কী ব্যবস্থা? সিগারেট ধরিয়ে লাইটারটা ডক্টরের তালুর ওপর ছেড়ে দিলেন ক্যাপ্টেন। ডক্টর শ্রীবাস্তব সেটা লুফে নিয়ে পকেটে ঢোকালেন। তারপর ফিল্মগুলো খামে ভরে নিয়ে রিল্যাক্সার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। ক্যাপ্টেনও উঠে দাঁড়ালেন তাঁর সঙ্গে রওনা হওয়ার জন্য।
শ্রীবাস্তবের চোয়াল শক্ত হল। খোঁচা-খোঁচা দাড়িতে হাত বুলিয়ে তিনি বললেন, চরম ব্যবস্থা। চলুন, নিজের চোখেই দেখবেন…।
ওঁরা দুজনে বেরিয়ে এলেন ক্যাপ্টেনের কেবিন ছেড়ে। করিডর ধরে এগোতে এগোতে মোহন শ্রীবাস্তব বললেন, একটু আগে আমি কমলকে স্টারবোর্ডের দিকে স্পেস লকটা পরিষ্কার করতে বলে এসেছি। ও যদি স্পেস লকের মধ্যে থাকে তা হলে আমাদের কাজের সুবিধে হবে।
ক্যাপ্টেন মিত্র কোনও কথা বললেন না। তিনি এই মহাকাশযানের ক্যাপ্টেন, কিন্তু ডক্টর শ্রীবাস্তবের র্যাঙ্ক তার সমান। তা ছাড়া, মহাকাশযান ও অভিযাত্রীদের রোগজীবাণুমুক্ত রাখতে ডক্টর শ্রীবাস্তব যা ভালো বোঝেন করতে পারেন ক্যাপ্টেনের অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন নেই। একই কারণে তিনি হুকুম চালাতে পারেন ক্রু-র ওপরে। গত এক দশকে রোগজীবাণুর জন্য বিভিন্ন মহাকাশ অভিযানের শোচনীয় ব্যর্থতা সকলের চোখ খুলে দিয়েছে। সেই কারণেই আজকাল যে-কোনও অভিযানে চিফ মেডিক্যাল ম্যান ক্যাপ্টেনের মতোই গুরুত্বপূর্ণ হয়তো বা তার চেয়েও বেশি। তবে নীতিশ মিত্র এটুকু আশা করেন, শ্রীবাস্তব যা করবেন তা বুঝে-শুনে দায়িত্ব নিয়েই করবেন।
.
মোহন শ্রীবাস্তব নিজের বোকামির কথা ভাবছিলেন। কমল সেনগুপ্ত ছাড়াও যে অন্য কেউ টিরার প্রাণী হতে পারে এই সন্দেহের কথা ওভাবে প্রকাশ করাটা ঠিক হয়নি। ক্যাপ্টেনের কাছ থেকে ব্যাপারটা যদি পাঁচকান হয় তা হলেই বিপদ! নিজের সন্দেহের কথা এই মুহূর্তে তিনি কাউকে জানাতে চান না।
স্টারবোর্ডের স্পেস লকের সামনে করিডরে অফিসার অংশুমান যাদবের সঙ্গে দেখা হল। ক্যাপ্টেনের দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারা করলেন মোহন শ্রীবাস্তব। তারপর যাদবকে বললেন, নেভিগেশান রুমে গিয়ে ধনপত রাইকে বলো স্পেস জাম্পের জন্যে তৈরি হতে। আমরা একটু পরে আসছি।
যাদবকে সরিয়ে দিয়ে দুজন এগিয়ে গেলেন স্পেস লকের দরজার সামনে। ভারী ধাতব দরজা। দরজার ওপরের অংশে পুরু প্লাস্টিকের স্বচ্ছ প্যানেল বসানো। প্রেসার চেম্বারের ভেতরে কমল সেনগুপ্ত কাজ করছে। একটা ভ্যাকুয়াম ক্লিনার নিয়ে ঘরটা পরিষ্কার করছে। নিখুঁত একজন মানুষ–চেহারা, চালচলন, সব।
হঠাৎই ক্ষিপ্র চিতার মতো দরজার ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়লেন শ্রীবাস্তব। এক ঝটকায় লক আটকে বেরোনোর পথ বন্ধ করে দিলেন। তারপর দরজার পাশেই একটা প্যানেলের লাল বোতামে চাপ দিলেন। চেম্বারের ভেতরে লাল আলো জ্বলে উঠল। মৃদু গুঞ্জন তুলে বায়ু-নিষ্কাশন পাম্প কাজ শুরু করল। প্রেসার চেম্বারের বাতাস ক্রমশ বেরিয়ে যেতে লাগল।
লাল আলো দেখে কমল চমকে উঠল, ভ্যাকুয়াম ক্লিনার ছেড়ে ছুটে এল দরজার কাছে। আতঙ্কে চোখ বেরিয়ে আসছে, মুখে বিমূঢ় বিস্ময়।
ডক্টর! ও চিৎকার করে উঠল। ভারী দরজা ভেদ করে ওর ক্ষীণ ভাঙা কণ্ঠস্বর শোনা গেল ও ডক্টর, শিগগির সবুজ বোতামটা টিপে দিন! দেখছেন না, আমার গায়ে প্রেসার স্যুট নেই!
ক্যাপ্টেন মিত্রের ঠোঁট চিরে একটা অস্ফুট শব্দ বেরিয়ে এল। পক্ষাঘাতে পঙ্গু হয়ে তিনি ডক্টরকে দেখছেন। কোনওরকমে বললেন, কী করছেন আপনি! ছেলেটা যে মরে যাবে!
ছেলেটা নয়, টিরার প্রাণী! গম্ভীর গলায় শ্রীবাস্তব উত্তর দিলেন, আমাদের মতো ওরাও বায়ুমণ্ডলে অভ্যস্ত। অতএব বায়ুশূন্য অবস্থায় বাঁচতে পারবে না। চুপচাপ শুধু দেখে যান। ডক্টরের চোখ প্লাস্টিক প্যানেলের ওপরে নিবদ্ধ।
কমল সেনগুপ্ত অন্ধ আতঙ্কে কাঁপছে। মরিয়া হয়ে চিৎকার করে উঠল আবার, ডক্টর! ক্যাপ্টেন! সবুজ বোতামটা টিপে দিন, প্লিজ! ডক্টর, শিগগির করুন! নইলে আমি মরে যাব– আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে।
পাগল করা রাগে, উত্তেজনায়, হতাশায়, কমল ঘুসি মারতে লাগল ধাতব দরজায়, প্লাস্টিক প্যানেলের ওপরে। ওর হাত ফেটে রক্ত বেরিয়ে এল। স্বচ্ছ প্যানেল লালে মাখামাখি হয়ে গেল। তারপর লাল থেকে ধীরে-ধীরে পালটে যেতে লাগল বিচিত্র বেগুনি রঙে।
কমল নিজের গলা আঁকড়ে ধরল, হাঁটুগেড়ে পড়ে গেল মেঝেতে। প্রেসার গেজ-এর কাটা ক্রমশ এগিয়ে যাচ্ছে শূন্যের দিকে। কমল ছটফট করছে আহত সরীসৃপের মতো, কাশির দমকে কেঁপে উঠছে ওর শরীর।
হঠাৎই ওর নাক দিয়ে রক্ত বেরিয়ে এল। শেষ আক্ষেপে মোচড় খেল ওর দেহ। তারপরই সব স্থির। নিস্পন্দ।
এবং কমল সেনগুপ্তের দেহে পরিবর্তন শুরু হল। আকৃতি পালটে যেতে লাগল ধীরে-ধীরে। সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অবয়ব গলে-গলে মিশে যেতে লাগল–হ্যাঁত-পা, চুল–অবশেষে রয়ে গেল শুধু একতাল বেগুনি জেলি। যেন এক অতিকায় অ্যামিবা। তিরতির কাঁপন জাগছিল জেলির স্তরে। আচমকা সেটাও থেমে গেল। প্রাণের সব স্পন্দন শেষ।
প্যানেল থেকে চোখ সরিয়ে মাথা নাড়লেন ডক্টর। অবসাদ ভরা শরীরে দেওয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়ালেন। ক্লান্ত স্বরে বললেন, এই আমার সবচেয়ে বড় প্রমাণ, ক্যাপ্টেন। আমি ভুল করিনি।
ক্যাপ্টেন মিত্র কী একটা বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু তার আগেই এক লহমায় টানটান হয়ে দাঁড়ালেন মোহন শ্রীবাস্তবঃ ক্যাপ্টেন, একটা বিরাট ভুল হয়ে গেছে। অশোক চিরিমার মরেছে, কিন্তু তার ভেতরের বেগুনি জেলি মরেনি! নকল কমল সেনগুপ্তেরই একটা অংশ তৈরি করেছিল নকল চিরিমার। সে মরে যাওয়ার ভান করে আমাদের চোখে ধুলো দিয়েছে। আমি এক্ষুনি গিয়ে সাব জিরো রুম লক করে সিল করে দিয়ে আসছি। পৃথিবীতে ফিরে গিয়ে মৃত চিরিমারকে পরীক্ষা করে দেখব। আর এই প্রেসার চেম্বারটা আপনি সিল করে দিন। কেউ যেন এটা না খোলে। দেখি, ওদিকে আবার কোনও বিপদ হল কি না!
