দাদারা যখন সেজেগুজে অফিসে বেরোয় তখন বাড়িটা কেমন ফাঁকা-ফাঁকা লাগে। দুপুরবেলা মা আর পিসিমা খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়েন, বিশ্রাম নেন। কিন্তু আমার তো ঘুম আসে না। তাই একবার এ-ঘর, আর একবার ও-ঘর করি। বড়বউদি দুপুরে ঘুমোয় না। টিভি দ্যাখে আর সেলাই করে। আমি বড়বউদির পায়ের কাছে গিয়ে বসি। টিভি দেখি। এখন আর টিভির ছবিগুলো তেমন স্পষ্ট দেখতে পাই না। কেমন যেন ঝাপসা দেখায়।
কী আনন্দেই না কেটেছে আমার ছেলেবেলা আর তার পরের দিনগুলো। অন্তু বড় হয়ে উঠতেই ওর সঙ্গে কত খেলা করেছি। ছুটোছুটি। নকল কামড়াকামড়ি। আরও কতরকম খেলা।
বাড়ির কাছেই একটা ছোট পার্ক আছে। আমি, ছোড়দা, অন্তু সেই পার্কে রোজ বিকেলে বেড়াতে যাই। কোনও-কোনও দিন সঙ্গে থাকে রামনাথ। সেখানে আমি আর অন্তু ছুটোছুটি করি। ছোড়দা দূরের বেঞ্চিতে বসে দ্যাখে। আগে আমাকে বল ছুঁড়ে দিয়ে খেলাত ছোড়দা। আমি ছুঁড়ে দেওয়া বলটা এক ছুটে গিয়ে মুখে করে নিয়ে আসতাম। জিভ বের করে হাঁফাতাম। জিভ দিয়ে টপটপ করে ঘাম ঝরে পড়ত।
ছোড়দার মুখেই শুনেছি, এরকম ছুটোছুটি করলে নাকি আমার নখ ক্ষয়ে যায়। তা না হলে নখ যদি খুব বড় হয়ে যায় তা হলে পায়ের আঙুল ব্যথা করবে। পা ফেলে হাঁটতে বা ছুটতে কষ্ট হবে। এখন তো আর আমি তেমন ছুটতে পারি না, তাই নখ বড় হয়ে যায়। তখন সত্যিই পা ব্যথা করে। ভালো করে হাঁটতে পারি না। ছোড়দা বা ছোটবউদি আমার খুঁড়িয়ে-খুঁড়িয়ে হাঁটার ধরন দেখেই সব বুঝতে পারে। তখন ছোড়দা কচির মতো কী একটা যন্ত্র দিয়ে নখগুলো কেটে দেয়। তারপর কী যে আরাম লাগে আমার! ছোট-ছোট ডাক ছেড়ে ছোড়দাকে বলি, ছোড়দা, তুমি কী ভাল! ছোড়দা বা ছোটবউদি আমার কথা বুঝতে পারে না। তবে ছোড়দা আমাকে জড়িয়ে ধরে খুব আদর করে। নাম ধরে ডাকে বারবার।
ছোড়দা যখন অফিসে বেরিয়ে যায় তখন আমার খুব বিচ্ছিরি লাগে। মনে হয়, ছোড়দার সঙ্গে অফিসে চলে যাই। শুনেছি, ছোড়দার অফিসের সামনে অনেকটা খোলা জমি আছে। তা সারাটা দিন আমি তো সেখানে ছুটোছুটি করে খেলা করে কাটিয়ে দিতে পারি। তারপর অফিস ছুটির পর ছোড়দার সঙ্গে একসঙ্গে বাড়ি ফেরা! সে যে কী আনন্দের ব্যাপার…। কিন্তু সেটা তো হওয়ার উপায় নেই। তাই ছোড়দা বেরিয়ে গেলেই আমার ঘুরঘুর করার কাজ শুরু। তখন দেখি বাড়িতে কে কোথায় কী করছে।
মা আর পিসিমা নিজেদের মধ্যে গল্প করেন, ঝগড়া করেন। এই দেখি আড়ি তো এই দেখি ভাব। আমাকে দেখলেই মা সাবধান করেন। বলেন, ডাম্পি, তুই পায়ের কাছে একদম ঘুরঘুর করবি না। তোর জন্যে কোনওদিন হোঁচট খেয়ে পড়ব।
পিসিমাও বলেন, যা যা, এখন কাজলের কাছে যা–।
কাজল মানে ছোটবউদি। ছোটবউদি তো এখন অন্তুকে খাওয়াতে ব্যস্ত। বড়বউদি বাড়ি নেই। কোথায় যেন গেছে বড়দার সঙ্গে।
আমার সঙ্গে তা হলে খেলা করবে কে! কথাই বা বলবে কে!
এসবের জন্যেই মাঝে মাঝে আমি খাটের তলায় এক কোণে ঢুকে চুপটি করে বসে থাকি। বসে-বসে আমার মায়ের কথা ভাবতে চেষ্টা করি। কিন্তু ভালো মতো মনে পড়ে না।
ছোটবউদি সময় হলেই খেতে দেয় আমাকে। এ-ঘরে ও-ঘরে খুঁজে না পেয়ে নাম ধরে ডাকে। এক-একদিন এত মন খারাপ থাকে যে, অনেক করে ডাকলেও সাড়া দিই না। পরে ছোটবউদি যখন খাটের তলায় উঁকি মেরে আমাকে খুঁজে বের করে তখন গজগজ করতে করতে বেরিয়ে আসি। খিদেয় পেট চুইচুই। অগত্যা কী আর করা!
ছোড়দা যখন অফিস থেকে বাড়ি ফেরে তখন পায়ের শব্দ চিনতে পারি আমি। দোতলা থেকে একছুটে সিঁড়ি নেমে পৌঁছে যাই একতলায় দরজার কাছে। ছোড়দার গায়ে গা ঘষে কুঁইচুঁই শব্দ করে কত যে নালিশ করি আমি! সবার নামেই নালিশ থাকে আমার শুধু অন্তু ছাড়া। ছোড়দা আমার নালিশ কি ছাই একটুও বোঝে! খালি নাম ধরে ডাকে আর আদর করে।
বেড়াল, আরশোলা কি ইঁদুর দেখলে আমি ঠিক থাকতে পারি না। ওদের পেছনে পাগলের মতো তাড়া করি। ওদের গায়ের গন্ধও কী বিচ্ছিরি! আমার ছুটোছুটি আর ঘেউঘেউ করা শুনে মা আর পিসিমা ভারী বিরক্ত হন। মা বলেন, চোর ধরার নামে দেখা নেই, শুধু ইঁদুর-বেড়াল তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে!
কিন্তু আমি কী করব! বাড়িতে চোর না এলে আমি তাকে ধরি কেমন করে! ছোড়দাদের এই পাড়াটা এতই শান্ত যে, চোরের নামগন্ধ পর্যন্ত নেই।
গত চোদ্দো বছরে একবার মাত্র চোর ধরেছি আমি। তাও সেই ছেলেটাকে ঠিক চোর বলা যায় কি না জানি না।
বছর তিনেক আগের কথা। দিনটা ছিল রবিবার। সন্ধে সাতটা কি সাড়ে সাতটা হবে। আমি তিনতলায় বড়বউদির ঘরে বসে টিভি দেখছিলাম। বড়দা বিছানায় শুয়ে বই পড়ছিল। টিভিতে সিনেমা হচ্ছিল। বড়বউদি একটা বড় বাটিতে পেঁয়াজ, কাঁচালঙ্কা, চানাচুর দিয়ে মুড়ি মেখে খাচ্ছিল। সিনেমার প্রতিটি ছবির দিকে চোখ যেন আঠা দিয়ে আটকানো। দাদা-বউদির কথাবার্তায় বুঝতে পারছিলাম, সিনেমাটা রঙিন। কিন্তু আমি সাদা-কালোই দেখছিলাম। আমাদের চোখে তো আর বর্ণালির সাত রং ধরা পড়ে না। আমাদের জগৎটাই সাদাকালোর জগৎ। সেইজন্যেই তো ছোড়দা, রামনাথ, কিংবা অন্তু যখন আমাকে লাল বল দিয়ে খেলাত, তখন আমি সেটাকে কালচে রঙের দেখতাম।
সিনেমা দেখতে-দেখতে অচেনা একটা পায়ের শব্দ পেলাম। শব্দটা এসেছে দোতলার সিঁড়ি থেকে। ছোড়দা বাড়ি নেই। অন্তুকে নিয়ে কাছেই কোন এক বন্ধুর বাড়ি গেছে। রামনাথ গেছে মোড়ের মাথায়–বটতলায় আড্ডা মারতে। প্রতি রোববারেই যায়। মা আর পিসিমা নিশ্চয়ই ওঁদের ঘরে বসে সিনেমা দেখছেন। ছোটবউদি একটু আগে রান্নাঘরে রান্না করছিল দেখে এসেছি–এখন কী করছে জানি না।
