নকল শ্রীবাস্তবের দেহটা আবার নমনীয় হয়ে গেল। মেঝেতে আছড়ে পড়ল সশব্দে। অবয়বহীন হয়ে জমাট বাঁধতে লাগল বেগুনি জেলির তাল। তখনও কাঁপছে তিরতির করে। কমল সেনগুপ্তের মতো।
শকারটা ফেলে দিয়ে কোনওরকমে উঠে দাঁড়ালেন মোহন শ্রীবাস্তব। হাতমুখ ঘাম-রক্তে মাখামাখি। শরীর ক্লান্ত, দুর্বল। কিন্তু আত্মবিশ্বাস এখন যেন শতগুণ বেড়ে গেছে। সামান্য খোঁজ করতেই দরজার লকের চাবিটা দেখতে পেলেন তিনি। জেলির পিণ্ড থেকে কয়েক হাত দূরে পড়ে আছে। ঝুঁকে পড়ে সেটা তুলে নিলেন। ধাতব চাবিতে এখনও এক অদ্ভুত উত্তাপ।
করিডর ধরে রওনা হওয়ার আগে আলট্রাসনিক-শকার থেকে জেলি লক্ষ্য করে আর-একবার ফায়ার করলেন শ্রীবাস্তব। জেলির কাঁপন স্থির হয়ে গেল। সব শেষ!
চোয়াল শক্ত করে সোলার-এর প্রধান দরজায় দিকে এগোলেন ডক্টর মোহন শ্রীবাস্তব। মনে-মনে উচ্চারণ করলেন : সেন্ট্রাল ক্লিনিকে টিরার প্রাণী যদি কেউ থেকে থাকে তা হলে মরবার জন্যে তৈরি হও। ডক্টর মোহন শ্রীবাস্তব তোমাদের খতম করতে আসছে।
ডাম্পির সুখ-দুঃখ
এ বাড়িতে আমি কবে এসেছি তার সাল-তারিখ মনে নেই। শুধু এটুকু মনে আছে, ছোড়দার ছেলে অন্তুর বয়েস তখন ছিল ছমাস। এরকম মনে থাকারও একটা কারণ আছে। প্রথম দিন ছোড়দা আমাকে নিয়ে সোজা চলে গিয়েছিল ওর মায়ের ঘরে। সে-ঘরে পিসিমাও থাকেন। মা খবরের কাগজ পড়ছিলেন চোখে চশমা দিয়ে, আর পিসিমা ঠাকুরের ছবির সামনে বসে ধূপ জ্বেলে গুনগুন করে প্রার্থনা করছিলেন।
ছোড়দা আমাকে দেখিয়ে বলল, মা, এই যে, বলেছিলাম না সন্তোষদার কাছ থেকে একটা দারুণ কুকুর নিয়ে আসব। এটাই নিলাম–ডোবারম্যান।
ছোড়দা আমার পিঠ চাপড়ে দিয়েছিল। আর আমি তখন গন্ধ শুকছিলাম। ঘরের গন্ধ। ধূপের ধোঁয়ার গন্ধ। মায়ের গন্ধ। পিসিমার গন্ধ। ছোড়দার গন্ধ। সবরকম গন্ধ যে আমাকে শুঁকতে হবে। আলাদা করে চিনতে হবে। মনে রাখতে হবে।
মা জিগ্যেস করেছিলেন, বয়েস কত এর?
ছ’মাস মতো হবে। আমি নাম রেখেছি ডাম্পি। দ্যাখো, নাম ধরে ডাকলে কেমন তাকাবে আমার দিকে।
ছোড়দা কয়েকবার নাম ধরে ডাকল। ডাম্পি নামটা আমার মোটেই পছন্দ হয়নি। কিন্তু ছোড়দা এত গর্ব করে মা-কে কথাটা বলেছে যে, স্রেফ ওর মান রাখতেই ডাকের তালে-তালে ওর মুখের দিকে হাঁ করে তাকালাম।
মা আপনমনেই বিড়বিড় করে বললেন, ছমাস বয়েস? আমাদের অন্তুরও তো তাই।
পরে জেনেছি, অন্তু ছোড়দার ছেলে।
ছোড়দা মায়ের কথা শুনতে পেয়েছিল। হেসে বলল, কীরকম মজার ব্যাপার হবে বলো তো! ওরা দুজনে একসঙ্গে বড় হবে!
পিসিমার পুজো-আর্চা শেষ হয়ে গিয়েছিল। অবাক চোখে আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন, ওর লেজটা কাটা কেন রে?
ছোড়দা হো-হো করে হেসে উঠল। বলল, এও জানো না! খুব বাচ্চা বয়েসেই ডোবারম্যান কুকুরের লেজ কেটে দেয়। ওদের লেজ সরু, বিচ্ছিরি হয়–অনেকটা টিকটিকির মতো–তাই কেটে দেয়।
পিসিমা শুধু বলেছিলেন, আহা রে, ব্যথা লাগে না!
না, লেজ কাটার সময়কার ব্যথা আমার মনে নেই। কুকুরের এ-ধরনের স্মৃতিশক্তি খুব একটা জোরালো হয় না।
এটাই ছিল আমার প্রথম দিন।
তারপর একে-একে আলাপ হল বাড়ির সকলের সঙ্গে–বড়দা, বড়বউদি, ছোটবউদি, বাড়ির কাজের লোক প্রৌঢ় রামনাথ, ঠিকে কাজ করতে আসা দু-বউ, আর সবার শেষে দেখলাম অন্তুকে– বিছানার শুয়ে-শুয়ে হাত-পা ছুড়ছে।
প্রথম আলাপের সময় থেকেই আমি প্রত্যেকের গন্ধ আলাদা করে চিনে নিয়েছিলাম। বেশ মনে পড়ছে, নানা জনে নানা কথা বলেছিল আমাকে নিয়ে।
ছোটবউদি বলেছিল, বাদামি রঙের নিলে কেন? কালো পেলে না?
ছোড়দা গম্ভীর গলায় জবাব দিয়েছে, জানো, বাদামি ডোবারম্যানের প্রেস্টিজই আলাদা।
আমি খুব খুশি হয়েছিলাম। ছোড়দার গায়ে গা ঘষেছি বারবার।
বড়বউদি আমার কাছে এসে জিগ্যেস করল, কী রে ডাম্পি, চোর ধরতে পারবি তো?
আমি আমার মতো করে বলেছিলাম, পারব।
বড়বউদি আমার কথা না বুঝে বলল, বাব্বাঃ, গলায় বেশ জোর আছে তো!
বড়দা জানতে চেয়েছিল, কী খেতে দেওয়া হবে আমাকে। ছোটবউদি দুবার হুস-হুঁস করেছিল আমাকে লক্ষ্য করে। তারপর ছোড়দাকে বলেছিল, ভালো করে ট্রেনিং দিয়ে এটাকে সিনেমায় যেমন দেখায়।
আর রামনাথ বেশ দূর থেকেই ভয়ে-ভয়ে জানতে চেয়েছিল, ছোড়দাদাবাবু, এই কুকুর পয়লা কোথায় কামড়ায়? হাতে, পায়ে, গলায়?
কথা শুনে আমার হাসি পেয়ে গিয়েছিল।
ছোড়দা মজা করে বলেছিল, সেটা ডাম্পিকেই জিগ্যেস করো না!
তারপর থেকে দিনগুলো বেশ কাটতে লাগল।
একটু পুরোনো বাতিল সোফার আমার বিছানা তৈরি হল। সেই বিছানায় চোদ্দোটা বছর কেটে গেল কোথা দিয়ে কে জানে! এখন সেই সোফাটা আরও পুরোনো হয়েছে। গদি ছিঁড়েছে, তুলো বেরিয়ে পড়েছে খানিকটা। তবুও ওটার ওপরে শুতে আমার ভালো লাগে। কেমন যেন মায়া পড়ে গেছে সোফাটার ওপরে। তা ছাড়া রোজকার চেনা গন্ধটাও আমার কাছে ভীষণ আরামের, ভীষণ স্বস্তির।
ছোটবউদি নিয়ম করে খেতে দেয় আমাকে। সেই খাবার যে সবসময় ভালো লাগে তা নয়। তাই মাঝে-মাঝেই আমি খাবার ফেলে ঘুরে বেড়াই। আর অন্য কোনও কুকুরের ডাক শুনতে পেলেই ছুটে যাই রাস্তার দিকের বারান্দায়। গলা ফাটিয়ে চেঁচাই। ওদের সাবধান করে জানিয়ে দিই, আমি আছি এ-বাড়িতে। তোরা কেউ কাছে ঘেঁষবি না কিন্তু।
