টিভি দেখা ছেড়ে আমি চুপচাপ দোতলায় নেমে এলাম। নামতে নামতে অচেনা গন্ধটা নাকে এল। ছোড়দা বা বড়দার কোনও নতুন বন্ধু হতে পারে। ওদের নানান বন্ধুবান্ধব প্রায়ই আসে বাড়িতে। তবে এই বন্ধু হয়তো আগে বাড়িতে আসেনি।
পায়ের খুটখুট শব্দ আর গন্ধ লক্ষ্য করে চলে গেলাম ছোড়দার ঘরে। গিয়ে দেখি রোগা চেহারার একটা ছেলে ঘরের সব জিনিসপত্র হাঁটকাচ্ছে। ছেলেটার মাথার চুল উশকোখুশকো, গায়ে ছেঁড়া জামা, আর মুখ থেকে বিচ্ছিরি গন্ধ বেরোচ্ছে।
দেখলাম, ছেলেটা ছোড়দার টেবিলে রাখা খুচরো টাকাপয়সা তুলে নিল। তারপর তুলে নিল ছোটবউদির হাতঘড়িটা। ওগুলো প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে যখন স্টিলের আলমারির দিকে এগোচ্ছে, তখনই আমি জোরে গর্জন করে উঠলাম।
ছেলেটা যে চুরি করছে সেটা বুঝতে আমার অসুবিধে হয়নি। মা যে দিনরাত ধিক্কার দেন আমি চোর ধরতে পারি না, সেটাও মনে ছিল আমার। সুতরাং আমি ছেলেটার ওপরে আঁপিয়ে পড়তে পারতাম। পারতাম ওর গলায় কিংবা কাঁধে সাংঘাতিক কামড় বসাতে। কিন্তু ছেলেটার ওইরকম অভাবী রুগ্ন চেহারা আমাকে থামিয়ে দিল। দেখেই বোঝা যাচ্ছিল, ওর গায়ে একফেঁটা জোর নেই, একফেঁটা সাহসও নেই। দু-বেলা ঠিকমতো খেতে পায় কি না কে জানে!
আমার দ্বিতীয় গর্জন বোধহয় ছোটবউদি শুনতে পেয়েছিল। আমার নাম ধরে কী হল, ডাম্পি! কী হল, ডাম্পি! বলতে-বলতে কোথা থেকে যেন ছুটে এল। এসেই পালিয়ে যাওয়া ছেলেটাকে দেখে চেঁচিয়ে উঠল চোর, চোর! বলে।
ব্যস, আর যায় কোথায়! সারা বাড়িতে যাকে বলে একেবারে হুলুস্থুলু। বাড়িসুদ্ধ লোকের হইচই চিৎকারের মধ্যেই ছেলেটা ছুটে পালিয়ে গেছে রাস্তায়। কিন্তু বেশিদূর যেতে পারেনি। পাড়ার ছেলেরাই মিনিটখানেক পরে ধরে নিয়ে এল ওকে। আর তার ঠিক আগেই ছোড়দা আর অন্তু ফিরে এল।
ছোড়দা, বড়দা, অন্তু আর দুই বউদি তখন বাড়ির দরজার। আর মা-পিসিমা দোতলার বারান্দায় শরীর ঝুঁকিয়ে দাঁড়িয়ে। রামনাথ গিয়েছিল গলির মোড়ে চোর ধরে নিয়ে আসতে। আমি ছোটবউদির কাছে কাছে ঘুরছিলাম।
ছোড়দাকে ঘিরে পাড়ার বহু লোকের জটলা। ছোঁড়া সবাইকে আমার কথা বলছিল। প্রশংসা করছিল খুব। আমার ভালো লাগছিল। মা নিশ্চয়ই এবার খুশি হবেন।
ঠিক এমন সময় ছেলেদের দঙ্গল চোরটাকে পাকড়াও করে আমাদের বাড়ির গেটে নিয়ে এল। সঙ্গে রামনাথ। সে ছেলেটার কলার ধরে আছে শক্ত করে।
ছেলেটাকে দেখে আমি চমকে গেলাম। এ কী দশা হয়েছে ওর! জামা ফর্দাফাই। সারা গায়ে কালো রঙের ছিটে। রক্তের ছিটে। আমি তো রক্তের লাল রং দেখতে পাই না, কালো দেখি। ওর বাঁ-গাল কেটে রক্ত বেরোচ্ছে। মাথা ঝুঁকিয়ে টলছে। মুখ দিয়ে গোঁ-গোঁ শব্দ বেরোচ্ছে।
এই যে গৌতমদা, ওর পকেটে এগুলো পাওয়া গেছে। পাড়ারই মুখ-চেনা একটা ছেলে ছোটবউদির ঘড়ি আর টাকাপয়সা এগিয়ে দিল ছোড়দার দিকে। হইচই চিৎকার আরও বেড়ে গেল। কেউ বলছে ছেলেটাকে পুলিশে দিতে। আবার কেউ বলছে আচ্ছা করে পিটিয়ে ছেড়ে দিতে।
এরই মধ্যে আবার শুরু হয়ে গেল মার। অসহায় ওই ছেলেটাকে সব্বাই মিলে পেটাতে লাগল। যারা মারছিল তাদের মুখগুলো কী বিচ্ছিরি দেখতে হয়ে গেছে। মুখ কুঁচকে গেছে, দাঁত বেরিয়ে পড়েছে।
আমি ছোড়দার দিকে মুখ তুলে চেঁচিয়ে বললাম, ছোড়দা, ওকে ছেড়ে দাও। ওকে আর মেরো না। মারতে বারণ করো। ছেলেটা মরে যাবে যে!
আমার কথা কেউ বুঝতে পারল না। ছোড়দা সামনে দাঁড়ানো এক বন্ধুকে বলল, দেখছিস, ডাম্পি আবার কেমন চেঁচাচ্ছে। ওর রাগ এখনও কমেনি।
আমি আবার বললাম, জিনিস তো সব পেয়ে গেছ, ছোড়দা! ওকে ছেড়ে দিতে বলো!
আমার কথা কেউ বুঝতে পারল না। তখন আমি চুপচাপ বাড়িতে ফিরে এসে মায়ের খাটের তলায় এক কোণে গিয়ে বসে পড়লাম। ইশ, ছেলেটাকে দেখে যদি আমি চিৎকার না করতাম তা হলে ভালো হত। কী দরকার ছিল আমার চোর ধরার! ছেলেটার কী দশা করবে ওরা কে জানে!
কিছুক্ষণ পর হইচই থেমে গেল। তার একটু পরেই ছোড়দা উঠে এল দোতলায়। আমাকে দেখতে না পেয়ে চেঁচিয়ে নাম ধরে ডাকতে লাগল। শুনলাম ছোটবউদিকে বলছে, দেখলে, এই হচ্ছে ডোবারম্যানের জাত! কী সাহস!
মনে আছে, সেদিন ছোড়দার হাজারটা আদরের ডাকেও আমি সাড়া দিইনি।
আমি চোর ধরায় মা ও পিসিমা খুশি হয়েছিলেন। বাড়িতে যেসব অতিথি আসত তাদের সবিস্তারে শোনানো হত আমার বীরত্বের কাহিনি। আমি লজ্জা পেয়ে সরে যেতাম সামনে থেকে। ওই ছেলেটার কাটা-ছেঁড়া মুখটা মনে পড়ত। আরও লজ্জা করত আমার।
মা আর পিসিমা এই চোদ্দো বছর ধরে কত যে শাসন করেছেন আমাকে। সন্ধেবেলা বা রাত্রিবেলা লোডশেডিং হলে আমার শরীরটা মিশে যায় অন্ধকারে! সেটা কি আমার দোষ! অথচ মা সবসময় আপনমনে গজগজ করেন : কেন যে গৌতম একটা কালো কুকুর নিয়ে আসতে গেল!
আমি তখন অন্ধকার থেকেই চেঁচিয়ে প্রতিবাদ করি : মা, আমার গায়ের রং তো কালো নয়, বাদামি। ছোড়দাকে জিগ্যেস করে দেখো।
কিন্তু কে শোনে কার কথা! সব ব্যাপারেই শুধু আমার দোষ। গা কুটকুট করলে আমি যে মেঝেতে গড়াগড়ি দিই তাতে মা-পিসিমা ভীষণ রাগ করেন। বকাঝকা করেন আমাকে। এতে নাকি ঘরে লোম ওড়ে। তাতে আবার ছোটবউদির অ্যালার্জি হয়। সেইজন্যেই তো ছোটবউদি আমার ছেঁড়া সোফাটায় হাত পর্যন্ত দেয় না। জানি, ঘেন্না করে। তা হলে চারবেলা আমাকে খেতে দাও কেন? কেন ভালোমন্দ দ্যাখো আমার? দয়া করে? দয়া আর ভলোবাসা তো এক নয় ছোটবউদি।
