দরজার কাছে পৌঁছেই শরীর হিম হয়ে গেল। দরজা ভেতর থেকে লক করা, এবং লকের চাবি উধাও। চেঁচিয়ে বা শব্দ করে কোনও লাভ নেই। বাইরে থেকে কেউ দরজা খুলতে পারবে না। যদি দরজা কাটতে হয়, তা হলে তো ঘণ্টাদুয়েকের ব্যাপার! ততক্ষণে…।
শ্রীবাস্তবের গলা বুজে আসতে চাইল ক্ষোভে, হতাশায়। অসহায় কান্না দলা পাকাতে লাগল বুকের ভেতরে। কী মারাত্মক ভুল করেছেন তিনি। একেবারে ভুলে গেছেন টিরার একজন অনায়াসে দুজন মানুষকে নকল করতে পারে। যেমন, একজন নকল করেছিল অশোক চিরিমার ও কমল সেনগুপ্তকে। বাকি অভিযাত্রীদের সঙ্গে ক্যাপ্টেন মহাকাশযান থেকে নেমে গেছেন, তবে তারই একটা অংশ থেকে গেছে সোলারের ভেতরে। এখনও যার চেহারা নীতীশ মিত্রের মতো। সে অপেক্ষা করছে। কিন্তু কীসের জন্য?
যতক্ষণ পর্যন্ত টিরার প্রাণী মহাকাশযানে বন্দি ততক্ষণ পর্যন্ত সে অসহায়। এখন সে হয়তো মাথা খুঁড়ে মরছে কী করে সবাইকে ফাঁকি দিয়ে বাইরে বেরোনো যায়। নৃশংস নিষ্ঠুর ভিনগ্রহীর মনে কোনও দয়া নেই, মায়া নেই। ডক্টরকে বাগে পেলেই সে শেষ করে দেবে। সুতরাং শ্রীবাস্তবই আগে খুঁজে বের করবেন তাকে।
সন্তর্পণে পা ফেলে ছায়া-ছায়া করিডর ধরে আবার এগিয়ে চললেন মোহন শ্রীবাস্তব। শব্দটা আবার শুনতে পেলেন তিনি ও ওপরের ডেক থেকে আসছে। পায়ের শব্দ এগিয়ে চলেছে সামনে। দ্রুতগতিতে বেড়ালের মতো ক্ষিপ্রতায় করিডর ধরে নিঃশব্দে ছুটলেন ডক্টর–যেদিকে চলেছে ওপরতলার পায়ের শব্দ সেদিকে।
খাড়া ধাতব সিঁড়ির কাছে পৌঁছে মোহন শ্রীবাস্তব হাঁফাতে লাগলেন। ওপরে একটা কেবিনের দরজা খুলল, বন্ধ হল। ক্যাপ্টেনের কেবিনে ঢুকেছে নকল নীতীশ মিত্র। ওপরের করিডর ছাড়া ওই কেবিন থেকে বেরোনোর দ্বিতীয় পথ নেই। শত্রুকে ফাঁদে পাওয়া গেছে। সুতরাং ধীরে-ধীরে চুপিসাড়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠলেন শ্রীবাস্তব। উঁকি মেরে দেখলেন। ক্যাপ্টেনের কেবিনের দরজার ফাঁক দিয়ে আলো দেখা যাচ্ছে।
ছোট ফোঁকর দিয়ে লম্বা শরীরটাকে তৎপরভাবে ওপরের করিডরে তুলে ফেললেন ডক্টর। তারপর শকার উঁচিয়ে দেওয়ালে পিঠ দিয়ে তৈরি হলেন।
বেরিয়ে এসো, নীতীশ! গর্জন করে উঠলেন তিনি, তোমার বাঁচার কোনও পথ নেই! স্পেসশিপটা ওরা তুলোধোনা করে খুঁজবে। দরকার হলে সোলার-কে ওরা জ্বালিয়ে ছাই করে দেবে–তোমাকে সমেত। এখনও বেরিয়ে এসো বলছি।
কোনও শব্দ নেই। কোনও উত্তর নেই। দরজার পাল্লায় এক জোরালো লাথি বসিয়ে দিলেন শ্রীবাস্তব। পাল্লা খুলে গেল ভেতরে। কেবিন ফাঁকা! সেখানে কেউ নেই।
বিমূঢ় ভাবটা কেটে ওঠার আগেই একটা জোরালো আঘাত আছড়ে পড়ল শ্রীবাস্তবের হাতে। প্রতিটি স্নায়ু যেন চিৎকার করে উঠল যন্ত্রণায়। শকার ছিটকে পড়ল যন্ত্রণাবিদ্ধ অসাড় হাত থেকে। ধাতুর সঙ্গে ধাতুর সংঘর্ষ হল। ঠনঠন। একটা ভারী শরীর ঝাঁপিয়ে পড়ল ডক্টরের ওপরে। কিন্তু আহত হলেও সহজাত ক্ষিপ্রতায় পলকে সরে গেলেন ডক্টর। দেখলেন নীতীশ মিত্রের দেহটা আবার সোজা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। আবার আক্রমণের জন্য তৈরি হচ্ছে।
সাবধান! চিৎকার করে উঠলেন শ্রীবাস্তব। লাফিয়ে পড়লেন ছিটকে পড়া শকার লক্ষ্য করে? তোমার রেহাই নেই, নকল ক্যাপ্টেন! পাহারাদারদের চোখকে তুমি ফাঁকি দিতে পারবে না!
একটা ঠান্ডা হাসি ভেসে এল শত্রুর দিক থেকে। স্ফটিকের পাহাড় ঝুরঝুর করে খসে পড়ার মতো আলতো সেই হাসি। সরীসৃপের হাসি। তীব্র ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের হাসি। এবং একটা ভারী ধাতব পিণ্ড ছুটে গেল ডক্টরকে লক্ষ্য করে। তখন তার হাত সবে ঠিকরে পড়া শকারটা ছুঁয়েছে। ভারী ধাতুর আঘাতে ডানহাতের তালুর হাড়গোড় যেন গুড়ো হয়ে গেল। লক্ষ ভোল্টের বিদ্যুৎ বয়ে গেল ডান বাহু বরাবর। মস্তিষ্কে পৌঁছে বৈদ্যুতিক শক অচেতন করে দিতে চাইল শ্রীবাস্তবকে। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে এক রক্ত-হিম করা দৃশ্য ডক্টরের চেতনাকে ঝাঁকুনি দিল প্রাণপণে।
কারণ, নীতীশ মিত্রের অবয়ব তখন ধীরে ধীরে পালটে যাচ্ছে অন্য এক চেহারায়। শ্রীবাস্তবের বিস্মিত দৃষ্টির সামনে নীতীশ মিত্রের কাঠামো আরও লম্বা হল, চোয়াল শক্ত হয়ে ফুটে উঠল সরু গোঁফ, মাথার সামনের চুল অদৃশ্য হয়ে কপাল বিস্তৃত হল, সেখানে দপদপ করছে নীল শিরা। একটা জেলির তাল যেন নিজেকে সাজিয়ে গুছিয়ে তৈরি করল নতুন মানুষ।
ডক্টর মোহন শ্রীবাস্তব!
মেঝেতে পড়ে থাকা শ্রীবাস্তব দেখলেন অবিকল তারই চেহারায় একজন মানুষ সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে নিষ্ঠুরভাবে হাসছে। টিরার ভয়ংকর প্রাণীর দাবা খেলার শেষ চাল। আসল ডক্টরকে খুন করে নকল ডক্টর শ্রীবাস্তব নিরাপদে নির্বিঘ্নে নেমে যাবে মহাকাশযান থেকে। কেউ তাকে সন্দেহ। করবে না। সে সেন্ট্রাল ক্লিনিকে গিয়ে আসল মানুষগুলোকে খতম করে মুক্তি দেবে নকল মানুষগুলোকে। তারা বুকভরা হিংসা ও লালসা নিয়ে ছড়িয়ে পড়বে পৃথিবীর বুকে। তারপর…।
.
নকল মানুষটা তখন দু-হাতে তুলে নিয়েছে ইস্পাতের তৈরি অস্বাভাবিক ভারী একটা কন্ট্রোল বক্স। কয়েক মুহূর্ত…তারপরই সব শেষ হয়ে যাবে…প্রাণপণ শক্তিতে শরীরটাকে দু-পাক গড়িয়ে শকারের কাছে এগিয়ে গেলেন মোহন শ্রীবাস্তব। সুস্থ বাঁ-হাতে কোনওরকমে তুলে নিলেন আলট্রাসনিক-শকার। ভারী কন্ট্রোল-বক্সটা ছুটে আসছে তার দেহ লক্ষ্য করে। আঁকুনি দিয়ে একপাশে সরে গিয়ে যন্ত্রণায় চোখ বুজে শকারের ট্রিগার টিপলেন ডক্টর। হাই এনার্জি আলট্রাসনিক ওয়েভ ফোয়ারার মতো ছড়িয়ে পড়ল শত্রুকে লক্ষ্য করে। ঝনঝন শব্দে কন্ট্রোল-বক্স দেওয়ালে আছড়ে পড়ল। একটা মরণ-আর্তনাদ বেরিয়ে এল শত্রুর ঠোঁট চিরে। কেঁপে-কেঁপে প্রতিধ্বনি তুলে সেটা মিলিয়ে গেল সোলার-এর গহ্বরে কন্দরে।
