কিন্তু ডক্টর…ওকে আমাদের খুন করতে হবে…।
না, না..তা হলে ওরা মহাকাশযান পৃথিবীতে নামাবে না। সবাই সন্দেহ করবে। পৃথিবীকে বাঁচাতে ওরা মহাকাশযান উড়িয়ে দেবে মহাকাশে। তার চেয়ে বরং ডক্টরকে ওর খেলা খেলতে দাও। ভয় পেয়ো না একটুও।
কিন্তু টের পাচ্ছি, আমি কোণঠাসা হয়ে পড়ছি কীভাবে তা বুঝতে পারছি না। আমাদের ফিরে যাওয়া উচিত। এখনই। এখনও সময় আছে…।
নিষ্ঠুর হাসির মধ্যে দিয়ে ঘৃণা ভরা নৃশংস মনটা যেন তার হাজারো অ্যান্টেনা দিয়ে উগ্র বিষ ঢেলে দিল ও ভয় পেয়ো না। মনে রেখো, আমাদের একজন বেঁচে থাকলেই চলবে। তুমি…কিংবা আমি…।
.
ক্যাপ্টেন নীতীশ মিত্রের কেবিনে ঢুকলেন মোহন শ্রীবাস্তব। ক্যাপ্টেন ফিরে তাকাতেই বলে উঠলেন, আমি জিতেছি, ক্যাপ্টেন। আমার পাতা ফাঁদে পা দিয়েছে নকল কমল সেনগুপ্ত। সে ধরা পড়ে গেছে হাতেনাতে।
শ্রীবাস্তবের মুখে জয়ের হাসি। রিল্যাক্সারে বসে একটা সিগারেট ধরালেন তিনি। লাইটারটা হাতে নিয়ে খেলা করতে লাগলেন।
ক্যাপ্টেন মিত্র জয়ের খবরে তেমন যেন আশ্বস্ত হতে পারেননি। নীচু গলায় বললেন, ডক্টর, আপনার অনুমানই তা হলে সত্যি হল! আমি আর ভাবতে পারছি না। সবকিছু যেন দুঃস্বপ্ন বলে মনে হচ্ছে। কাল রাতে এক মুহূর্তের জন্যেও আমি ঘুমোতে পারিনি। তা ছাড়া, আজ যতবারই কমলের মুখোমুখি হয়েছি ততবারই নিজেকে কেমন অপরাধী বলে মনে হয়েছে। ছেলেটা এত নিষ্পাপ, সরল–।
ক্যাপ্টেনকে বাধা দিয়ে শ্রীবাস্তব বললেন, যে কমল সেনগুপ্তকে আপনি দেখছেন সে ঘোর পাপী এবং কুটিল। প্রথম সুযোগেই সে আপনাকে আমাকে সবাইকে খতম করে দেবে। কিন্তু এখন আর তা হবে না। উলটে আমরাই তার ব্যবস্থা করব…।
কী প্রমাণ পেয়েছেন, ডক্টর? অপেক্ষাকৃত শান্ত স্বরে জিগ্যেস করলেন নীতীশ মিত্র।
পকেট হাতড়ে একটা খাম বের করলেন ডক্টর শ্রীবাস্তব। খাম থেকে বেরোল একটা ফি। সেটা আলোর দিকে ধরে একবার দেখলেন। তারপর ক্যাপ্টেনের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, কমল সেনগুপ্তের পাকস্থলীর সনোগ্রাফিক ফিল্ম। সনিক জেনারেটার লাগিয়েছিলাম কেবিনের সিলিংয়ে, এবং ওর বাঙ্কের তলায় ফিল্ম প্লেটটা সেট করে অনেক কষ্টে লুকিয়ে এই ছবি তুলেছি। দেখুন–।
ক্যাপ্টেন মিত্র ফিল্মটা দেখলেনঃ কীসের ছবি?
কাল রাতে কমল সেনগুপ্ত যা-যা খেয়েছিল তার ছবি।
কই, কিছু তো দেখা যাচ্ছে না! ক্যাপ্টেন অবাক হলেন।
শ্রীবাস্তব আত্মপ্রসাদের হাসি হাসলেন : কমল আমার ফাঁদে পা দিয়েছে, তাই কিছু দেখা যাচ্ছে না।
ক্যাপ্টেন বিমূঢ় চোখে ডক্টরকে দেখতে লাগলেন। মাথামুন্ডু কিছুই বুঝতে পারছেন না তিনি।
শ্রীবাস্তব হাসলেন। তারপর পকেট থেকে আর-একটা খাম বের করলেন। খাম থেকে বেরোল। ছটা একই ধরনের ফিল্ম।
ক্যাপ্টেন, কমলের ছবির সঙ্গে এই ছবিগুলো মিলিয়ে দেখুন। আমাদের মেডিক্যাল টিম বহু পরিশ্রমে গোপনে ছবিগুলো তুলেছে। অবশ্য আমি ছাড়া আর কেউ ছবি তোলার কারণ জানে না। হাতের সিগারেটে গভীর টান দিলেন ডক্টর। ফিল্মগুলো রাখলেন ক্যাপ্টেনের ডেস্কের ওপরে। তারপর বললেন, ক্যাপ্টেন, কাল রাতে ত্রু-দের যে-খাবার দেওয়া হয়েছিল তাতে আমি গোপনে পাথরের গুঁড়ো মিশিয়ে দিয়েছিলাম–না, আপনার অনুমতি নিতে পারিনি–তার জন্যে আমি দুঃখিত। রাতের খাবার খেয়ে আজ সকলেই বদহজমের অভিযোগ করেছে–একমাত্র কমল সেনগুপ্ত ছাড়া। ওই ছটা ফিল্ম লক্ষ করলে দেখতে পাবেন স্টোনডাস্টের ছবি সনোগ্রাফে অত্যন্ত স্পষ্ট–যা কমলের ছবিতে নেই। অর্থাৎ, স্বাভাবিক কারণেই খাবারের সঙ্গে অজান্তে পাথরের গুড়ো খেয়ে ছজন অভিযাত্রী তা হজম করতে পারেনি। কিন্তু নকল কমল জানত না পাথরের গুঁড়ো তার হজম করা উচিত কি অনুচিত। আসল কমলের মস্তিষ্কের মেমোরি থেকে এ-বিষয়ে কোনও খবর সে জানতে পারেনি আর জানা সম্ভবও ছিল না। এ-খবর একমাত্র দিতে পারত হিউম্যান মেটাবলিক সিস্টেম যার আচার-আচরণ টিরার অতিচালাক প্রাণীর পক্ষেও হুবহু নকল করা সম্ভব নয়। অতএব পাথর হজম করে নকল কমল নিজেকে এক্সপোজ করে দিয়েছে। আর তার লুকোনোর পথ নেই!
সিগারেটে শেষ টান দিয়ে হাসলেন ডক্টর শ্রীবাস্তব। লাইটার জ্বেলে নতুন একটা সিগারেট ধরালেন? আপনাকে তো আগেই বলেছিলাম ক্যাপ্টেন, এ-পর্যন্ত এমন কোনও জালিয়াতি বা নকলের কথা আমি শুনিনি যা ধরা পড়েনি। দরকার শুধু সময়…।
ক্যাপ্টেন মিত্র একটা সিগারেট বের করে ঠোঁটে রাখলেন। তারপর ডক্টরের হাত থেকে লাইটারটা নেওয়ার জন্য হাত বাড়িয়ে দিলেন।
খবরদার! বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো এক ঝটকায় হাত সরিয়ে নিলেন মোহন শ্রীবাস্তবঃ ছোঁবেন না আমাকে!
ডক্টরের দিকে হতবাক হয়ে তাকিয়ে চোখ পিটপিট করলেন নীতিশ মিত্রঃ আমি লাইটারটা নিতে যাচ্ছিলাম, ডক্টর।
সশব্দে নিশ্বাস ফেললেন শ্রীবাস্তব। লজ্জিতভাবে লাইটারটা এগিয়ে দিলেন ক্যাপ্টেনের ডেস্কে। বললেন, সরি, ক্যাপ্টেন, আমি একটু উত্তেজিত হয়ে পড়েছি। সবাইকেই আমি ভয় করতে শুরু করেছি। সবসময় টিরার প্রাণীর দুঃস্বপ্ন দেখছি। ওদের ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে চলার চেষ্টা করছি। সবটাই হয়তো বোকামি, কিন্তু আমি সাবধান থাকতে চাই, ক্যাপ্টেন… ছোট্ট করে হাসলেন শ্রীবাস্তবঃ এখন চলুন, নকল কমলের একটা ব্যবস্থা করি।
