প্রথম পর্বে জোনাথান হার্কারের কাহিনি আমাকে মুগ্ধ করল। কিন্তু যেখানে সে কাউন্ট ড্রাকুলাকে বেলচা দিয়ে আঘাত করল, সেখানে মনে হল আমার সমস্ত শরীর যেন ঝনঝন করে কেঁপে উঠল। রক্তস্রোত হয়ে উঠল চঞ্চল।
চট করে উঠে বসলাম। ঘুমন্ত শমিতাকে ধাক্কা দিয়ে ডাকতে শুরু করলাম।
শমি–শমিতা।
কী?–ঘুমজড়ানো স্বরে ও উত্তর দিল। তারপর পাশ ফিরে আবার মাথা গুঁজে দিল বালিশের মধ্যে।
আমি ক্ষান্ত হলাম না। আবার ওকে আঁকুনি দিয়ে ডাকলাম। এবারে ও উঠে বসল। ঘড়িতে রাত দুটোর ঘণ্টা বাজল।
কী, ব্যাপার কী?–একটু রুক্ষ স্বরেই প্রশ্ন করল ও।
আমি হাতের বইটার দিকে ইশারা করে বললাম, তোমার গাঁজাখুরি শব্দটা এবারে তুমি পালটাতে বাধ্য হবে। জানো, বইটার প্রথম পঞ্চাশ-ষাট পৃষ্ঠায় কী লেখা আছে?
শমিতা আমার মুখের দিকে হাঁ করে বিহ্বল দৃষ্টিতে চেয়ে রইল। রাত দুটোয় কোনও স্বামী যে-কোনও স্ত্রী-কে ঘুম ভাঙিয়ে এই ধরনের উদ্ভট প্রশ্ন করতে পারে তা সম্ভবত ওর কল্পনাতেও আসেনি।
আমি হাসলাম। বললাম, দ্যাখো, এই জায়গায় পড়ে দ্যাখো।
এবং একইসঙ্গে বইয়ের একটা বিশেষ পাতা (যে-পাতায় লেখা আছে, কাউন্ট ড্রাকুলা রাতের অন্ধকারে কালো পোশাকে শিকার করতে বেরোচ্ছে–টিকটিকির মতো প্রাসাদের দেওয়াল বেয়ে…) ওর বিস্মিত চোখের সামনে মেলে ধরলাম।
এই রাত দুটোয় রসিকতা করার কোনও মানে হয়?শমিতার সুরে ঈষৎ কাঠিন্যের পরশ।
সব জিনিসকে রসিকতা বলে মনে কোরো না।
আমি এখনও তোমার মতো পাগল হইনি!বলে শমিতা শুয়ে পড়ল।
ওই একটা মুহূর্ত আমি নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিলাম। কী ঘটত জানি না। কিন্তু সামনের আয়নায় আমি আমার নৃশংস প্রতিবিম্ব দেখতে পেলাম, এবং সংযত হলাম। বুকের ভেতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। আলো নিভিয়ে বইটাকে মাথার কাছে রেখে শুয়ে পড়লাম। কিন্তু ঘুম সহজে এল না। বিপন্ন জোনাথানের সঙ্গে কাউন্টের মানসিক সংঘাতের মুহূর্তগুলো শ্লথগতি চলচ্চিত্রের মতো তারিযে-তারিয়ে উপভোগ করতে লাগলাম। নাঃ, অভিজিৎ সান্যাল আমার কাছ থেকে অন্তত একটা ধন্যবাদ আশা করতে পারে।
দ্বিতীয় দিনঃ বিপন্ন সকাল
সকালে ঘুম ভাঙল এক আকস্মিক বিপর্যয়ের মধ্যে দিয়ে। স্বপ্ন দেখছিলাম কি না জানি না, মনে হল বুকের কাছটা যেন হঠাৎই শুকিয়ে কাঠ হয়ে আসছে। এক অদ্ভুত চোরাবালিতে আমার শরীরটা ক্রমশ অদৃশ্য হয়ে যেতে চাইছে। কোনওরকমে চারপাশের জমি আঁকড়ে আমি মাথাটাকে ওপরে ভাসিয়ে রাখতে চেষ্টা করছি। বিস্ময়াহত দৃষ্টি যখন মেলে ধরেছি, তখন আর সইতে পারিনি। এক শীৎকৃত আর্তনাদে মুহূর্তের মধ্যে লাফিয়ে উঠলাম। মাথার কাছের জানলা (বিশ্বাসঘাতক কোথাকার!) দিয়ে সূর্যের প্রখর রোদের এক পেনসিল-প্রমাণ রশ্মিরেখা এসে আছড়ে পড়েছিল আমার চোখের ওপর। সেই আলো আমাকে যেন হঠাৎই বেসামাল করে দিয়েছে।
প্রকৃতিস্থ হতে কিছুক্ষণ সময় লাগল। অবশেষে যখন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে করমচা-লাল চোখজোড়াকে পরখ করছি, তখনই আমার পাশে ভেসে উঠল শমিতার প্রতিবিম্ব।
কী হয়েছে?
দেওয়ালঘড়ি ঢং-ঢং শব্দে সকাল নটার সঙ্কেত ঘোষণা করল। পলকের জন্যে চমকে উঠেছিলাম। নিজেকে সামলে নিয়ে জবাব দিলাম, হঠাৎ কেমন ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।
নিশ্চয়ই এই বইটা পড়ার জন্যেই হয়েছে। শমিতা দৃঢ় স্বরে বলল। এবং অপার-অবাক দৃষ্টিতে আমার মুখের দিকে চেয়ে রইল। কারণ, আমি তখন উন্মত্তের মতো অট্টহাসিতে ফেটে পড়েছি।
আধ মিনিটের পরও আমার হাস্যকর অবস্থার পরিবর্তন না দেখে শমিতা চলে গেল নিজের কাজে হয়তো রাগ করেই। কিন্তু কী করে ওকে বোঝাই, বইটার সঙ্গে আমার যে-আত্মীয়তার সম্পর্ক, তাতে বই পড়ে ভয় পাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। বরং এই পার্থিব দুনিয়ার প্রাকৃতিক ব্যাপারগুলো আমাকে কেমন অস্বস্তিতে ফেলছে। সূর্যের কিরণ আমি আর সহ্য করতে পারছি না (যেমন কাউন্টও পারেনি দিনের আলো সহ্য করতে)।
বেশ কিছুক্ষণ চিন্তার পর সিদ্ধান্ত নিলাম, অফিসে যাব না। শমিতা প্রথমে গজগজ করলেও পরে খুশি হল। বলল, চলো, তা হলে একটা ছবি দেখে আসি। আমি সটান সেই প্রস্তাবকে না মঞ্জুর করে দিয়ে উত্তর দিলাম, উঁহু, সারা দুপুর বসে-বসে বইটা শেষ করব। হ্যাঁ, আর একটা কথা, দুপুরে আমার রান্না কোরো না খিদে নেই।
তার মানে?–শমিতা যথেষ্ট অবাক হল।
মানে খিদে নেই ব্যস। বলে দ্রুত পা ফেলে বাথরুমে গিয়ে ঢুকলাম।
মনে পড়ল, জোনাথান হার্বার কখনও কাউন্টকে খাওয়ার টেবিলে দেখেনি। কারণ? কী জানি, বলতে পারি না…।
দ্বিতীয় দিনঃ অবসন্ন দুপুর
শরীরের অভ্যন্তরে তখন বেপরোয়া সাইক্লোন বয়ে চলেছে। দুটো কারণে। এক, খিদের জ্বালায়। দুই, জাহাজের ক্যাপ্টেনের রোজনামচাটা পড়ে (যেখানে জাহাজ থেকে একের পর এক যাত্রী এবং নাবিকরা অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে কাউন্টের শিকার হয়ে) মনের মধ্যে অনুভব করছি এক অজানা উল্লাস। অনেকটা কৃতিত্বের অথবা যুদ্ধজয়ের উল্লাসের মতো। হয়তো কাউন্টের এই অভাবনীয় কার্যকলাপ আমাকে মুগ্ধ করেছে।
শমিতা শোওয়ার ঘরে প্রাত্যহিক দিবানিদ্রায় মগ্ন। আমি বসবার ঘরে বসে বইটা গোগ্রাসে গিলছি। ঠিক করেছি, আজ সন্ধ্যায় ক্লাবে যাওয়ার আগে বইটা পুরোটা না পারলেও প্রায় শেষ করে ফেলব। কারণ, অভিজিৎ হয়তো আমার মতামত জানতে চাইবে।
