শ্রীবাস্তব ক্ষিপ্র পায়ে করিডর ধরে ছুটতে শুরু করলেন। ঘটনাচক্রে অথবা দুর্ঘটনায় কোনও অভিযাত্রী মারা গেলে তার মৃতদেহ অক্ষত রাখার জন্যেই সাব জিরো রুমের ব্যবস্থা। কপাল ভালো বলতে হবে, এখন সেখানে একমাত্র অশোক চিরিমারের মৃতদেহ রয়েছে। তার হাতে সোলারের অন্য কেউ আক্রান্ত হয়েছে কি না কে জানে! আবার কাউকে খুন করে শয়তানটা তাকে নকল করেনি তো! না, এখানে আর পরীক্ষা চালানোর সময় নেই। সামনেই বিপজ্জনক স্পেস জাম্প। অতএব যা করার পৃথিবীতে ফিরেই করতে হবে।
ছুটতে ছুটতে সাব জিরো রুমে এসে দাঁড়ালেন ডক্টর। দরজা বন্ধ। আশপাশে কেউ নেই। রুমাল বের করে কপালের ঘাম মুছলেন। হাতল ঘুরিয়ে দরজা খুললেন। বরফ-ঠান্ডা বাতাসের ঝাপটায় তার চোখ-মুখ যেন জমে গেল। ঘরের মধ্যে সাদা ধোঁয়ার রেখা চোখে পড়ছে। ধাতব দেওয়াল, ধাতুর বাঙ্ক, সব–সব জায়গাতেই চাপচাপ বরফের স্তর জমে আছে। একটা বাঙ্কে নিশ্চল শুয়ে আছে মৃত অশোক চিরিমার। হাতে মুখে তুষারের কণা।
স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন মোহন শ্রীবাস্তব। দরজা বন্ধ করে লক করে দিলেন। কাউকে ডেকে সিল করার ব্যবস্থা করতে হবে এখুনি।
দরজা সিল করে কেবিনে ফিরে যেতে-যেতে তার মনে হল, সাব জিরো রুমের ওই হিমশীতল উষ্ণতায় টিরার প্রাণী কি আর বেঁচে আছে? স্পন্দনের ইশারা কি এখনও অবশিষ্ট রয়েছে ওই বেগুনি জেলিতে?
পৃথিবীতে ফিরে গিয়েই সব প্রশ্নের উত্তর তন্নতন্ন করে খুঁজে বের করবেন তিনি।
.
০৬. শত্রুর মুখোমুখি
পরদায় পৃথিবীকে বিশাল দেখাচ্ছে। সবুজ, উজ্জ্বল, প্রক্সিমা সেন্টরির দিকে যাত্রা শুরুর সময় যেরকম দেখা গিয়েছিল। স্পেস জাম্পের পরীক্ষায় নির্বিঘ্নে উত্তীর্ণ হয়েছে সোলার। এখন তার গতি কমে আসছে। পৃথিবীর কক্ষপথে কয়েকবার পাক দেওয়ার পর নির্দিষ্ট ব্যালিস্টিক পাথ ধরে পৃথিবীর দিকে এগিয়ে চলেছে সোলার। অভিযাত্রীরা যার-যার নির্ধারিত জায়গায় তৈরি। মহাকাশযান নামার সময় গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো প্রত্যেকটি কর্মীকে অত্যন্ত মনোযোগের সঙ্গে করতে হবে। সেখানে চুলচেরা ভুল হওয়ার উপায় নেই। সুতরাং প্রত্যেকেই তৈরি হয়ে অপেক্ষা করছে।
ছায়া-অন্ধকার করিডর ধরে মহাকাশযানের পিছনের অংশে এগিয়ে চলেছেন মোহন শ্রীবাস্তব। সঙ্গে সনোগ্রাফের ফিম সমেত খাম দুটো। ক্যাপ্টেন মিত্রকে তিনি ভালো করে বুঝিয়ে এসেছেন। যে, বিপদ কেটে গেছে। টিরার প্রাণী মৃত। একজন মারা গেছে বায়ুশূন্যতায়, অন্যজন হিম তাপমাত্রায়। অতএব সোলার এখন বিপদমুক্ত।
কিন্তু সবটাই শ্রীবাস্তব ভুল বুঝিয়েছেন। গালগল্প প্রচার বন্ধ করার জন্যই তাকে ক্যাপ্টেনের কাছে মিথ্যে বলতে হয়েছে। এখন তিনি লাইফবোট রকেটে চড়ে একা রওনা হয়ে যাবেন পৃথিবীর দিকে। পৌঁছোবেন সোলারের আগে। ফিল্মগুলো কর্তৃপক্ষকে দেখিয়ে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেবেন সোলার-এর প্রতিটি যাত্রীকে যাচাই করার জন্য। বিপজ্জনক মহাকাশযানে নীতীশ মিত্রকে রেখে যেতে তার খারাপ লাগছে, কিন্তু কোনও উপায় নেই। অন্যান্য যাত্রীর মতো ক্যাপ্টেনকেও তিনি সন্দেহ করেন। কে বলতে পারে, টিরার রুক্ষ ভূমি থেকে একজন, দুজন, না তিনজনকজন ছদ্মবেশী প্রাণী উঠে এসেছিল সোলারে!
লাইফবোট রুমে মোট নটা রকেট ছিল। টর্চের আলোয় আটটা রকেটের ইগনিশান সার্কিট শর্ট করে দিলেন শ্রীবাস্তব। এগুলো ঠিক করতে এখন কয়েক ঘণ্টা লেগে যাবে। অতএব পৃথিবীতে সবাইকে নামতে হবে সোলা-এর বন্দি হয়েই। তারপর…।
ননম্বর রকেটটা সোলারের আশ্রয় ছেড়ে গা ভাসাল মহাকাশে। সাবলীল গতিতে নেমে চলল উষ্ণ সবুজ পৃথিবীর দিকে।
টিরার প্রাণীরা অজেয় নয়। ডক্টর শ্রীবাস্তব ভাবলেন। ওদের একজনকে তিনি বুদ্ধির খেলায় হারিয়েছেন, ফঁদে ফেলেছেন, শেষ করেছেন। অতএব চেষ্টা করলে বাকিগুলোকেও পারবেন। শুধু দরকার সাহস, আর আত্মবিশ্বাস। মৃত্যুর সময় নকল কমল সেনগুপ্তের চোখে-মুখে পাগল করা রাগ ফুটে উঠেছিল। চরম ঘৃণায় টলটল করছিল চোখের দৃষ্টি। টিরার প্রাণী কমলের চোখ দিয়ে তাকে দেখছিল। ফুঁসছিল রাগে।
ডক্টর শ্রীবাস্তব শিউরে উঠলেন। কমল সেনগুপ্তের বেলায় ভাগ্য তার সহায় ছিল। কিন্তু এবারে?
একঘণ্টার মধ্যেই ক্যালকাটা কসমোড্রোমে ল্যান্ড করল শ্রীবাস্তবের লাইফবোট রকেট। তার পরই ব্যস্ত কথাবার্তা, উত্তেজনা, ছুটোছুটি, সনোগ্রাফ পরীক্ষা, সংশয়, আতঙ্ক। একটা ম্যাগনেটিক কারে চড়ে আনডারগ্রাউন্ড টানেল ধরে শব্দের গতিতে রওনা হয়ে গেলেন মোহন শ্রীবাস্তব। লক্ষ্যঃ কসমোড্রোম সিকিওরিটি ব্যুরো।
.
আকাশের দিকে রুপোলি নাক উঁচিয়ে বিশাল মহাকাশযান সোলার সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে। যেন অপরূপ এক অতিকায় পাখি ডানা মেলার মুহূর্তে ছবি হয়ে গেছে। মনে-মনে সোলারের গঠনের তারিফ করলেন মোহন শ্রীবাস্তব। তারপর অটোমেটিক এলিভেটরে চড়ে সোলার-এর গা বেয়ে উঠতে শুরু করলেন। তার সঙ্গে সবুজ ইউনিফর্ম পরা চারজন কসমোড্রোম সিকিওরিটি পুলিশ। তাঁদের প্রত্যেকের হাতে আলট্রাসনিক-শকার। ট্রিগারে চাপ দিলেই লাভাস্রোতের মতো বেরিয়ে আসবে অদৃশ্য আলট্রাসনিক শক্তির ফোয়ারা। শব্দোত্তর তরঙ্গের জোয়ারে অদৃশ্য শত্ৰু সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়বে। বেশিক্ষণ ব্যবহার করলে তার করুণ মৃত্যুও ঘটবে।
