শাড়িটাকে ঠিকভাবে শরীরে জড়িয়ে নিতে লাগল।
হ্যাঁ। অস্পষ্ট স্বরে জবাব দিলাম । স্বপ্ন দেখছিলে বুঝি? অমন চমকে উঠলে যে?
শমিতা কিছুক্ষণ নীরব। তারপর মুখ খুলল, না, মনে হল কেউ যেন আমার গলায় সুড়সুড়ি দিচ্ছে–তাই।
সতর্ক স্বরে বললাম, কী জানি! যাকগে, তুমি এবার ওঠো, আমি একটু ক্লাবে যাব।
শমিতা খাট থেকে নেমে দাঁড়াল। ওর মনের পরদায় সংশয়ের ছায়াটা তখনও বোধহয় পুরোপুরি মিলিয়ে যায়নি।
দ্বিতীয় রাতঃ মিনা হার্কার
আমি শুয়ে। শমিতাও শুয়ে।
আমি জেগে। ও ঘুমিয়ে।
সারাদিনে দু-চার পেগ ও কিছু স্ন্যাকস্ ছাড়া আমার পেটে আর কিছু পড়েনি, কিন্তু তার জন্যে অস্বস্তি বা কোনওরকম কষ্টও অনুভব করিনি। তবে একটা মানসিক হোঁচট খেয়েছি ক্লাবে ঢুকেই।
ক্লাবে যেতেই প্রথম নজরের মিলন অভিজিতের সঙ্গে। ওকে একপাশে ডেকে নিয়ে গিয়ে সন্ধের উত্তাল চিন্তাটার কথা চুপিচুপি বলেছি, আমাকে একটা বাদুড় কিনে দিতে পারিস?
দীর্ঘ এক মিনিট আমরা নীরব। কিন্তু অভিজিতের ছলছলে ঘোলাটে চোখ আমাকে পাগল, নির্বোধ ইত্যাদি শব্দে নিঃশব্দে গালাগাল দিতে লাগল।
অবশেষে উচ্চারণ করল, রাবিশ।
আর ঠিক সেই মুহূর্তেই অভিজিতের প্রতি আমার চিরন্তন ঘৃণার জন্ম হল। কারণ মুখে বললেও ওর অভিব্যক্তি আমাকে জানিয়ে দিয়েছে–ওর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে বলে দিয়েছে– ওর মনের ভাব। সুতরাং বাদুড় কেনার কার্যকারণ ওকে খুলে বলার প্রবৃত্তি আমার হয়নি। ক্লাব থেকে সটান ফিরে এসেছি। মনে মনে ভেবেছি সব ব্যবস্থা আমাকে নিজেই করতে হবে। কারণ শমিতাকেও যখনই কিছু বলতে গেছি, ও বিস্ময়ভরা চোখ মেলে তাকিয়েছে, তারপর হেসে উঠেছে। (যতসব আজগুবি চিন্তা!)।
শমিতার এই বদ্ধমূল অবিশ্বাস ক্রমশ আমাকে একরোখা করে তুলেছে। আমার জীবনের ধ্যান, জ্ঞান, উদ্দেশ্য সব কেন্দ্রীভূত হয়েছে ড্রাকুলার অস্তিত্ব প্রমাণের সাফল্যে। কোনওকালেই বেশি কথার মানুষ আমি ছিলাম না। তাই বউয়ের সঙ্গে অযথা তর্ক করিনি। মনকে সংযত করে পালটা প্রশ্ন করেছি, ভগবানকে কোনওদিন চোখে দেখেছ?
আমার বক্তব্যে শমিতা কয়েক মুহূর্ত বিহ্বল। তারপর হালকা সুরে বলেছে, উঁহু, কেউই দেখেনি।
অথচ ভগবানে বিশ্বাসের ব্যাপারে তোমাদের কমতি নেই!–আমার তিক্ত স্বর শমিতার মস্তিষ্কে যেন কেটে কেটে বসল। ও কোনও জবাব দিতে না পেরে ইতস্তত করতে লাগল।
আর যখনই আমি কাউন্ট ড্রাকুলার কথা বলছি, তখনই তোমার সমস্ত অবিশ্বাস ঝরে পড়ছে, ব্যঙ্গ করেছ আমার নির্বুদ্ধিতাকে নিয়ে, তাই না? যেহেতু কাউন্ট ড্রাকুলাকে তুমি চোখে দ্যাখোনি!
আমার রূঢ় স্বরে শমিতা হয়তো আঘাত পেল। কিন্তু আমি নিরুপায়। ওর কাঁপা ঠোঁটে এক পলক চোখ রেখে শোওয়ার ঘরে গিয়ে খাটে গা এলিয়ে দিয়েছি। বইটার অসমাপ্ত অধ্যায়গুলো পড়তে শুরু করেছি। রাতে কিছু মুখে দেওয়ার প্রবৃত্তি আর হয়নি।
বইটা শেষ করে কিছুক্ষণ ঝিম মেরে বসে রইলাম। যথারীতি বইয়ের পরিণতি আমার মোটেই ভালো লাগেনি। ইংরেজি ফিল্মগুলোতে যে-পরবর্তী অধ্যায়ের আশ্বাস পেয়েছিলাম, এখানে তার আভাসমাত্র নেই। বরং এখানে কাউন্ট ড্রাকুলা পরাজিত ও ধ্বংস হয়েছে সামান্য মানুষের হাতে! অবাস্তব তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু মিনা হার্কারের অধ্যায় আমাকে মুগ্ধ করেছে।
বইটা রেখে শুয়ে পড়লাম। ঘুম আসতে দেরি হল। ভাবতে লাগলাম অদূর ভবিষ্যতের কথা, অভিজিতের কথা, শমিতার কথা, আর সবশেষে কাউন্ট ড্রাকুলার কথা।
কালো বাদুড় ও কালো পোশাক
হাটবারে পাখির বাজার তন্নতন্ন করেও কোনও বাদুড়ের সন্ধান পাইনি। অনেকে অবাক হলেও বাদুড়ের বদলে পাচা হলে চলবে কি না প্রশ্ন করেছে–কোনও জবাব দিইনি। বহু অনুসন্ধানের পর একজন দোকানদার স্বতঃপ্রণোদিত হয়েই আমার প্রয়োজনের কারণ জানতে চেয়ে সাহায্য করতে রাজি হয়েছে। আমি তাকে শুধু প্রয়োজনটাই (প্রয়োজনের কারণ নয়) জানিয়েছি। অবশেষে দীর্ঘ দু-ঘণ্টার জন্যে আমাকে প্রতীক্ষায় রেখে সে কালো কাপড়ে ঢাকা একটা খাঁচা নিয়ে ফিরে এল। কিঞ্চিৎ দরাদরির পর সে পারিশ্রমিক, খাঁচা ও পাখি (পাখি?) বাবদ পঁয়ষট্টি টাকা চেয়ে বসল। আমি আর কোনওরকম প্রতিবাদ না করে টাকাটা তার হাতে তুলে দিয়ে খাঁচা নিয়ে বাড়ি ফিরে এসেছি। শমিতাকে না জানিয়ে খাঁচাটাকে চুপিচুপি লুকিয়ে রেখেছি খাটের নীচে। তারপর চোখ থেকে সানগ্লাসটা খুলে (ইদানীং সানগ্লাস ছাড়া আমি দিনের বেলায় মোটেই রাস্তায় বেরোতে পারি না) বসবার ঘরের চেয়ারে বসে চোখ বুজে বিশ্রাম করছি, শমিতা এসে ঘরে ঢুকল।
