তা এইরকম করে, এইরকম দয়া-মায়া অথবা ভালোবাসার মধ্যে, কেটে গেছে আমার চোদ্দটা বছর। অন্তুও এখন চোদ্দো বছরের। এখন ও পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত। আগে যেমন আমার সঙ্গে সবসময় খেলাধুলো করত, অনেকদিন হল আর করে না। রামনাথও বেশ বুড়িয়ে গেছে। মাথার চুল সব সাদা। রাত্রিবেলা বাড়ির দরজায় বসে হাততালি দিয়ে ভজন গায়, জয় জগদীশ হরে, জয় জগদীশ হরে…। আমি ওর পাশটিতে চুপ করে বসে থাকি। শুনি। রামনাথের গায়ের গন্ধ নাকে আসে। রামনাথ মাঝে-মাঝে কথা বলে আমার সঙ্গে। বলে, কী রে ডাম্পি, মন দু খাতা। কেয়া?
আমি রামনাথের চোখে তাকাই। ওর মুখ ঝাপসা দেখায়। বুঝতে পারি, আমার চোখের নজর আর আগের মতো প্রখর নেই। পাশের বাড়ির বুড়ি পুষিটা খুব কাছে এসে না পড়লে আমি ওকে দেখতে পাই না, ওর গন্ধও টের পাই না। ঘ্রাণশক্তিও ক্ষয়ে এসেছে আমার।
বড়দা, ছোড়দা কি মা-পিসিমা বা বউদিরা সদর দিয়ে বাড়িতে ঢুকলেই আমি দোতলার সিঁড়ির মুখে এসে দাঁড়াই। দেখি, সিঁড়ি দিয়ে কে উঠে আসছে। ওপরে উঠে আসা মানুষটাকে আমি সবার প্রথমে চিনতে পারি পায়ের শব্দে। তখনও আমি দাঁড়িয়ে থাকি নিজের জায়গায়। ক্রমশ মানুষটাকে আমি ঝাপসাভাবে দেখতে পাই। তারপর সে খুব কাছে এসে পড়লে পায়ে নাক ঠেকিয়ে খুব জোরে শ্বাস টেনে গন্ধ শুকি। তখন পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হই। না, এ আমার চেনা লোক।
বড়বউদির ঘরে বসে কদিন আগে টিভি দেখছিলাম। হঠাৎই বউদি বড়দাকে বলল, জানো, ডাম্পির চোখে না ছানি পড়ছে।
ও, সেইজন্যেই আমি দেখতে পাই না ভালো করে! কিন্তু আমি যে ভালো করে স্পষ্ট করে কোনও শব্দ শুনতে পাই না, ভালো করে গন্ধ চিনতে পারি না, একটু ছোটাছুটি করলেই যে আমার হাঁপ ধরে, এ সবই কি ছানির জন্যে? মায়ের চোখেও তো ছানি পড়েছিল, পিসিমারও তাই। ওঁরা তো অপারেশান করে সারিয়েছেন। ওঁদের তো কত বয়েস! বরং অন্তু আমার বয়েসিকই, ওর তো কিছু হয়নি!
ছোড়দা আজকাল খুব কম সময় বাড়িতে থাকে। চাকরির পর সন্ধেবেলা কীসব নাকি পড়াশোনা করছে। কিন্তু তাও আমি সারাটা বাড়িতে ছোড়দার গায়ের গন্ধ পাই। সারা গায়ে ছোড়দার নরম হাতের ছোঁয়া পাই।
গতকাল রাতে ছোড়দা, ছোটবউদি আর অন্তু খেতে বসেছিল। আমি খাবার টেবিলের তলায় ছোড়দার পা ছুঁয়ে বসেছিলাম। অন্তু হঠাৎ বলল, বাবা, ডাম্পি বুড়ো হয়ে গেছে, না?
ছোড়দা ছোট্ট করে বলল, হ্যাঁ।
ছোটবউদি বলল, দেখলি না, সেদিন পুষিটাকে দূর থেকে দেখতে পেল না।
অন্তু খেতে-খেতে বলল, ডাম্পি মরে গেলে কী হবে, বাবা? বাড়ি পাহারা দেবে কে? যদি কখনও চোর আসে সেবারের মতো!
ছোটবউদি বলল, সন্তোষদাকে বলো না, একটা অ্যালসেশিয়ানের বাচ্চা দিতে।
ছোড়দা ভাতের গ্রাস মুখে দিয়ে বলল,হুঁ বলব।
কিছু বলতে চাইনি, কিন্তু মুখ দিয়ে ভাঙাচোরা কতকগুলো আওয়াজ বেরিয়ে এল আমার।
ছোড়দা ছোটবউদিকে বলল, ডাম্পির বোধহয় খিদে পেয়েছে, ওর খাবারটা তাড়াতাড়ি দিয়ে দাও।
আশ্চর্য! এই সাধারণ কথাটা কখনও মনে হয়নি আমার। আমি ভেবেছিলাম চিরকাল আমি থাকব এ-বাড়িতে। মা-পিসিমার সঙ্গে। ছোড়দা-বড়দার সঙ্গে। ছোটবউদি-বড়বউদির সঙ্গে। রামনাথের সঙ্গে। অন্তুর সঙ্গে। সবার সঙ্গে।
বোকার মতো ভেবেছি, ছোটবউদি রোজ আমাকে খেতে দেবে। ওই তুলো বের করা সোফায় সবসময় তৈরি হবে আমার বিছানা। আর, সবার গায়ের চেনা গন্ধ নিয়ে রোজ আমি ঘুমোতে যাব।
মা-পিসিমা আমাকে অনেক বকাবকি করেন। কিন্তু ওঁদের ভেতরের ভালোবাসা কি আমি টের পাই না! ওঁদের ছেড়ে যেতে আমার যে কষ্ট হবে। বড়বউদির ঘরে গিয়ে আমি তো প্রায়ই টিভি দেখি। তখন বড়বউদি আদর করে আমাকে। আর আমি টিভি দেখতে পাব না। বড়বউদিকেও না। কাল রাতে রামনাথ সুর করে নতুন গান গাইছিল ও মালিক জাগে, বান্দা সোয়ে। অন্তরমে কভি সুবহ্ না হোয়ে… ওর গান আর শুনতে পাব না। অন্তু, ছোড়দা, ছোটবউদি-ওদের কাউকেই আমি আর…।
আমার কেমন হাঁফ ধরছিল। এতই সহজে একটা ডোবারম্যান অ্যালসেশিয়ান হয়ে যাবে! চোদ্দো বছরের কোনও দাম নেই? এত চেনা প্রিয় সব গন্ধ ছেড়ে কেমন করে চলে যাব আমি! আমার জীবনে কোনও রং নেই–সবটাই সাদা-কালো। কিন্তু এই জীবনটাই তো আমি ভালোবেসেছি।
ছোড়দার পায়ে মাথা ঘষতে লাগলাম আমি। সেইসঙ্গে ওকে ডেকে বললাম, ছোড়দা, শুনছ, তোমাদের ছেড়ে আমি যাব না। কিছুতেই না। ছোড়দা, তোমার কি মনে নেই, অন্তুর আর আমার একসঙ্গে বড় হয়ে ওঠার কথা ছিল? এ-বাড়ি ছেড়ে আমি যাব না–জীবনে না। মানছি, তোমাদের পাঁচভাগের একভাগ আমার জীবন কিন্তু সেটাও তো জীবন, ছোড়দা! আমার ডাকাডাকিতে খাওয়া থামিয়ে মাথা হেলিয়ে টেবিলের নীচে দেখল ছোড়দা। ছোটবউদিকে বলল, এই কাজল, জলদি করো, ডাম্পির সত্যি খুব খিদে পেয়ে গেছে।
ড্রাকুলা
(অনুসারী সময়-লিপি অরুণাভ দত্তগুপ্তের পার্থিব পারিপার্শ্বিকে লেখা কিছু মানসিক চিন্তার প্রতিফলন, অপার্থিব চিন্তার অনুপ্রবেশের সন্ধিক্ষণে যার সমাপ্তি।)
প্রথম দিন : সূত্রপাত
ব্র্যাম স্টোকারের কুখ্যাত (?) ড্রাকুলা আমি পঁয়তাল্লিশের কাঠ-সিঁড়িতে দাঁড়িয়েও পড়িনি শুনে কিঞ্চিৎ মূল্যবান উপদেশ এবং কৃপাবর্ষণ করে (ঈশ্বর, এর এই অনবধানজনিত অপরাধকে ক্ষমা করো বাণী দানও বাদ যায়নি) অভিজিৎ এক কপি বই আমাকে কিনেই দিয়েছিল। দ্বিধা এবং কৌতূহলের দ্বৈরথকে মস্তিষ্কে অনুভব করে সন্ধের মুখেই বাড়িতে ফিরে এসেছিলাম। ফিরে এসে সোজা রান্নাঘরে গিয়ে শমিতাকে ডেকে নিয়ে এলাম। খাটে পাশাপাশি বসে বাদামি কাগজে মোড়া প্যাকেটটা দেখিয়ে প্রশ্ন করলাম, বলো তো, এতে কী আছে?
