শমিতা যথারীতি বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে জবাব দিল, ডায়েরি আমার জন্যে।
বছরের শুরু। অতএব শমিতার দোষ নেই।
প্রয়োজনের অতিরিক্ত সাবধানতা দেখিয়ে প্যাকেটটা খুলে বইটা বের করলাম। তুলে ধরলাম ওর চোখের সামনে। প্রচ্ছদের বিবর্ণ মেয়েটির চোখের দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে শমিতা বলে উঠল, তুমি আর আমি যে-সিনেমাটা দেখেছিলাম সেই বইটা?
আমি অভিজিতের কাছ থেকে আহরিত জ্ঞানের স্মৃতি থেকে বললাম, না, সেটা ড্রাকুলা চরিত্রের ওপর নির্ভর করে ওয়ার্নার কোম্পানির লেখা গল্প। আর এটা ব্রাম স্টোকারের লেখা, এক এবং অদ্বিতীয় ক্ল্যাসিক ড্রাকুলা।
শমিতা বলে উঠল, যত সব গাঁজাখুরি গপপো।
হঠাৎ কী হল জানি না, মনে হল আমার পা থেকে মাথা পর্যন্ত সমস্ত শিরা-উপশিরা টনটন করে উঠল। মাথার মধ্যে ঘটে গেল হাজার-হাজার মেগাটনের বিস্ফোরণ। খাট ছেড়ে কাঁপতে কাঁপতে সোজা হয়ে দাঁড়ালাম। ডান হাতের আঙুল উঁচিয়ে শমিতাকে লক্ষ করে সংযত স্বরে বলতে চেষ্টা করলাম, গাঁজাখুরি? অমন ছেলেমানুষের মতো মন্তব্য আর কোরো না। এবারের মতো ক্ষমা করলাম।
আমার গম্ভীর স্বরে শমিতা অবাক হয়ে গেল, থতোমতো খেয়ে গেল। কিছুক্ষণ আমার, আমার হাতের বইটার দিকে তাকিয়ে থেকে তাড়াতাড়ি ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল।
মাথার চুলে হাত চালিয়ে বইটা খাটে নামিয়ে রেখে এক গ্লাস জল ঢেলে নিলাম কুঁজো থেকে। ঢকঢক করে গিলে ফেললাম। খাটে ফিরে এসে বসতেই ড্রাকুলার প্রচ্ছদে চোখ পড়ল। প্রথমে লক্ষ করিনি, এখন দেখলাম, মেয়েটির উন্মুক্ত কাঁধে রুপোলি নখের একটা হাত। হাতের মালিক পশ্চাৎপটের অন্ধকারে অদৃশ্য।
ড্রাকুলা-সংক্রান্ত গোটা চার-পাঁচ ছবি আমি দেখেছি। শমিতা বিয়ের পরে আমার সঙ্গে একটা ছবিই দেখেছে–আর সর্বক্ষণ আমার কানের কাছে বিড়বিড় করেছে, উদ্ভট-আজগুবি কল্পনারও একটা সীমা আছে। এসব ছেলেভোলানো গল্প ইত্যাদি। সুতরাং ড্রাকুলা-সংক্রান্ত পরবর্তী ছবিগুলোতে আমি একাই গিয়েছি। মনে-মনে কেমন একটা রোখ চেপে গিয়েছিল, শমিতাকে কাউন্টের অস্তিত্বে বিশ্বাস করাবই। রোখের কারণ বলতে পারি না।
ছোটবেলাকার কয়েকটা কথা আমার বেশ মনে পড়ে। ঘটনাগুলো ছোটখাটো হলেও ভুলতে পারি না।
একবার আমাদের গ্রামে নররাক্ষস এসেছিল খেলা দেখাতে। ধবধবে একটা সাদা পায়রা নিয়ে লোকটা কাঁচাই ছিঁড়ে-ছিড়ে খাচ্ছিল, আর খেতে-খেতেই রক্তাক্ত মুখে নানারকম অঙ্গভঙ্গি করছিল। তার পাশের লোকটি বারবার চেঁচিয়ে বলছিল, বাবুমশায়েরা, ইয়া আর যে পারিব, তারে আমরা দশ টাকা দিব। বাবুমশায়েরা– আমি আর থাকতে পারিনি। দশ বছরের শরীরটাকে দর্শক বৃত্তের পরিধি ছাড়িয়ে ভিতরে নিয়ে গিয়েছিলাম। বলেছিলাম, আমি পারব। এবং আমার সেই পুঁচকে সাহসের ঢঙ দেখে দর্শক তথা কুশীলব মহলে প্রচণ্ড অট্টহাসির রোল পড়ে গিয়েছিল। তখন অপমানে ক্ষোভে আমার চোখ ফেটে জল বেরিয়ে এসেছিল। অন্ধের মতো ছুটতে শুরু করেছিলাম বাড়ির দিকে।
বাড়ি ফিরে মা-কে সাতকাহন করে সে-ঘটনা শুনিয়েছি। মা-ও যথারীতি সান্ত্বনা দিয়ে আমাকে ভুলিয়েছে। কিন্তু সেদিনকার অপমান আমি আজও ভুলিনি।
অভিজিৎ আমার ছোটবেলার বন্ধু। একমাত্র ওরই সঙ্গে এই বয়েসেও আমার যোগাযোগ আছে। মনে পড়ে, সন্ধের আঁধারে যখন আমরা লুকোচুরি খেলতাম, তখন আমার লুকোনোর প্রিয় জায়গা ছিল বরাটদের ভাঙাচোরা প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ। কারণ, বাদুড়, পাচা এবং অন্ধকার (তা ছাড়া না জানি আরও কত কী!)–এই তিনের ভয়ে আমার অসমাসহসী বন্ধুবান্ধবরাও কেউই ভাঙা বাড়িতে ঢুকত না। অন্ধকারে গাছের আড়াল দেওয়া কাঁচা রাস্তায় দাঁড়িয়ে ওরা তারস্বরে চিৎকার। করত, অরুণ–অরুণ-বেরিয়ে আয়!
সুতরাং অবশেষে আমারই জয়লাভ।
এই যে অন্ধকার-আসক্তি, এটা ক্রমশ একটা নেশার মতো আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। কিন্তু তবুও সবসময়ই মনে হয়েছে অন্ধকার আমার প্রত্যাশা পূর্ণ করেনি, আমাকে সে ফাঁকি দিয়েছে। সেইজন্যে মাঝে-মাঝে অন্ধকারের ওপর প্রতিশোধ নিতে ইচ্ছে করে। আমাকে যে-সুযোগ (কী সুযোগ জানি না) থেকে সে বঞ্চিত করেছে, সেই সুযোগের ফলকে আয়ত্ত করে ইচ্ছে করে, চিৎকার করে বলি, তোমরা দ্যাখো, আমি প্রাক্তন পার্থিব শ্রীঅরুণাভ দত্তগুপ্ত…।
ক্রি-রি-রিং–ক্রি-রি-রি-রিং—
চমকে উঠলাম। টেলিফোন।
এগিয়ে গিয়ে রিসিভার তুলে নিলাম।
৪৫-৯৫৯৩। অরুণাভ দত্তগুপ্ত বলছি।
শালা, তোর বাবা বলছি।-ও-প্রান্ত থেকে অভিজিৎ সান্যালের স্বর ভেসে এল, বসে-বসে কী করছিস? ড্রাকুলা?
এক পলক চোখ রাখলাম বইটার ওপর। বললাম, না, এখনও শুরু করিনি।
অপদার্থ! তা হলে শোন, একটা কথা বলি! ঠিক রাত বারোটায় বইটা শুরু কর। কিন্তু ঝট করে শেষ করিস না যেন। বেশ তারিয়ে-তারিয়ে নেশা করার মতো রোজ পড়বি। বুঝলি?
হুঁ।
যাকগে, কাল ক্লাবে আসছিস তো? একটু খাওয়াটাওয়া যাবে।
ঠিক আছে, যাব। রিসিভার নামিয়ে রাখলাম। এগিয়ে এসে ড্রাকুলা বইটা হাতে তুলে নিলাম। মনে মনে উচ্চারণ করলাম, আজ রাত বারোটায়…মাত্র আর কয়েক ঘণ্টা বাকি…।
প্রথম রাত : জোনাথান হার্কার
দেওয়ালঘড়ির ঘণ্টার শব্দে লুপ্ত হল শমিতার গভীর নিশ্বাসের ছন্দ। রাত বারোটা। সুতরাং মাথার কাছে বেডসুইচ টিপে জ্বেলে দিলাম রিডিং ল্যাম্প। আয়েশ করে গা এলিয়ে হাতে তুলে নিলাম বইটা বুকের মধ্যে তৃষ্ণার তরঙ্গ উত্তাল হয়ে উঠল।
