ধাতব শব্দের আর্তনাদ তুলে ওপরে, আরও ওপরে, উঠতে লাগল এলিভেটর। এক সময় এসে থামল সোলার-এর প্রধান দরজার সামনে। সেখানে দুজন সিকিওরিটি অফিসার দাঁড়িয়ে ছিলেন। ডক্টরকে দেখেই তাঁদের একজন বললেন, সবাই নেমে গেছে, ডক্টর শ্রীবাস্তব। আপনার কথা মতোই সকলকে সিকিওরিটি পুলিশের তত্ত্বাবধানে সেন্ট্রাল ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে–
থ্যাংক য়ু, অফিসার। নির্বিঘ্নে কাজ শেষ হওয়ার তৃপ্তি পেলেন মোহন শ্রীবাস্তব।
সিকিওরিটি কমান্ডার তাঁর কথায় বিশ্বাস করেছেন। কমান্ডারই আদেশ দিয়েছেন সোলার এর প্রতিটি যাত্রীকে সিকিওরিটি ফোর্স দিয়ে সেন্ট্রাল ক্লিনিকে নিয়ে যেতে। অবশ্যই ডক্টর শ্রীবাস্তবের পরামর্শে। ক্লিনিকে প্রত্যেককে খুঁটিনাটি পরীক্ষা করে জেরবার করে ছাড়বেন শ্রীবাস্তব। একের পর এক নতুন-নতুন ফঁদ পাতবেন। সময় লাগবে, ধৈর্যও লাগবে। তবে টিরার একটি প্রাণীও রেহাই পাবে না।
হঠাৎ কী মনে হতে মোহন শ্রীবাস্তব অফিসারকে লক্ষ্য করে প্রশ্ন করলেন, স্পেসশিপ থেকে নামার সময় প্রত্যেক প্যাসেঞ্জারের ফটো আর ফিঙ্গারপ্রিন্ট মিলিয়ে দেখা হয়েছে?…আর একটা বডি ছিল…।
হ্যাঁ, ডক্টর। আমরা লিস্ট মিলিয়ে নিয়েছি। কোনও গরমিল হয়নি। অশোক চিরিমারের ডেডবডি আমরা সাবধানে নামিয়েছি। তারপর পাঠিয়ে দিয়েছি ক্লিনিকে। আপনার কথামতো বডিটা আমরা চেক করেছিলাম। কিন্তু তাতে কোনওরকম ডিফেক্ট পাইনি। তখন স্টেরিলাইজড ব্যাগে ভরে নামিয়ে নিয়েছি।
যাক, নিশ্চিন্ত। হাতে হাত ঘষলেন শ্রীবাস্তব। মাটি থেকে ষাট ফুট উঁচুতে দাঁড়িয়ে আরও বেশি শীত করছে। এখানে হাওয়ার দাপট অনেক বেশি। নীচে শুয়ে থাকা কলকাতাকে লিলিপুট শহরের মতো দেখাচ্ছে। সেন্ট্রাল ক্লিনিকে ফিরে গিয়ে ল্যাবরেটরি টেস্ট শুরু করার জন্য তার মন ছটফট করতে লাগল। কিন্তু, না। এখনও সামান্য একটু কাজ বাকি রয়েছে। স্টারবোর্ড স্পেস লক থেকে সংগ্রহ করতে হবে বেগুনি জেলির পিণ্ডটা–এতক্ষণে ওটা হয়তো শুকিয়ে এসেছে। তা ছাড়া কেবিন থেকে নিতে হবে কিছু নো, কয়েকটা রিপোর্ট। শুধু নোস আর রিপোর্টের কথাই অফিসারকে বললেন তিনি। একজন সিকিওরিটি পুলিশের হাত থেকে একটা আলট্রাসনিক-শকার চেয়ে নিয়ে অফিসার দুজনকে বললেন, আপনারা অ্যালার্ট থাকুন। আমি ভেতরে যাচ্ছি। দেখবেন, আর-কেউ যেন ভেতরে না ঢোকে। কেউ না!
ও.কে., ডক্টর! একসঙ্গে বলে উঠলেন দুজন অফিসার। কমান্ডারের নির্দেশ, ডক্টর শ্রীবাস্তবের কথা অক্ষরে-অক্ষরে শুনতে হবে। এত কাণ্ডকারখানার কী কারণ তা তারা কেউই জানেন না।
শকার হাতে নিয়ে সোলার-এ ঢুকলেন শ্রীবাস্তব। তার চোখে ঘুম নেই, ক্লান্তি নেই, স্বস্তি নেই, শান্তি নেই যতক্ষণ না পৃথিবীকে বাঁচাতে পারছেন টিরার ভয়ানক শত্রুর হাত থেকে।
পিছনে প্রধান দরজা বন্ধ হয়ে যেতেই করিডর আবছায়া অন্ধকার হয়ে গেল। অতিকায় মহাকাশযানে নিজেকে ভীষণ একা মনে হল ডক্টর শ্রীবাস্তবের। ইঞ্জিনের সেই চেনা গুঞ্জন নেই, নেই অভিযাত্রীদের কর্মব্যস্ততা। সব শান্ত, চুপচাপ, শূন্য।
করিডরে বাঁক নিয়ে নিজের কেবিনের দিকে চললেন তিনি। তাঁর পায়ের শব্দ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে ধাতব দেওয়াল থেকে দেওয়ালে।
হঠাৎই তিনি থমকে দাঁড়ালেন। বিভিন্ন প্রতিধ্বনি থেকে যেন শব্দের ধাঁধা তৈরি হচ্ছে। আর একটা শব্দ কানে এল না! তার পায়ের শব্দ নয়। একটু অন্যরকম। ডক্টর পাথরের মতো দাঁড়িয়ে। উৎকর্ণ। প্রতিটি স্নায়ু টান-টান। শকার যে-কোনওরকম পরিস্থিতির জন্য তৈরি।
ওই আবার! অন্ধকার ভেদ করে দেখতে চেষ্টা করলেন ডক্টর। সব আলো কি বিকল হয়ে গেছে? কবরখানার নিস্তব্ধতা ছেয়ে গেছে চারিদিকে। কপালে জন্ম নিচ্ছে নোনা ঘামের বিন্দু। এবারে স্পষ্ট শোনা গেল শব্দটা। পায়ের শব্দ! ভেসে এল করিডরের অন্য প্রান্ত থেকে।
সোলার-এ মোহন শ্রীবাস্তব একা নন! আরও কেউ রয়েছে…লুকিয়ে…গোপনে…।
কী ভীষণ বোকামি করেছেন তিনি! মহাকাশযানে একা ঢুকে পড়া তার উচিত হয়নি। তিনি ছাড়া আরও একজন রয়েছে ভেতরে। তার শত্রু! কিন্তু কে? সবাই তো নেমে গেছে সিকিওরিটি পুলিশের তত্ত্বাবধানে! তা হলে?
আলট্রাসনিক-শকার চারপাশে ঘুরিয়ে সতর্ক চোখে সব জরিপ করলেন শ্রীবাস্তব। তার মন তখন ব্যস্তভাবে একই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে।
সোলার-এ এমন কেউ রয়েছে যে কমল সেনগুপ্তের পুরো ঘটনাটা জানে। সে জানে ভিনগ্রহের প্রাণী ছদ্মবেশে ঢুকে পড়েছে সোলার-এ। জানে, কেন মহাকাশযানের সব যাত্রীকে পাহারা দিয়ে ক্লিনিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সেইজন্যই সে ভয়ে নামেনি সোলার থেকে ধরা পড়ার ভয়ে। সে জানে ডক্টর শ্রীবাস্তবের সন্দেহের কথা।
এত সব জানে শুধু দুজন। একজন ডক্টর মোহন শ্রীবাস্তব নিজে, আর দ্বিতীয় জন…।
ক্যাপ্টেন মিত্র। চিৎকার করে উঠলেন শ্রীবাস্তব, চালাকি করে কোনও লাভ নেই! পালাবার কোনও পথ নেই তোমার! সব আমি ফাঁস করে দিয়েছি। একজন ক্যাপ্টেন মিত্র আগেই নেমে গেছে সোলার থেকে। মহাকাশ্যানের চারিদিকে কড়া পাহারা। মাছি গলার জো নেই। তুমি ফাঁদে পড়ে গেছ নকল নীতীশ মিত্র!
বারবার প্রতিধ্বনিত হয়ে বিদ্রুপের কলরোল তুলে একসময় মিলিয়ে গেল কথার স্বনন। সব চুপচাপ। শত্রুর তরফ থেকে কোনও জবাব নেই। মোহন শ্রীবাস্তবের শরীর কাঁপছে, হৃৎপিণ্ড ছুটে চলেছে পাগলা ঘোড়ার মতো উদ্দাম বেগে। একটা ভয় হঠাৎই তাকে জড়িয়ে ধরতে চাইল। ঘুরে দাঁড়িয়ে করিডর ধরে ছুটতে শুরু করলেন। ফিরে চললেন প্রধান দরজার দিকে।
