অভিজিৎবাবুর ফোন এসেছিল।
কী বলল?
আজ রাতে আসবেন।
চমকে উঠলাম। আনন্দ, ঘৃণা, তৃপ্তি, একসঙ্গে প্রকাশ পেল আমার উত্তরে, তাই বুঝি? কেন?
কী জানি, শমিতা নির্বিকার। তবে চলে যেতে গিয়ে ও ঘুরে দাঁড়িয়ে বলে গেল, পাশের বাড়ির ওদের তোমার এই ড্রাকুলাপুঙ্গবের কথা (শমিতা, খবরদার, মুখ সামলে কথা বলো! নইলে এক টানে তোমার ওই কচি গলা ছিঁড়ে…) বলছিলাম। সব শুনে ওরা তো হেসেই খুন (খুন? হ্যাঁ, তাই তো বলে একে–)! শেষে বলল, তোমার নাকি রাঁচির হাসপাতালের সাহায্য নেওয়া (পাগল রেনফিল্ড? না, রেনফিল্ডকে আমার ভালো লাগে না। বিশ্বাসঘাতক কোথাকার!) দরকার।
আমি জানি, এসব শুনে আমার প্রচণ্ড উত্তেজিত হওয়া উচিত ছিল। উচিত ছিল রাগে পাগল হয়ে শমিতার গলা টিপে ধরা–কিন্তু দুইয়ের কোনওটাই আমি করলাম না। খুব শান্তভাবে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম, বললাম, শমি, পাশের বাড়ির ওদের আর কয়েকদিন পরে ওই একই প্রশ্ন করলে দেখতে, ওদের উত্তরটা একটু অন্যরকম হত।
শমিতা কেন জানি চুপ। দৃষ্টি দিশেহারা।
তৃতীয় রাত : অভিজিৎ সান্যাল
অভিজিৎ যখন এল, আমার শোওয়ার ঘরের দেওয়াল-ঘড়িতে ঢং-ঢং শব্দে রাত নটা বাজল।
শমিতাকে সেই সন্ধেবেলাতেই পাঠিয়ে দিয়েছি পাশের বাড়ির ওদের সঙ্গে গল্প করতে। বলেছি, রাত দশটার আগে যেন না ফেরে, কারণ, অভিজিৎ সান্যালের সঙ্গে আমার কিছু জরুরি আলোচনা আছে। আমি চাই না সে-সময়ে ও হাজির থাকুক ইত্যাদি ইত্যাদি।
ও কোনও প্রতিবাদ না করেই চলে গেছে।
বসবার ঘরের দরজা ভেজানো ছিল। আমি ছিলাম প্রতীক্ষায় অভিজিতের প্রতীক্ষায়। ও প্রথমে বসবার ঘরের দরজা খুলেই দেখল ঘন অন্ধকার, (যে-অন্ধকার বরাবর আমাকে প্রতারিত করে এসেছে, কিন্তু আজ আমি ঈপ্সিত বস্তুর সন্ধান পেয়েছি। অন্ধকারকে আমি এখন, এই মুহূর্তে, পরমাত্মীয় বলে ভাবতে পারছি…) এবং দেখেই থামল।
অরুণাভ–অরুণ!
অভিজিতের স্বর যেন একটু কাঁপা কাঁপা মনে হল।
আমি স্পষ্ট স্বরে জবাব দিলাম, কী রে, তুই এসেছিস?
সঙ্গে-সঙ্গেই দেওয়াল-ঘড়ির ঘণ্টায় সশব্দে রাত নটার সংকেত পড়ল।
অভিজিৎ আমার গলার শব্দ অনুসরণ করে শোওয়ার ঘরে এসে ঢুকল। তখনই দেখল, দেওয়ালে যে-ঈষৎ আলোর ইশারা দূর থেকে চোখে পড়েছিল, তার উৎস এক কোণের টেবিলে বসানো একটা মোমবাতি। এবং ঘরের সব জানলা-দরজা বন্ধ।
হঠাৎই একটা ডানা ঝাপটানোর ঝটপট শব্দ শোনা গেল।
চমকে উঠল অভিজিৎ। দেখল, একটা কালো ছায়া হাওয়ায় ভর করে ক্ষিপ্রভাবে ভেসে বেড়াচ্ছে শোওয়ার ঘরের আকাশে। ভয়ে চোখ ঢাকল অভিজিৎ। বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো ঝটকা মেরে ঘুরে দাঁড়াল। লক্ষ্য, দরজা।
ঠিক তখনই আমাকে ওর চোখে পড়ল। শোওয়ার ঘরের বন্ধ দরজায় হেলান দিয়ে তৃপ্ত অভিব্যক্তি নিয়ে আমি দাঁড়িয়ে আছি।
আমার গায়েও লম্বা কালো-লাল আলখাল্লার দিকে তাকিয়ে ওর মুখ দিয়ে অস্ফুট স্বর বেরিয়ে এল, মাই গড!
আমি যেন হাওয়ায় ভেসে চট করে ওর সামনে এসে দাঁড়ালাম। মুচকি হাসলাম। বললাম, তুই এসেছিস বলে ধন্যবাদ।
হঠাৎ কাঁধের কাছে কোনও স্পর্শে লাফিয়ে উঠল অভিজিৎ।
কালো ছায়াটা ওকে পাশ কাটিয়ে সামনের দেওয়ালে গিয়ে ধাক্কা খেল–পড়ে গেল মাটিতে। আবার উঠল।
কী কী ওটা? –ওর গলার স্বরে কি ভয় ও বিস্ময় যুগপৎ ক্রিয়া করছে?
বললাম, বাদুড়–আজই কিনে এনেছি।
হোয়াট? রাগে ফেটে পড়ল অভিজিৎ : কিনে-এনে-ছিস?
হ্যাঁ। আর এই কালো পোশাকটাও।–মাথা নীচু করে আলখাল্লাটা দেখালাম : এখন বল, কেমন মানিয়েছে?
আমার হাসি অভিজিৎকে সংক্রামিত করতে পারল না। ও গম্ভীরভাবে বলল, এসব কাণ্ডকারখানার জন্যেই কি অফিস যাওয়া বন্ধ করেছিস? অল দিজ ননসেন্স?
শাট ইয়োর ট্র্যাপ।আমি হিসহিস করে বলে উঠলাম, এর মর্ম তুই বুঝবি না। অন্ধকারের আনন্দ আলোর আনন্দের চেয়ে কিছু কম নয়! তুই তো ড্রাকুলা পড়েছিস।
ব্যস। আর কিছু বলে ওঠার আগেই অভিজিৎ উন্মাদের মতো অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। ওর হাসিতে আলো-আঁধারিতে উড়ন্ত বাদুড়টাও বুঝি চমকে উঠল। মোমবাতির কাঁপা আলো চকিতে পিছলে গেল আমাদের যুযুধান মুখে। হাসতে-হাসতেই নিজের মৃত্যু পরোয়ানায় সই করল অভিজিৎ। বলল, ওঃ বয়! কান্ট য়ু আন্ডারস্ট্যান্ড ফ্লু হ্যাভ গন রাউন্ড দ্য বেন্ড?
আমার পায়ের নখ থেকে চুল পর্যন্ত শিরশির করে উঠল। উড়ন্ত বাদুড়ের ছায়া কেঁপে উঠল আমার রক্তিম চোখে। একটা ঝাপসা পরদায় ভাসতে লাগল অভিজিতের আতঙ্ক-বিকৃত মুখ…।
সামনে পা ফেলার আগে বললাম, আমি দুঃখিত, অভিজিৎ..।
অভিজিতের সঙ্গে সেই আমার শেষ কথা।
এবং শেষ রাতঃ শমিতা
রাত দশটা। বসবার ঘরের দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকল শমিতা।
ঘর যথারীতি এখনও অন্ধকার।
আমার নাম ধরে ডাকতে-ডাকতে অনিশ্চিত পায়ে ও চলে এল শোওয়ার ঘরে। মোমবাতিটা জুলতে-জুলতে ছোট হয়ে এসেছে। বাদুড়টাও ক্লান্ত ডানা নিয়ে ঘরের চার দেওয়ালের মধ্যে উড়ে বেড়াচ্ছে। আর আমি? আমি সেই কালো আলখাল্লা পরেই টান-টান হয়ে বিছানায় শুয়ে আছি।
শমিতা প্রথমে বাদুড়টাকে দেখে প্রচণ্ড এক চিৎকার করে উঠল। কিছুক্ষণ ছোটাছুটি করল ঘরের মধ্যে। অবশেষে থামল এসে বিছানার কাছে। হাঁপাতে-হাঁপাতে আমাকে ডাকল, এই, শুনছ, ওঠো।
ওর গলা থরথর করে কঁপছে।
