ক্যাপ্টেন মিত্র হাতে হাত ঘষলেন। মাথা নীচু করে গম্ভীর স্বরে জবাব দিলেন, যদি তাই হয় তা হলে কমল সেনগুপ্ত কমল সেনগুপ্ত নয়! অশোক চিরিমার অশোক চিরিমার ছিল না! আচমকা মুখ তুললেন তিনিঃ কিন্তু প্রমাণ কই, ডক্টর, প্রমাণ কই? কী করে নিঃসন্দেহ হব আমরা?
ভালো প্রশ্ন করেছেন। কয়েক মুহূর্ত কী যেন ভাবলেন মোহন শ্রীবাস্তব। তারপর বললেন, টিরার প্রাণীটি মানুষের দেহে ঢুকে পড়েছে। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে চষে বেড়িয়েছে দেহের প্রতিটি স্নায়ু, প্রতিটি কোষ, রাসায়নিক গঠন, অনুপাত, মস্তিষ্কের প্রতিটি চিন্তার ছাপ। তারপর স-ব সে নকল করে ফেলেছে। এবং খুন করেছে মানুষটিকে। কমল সেনগুপ্তের রক্তাক্ত মৃতদেহ হয়তো পড়ে আছে টিরার কোনও খাদে। আর অশোক চিরিমারের মৃতদেহ সম্ভবত সোলারের ডিসপোজাল চেম্বার দিয়ে ছুঁড়ে দেওয়া হয়েছে মহাশূন্যে। এখন এই নকল মানুষটা সব দিক দিয়েই আসল মানুষটির মতো–অণু-পরমাণু পর্যন্ত নিখুঁত কপি করেছে ওরা। শুধু নকল দেহটার ভেতরে এককোণে রয়ে গেছে। একটা শয়তান ভিনগ্রহের মন, শয়তানি মতলব নিয়ে শুধু ভাবছে…ওত পেতে রয়েছে। শ্রীবাস্তব মাথার চুলে আঙুল চালালেন। হাত ছড়িয়ে আড়মোড়া ভেঙে বললেন, যত নিখুঁত নকলই ওরা করুক, ক্যাপ্টেন, হিউম্যান মেটাবলিক সিস্টেম এক বিচিত্র জিনিস–একমেবাদ্বিতীয়। সেইখানেই ফাঁদ পাতব আমি। তবে গোপনীয়তার খাতিরে আমার মতলবটা এখনই আপনাকে খুলে বলতে পারছি না। কারণ, নিজেকে ছাড়া আমি এখন আর কাউকে বিশ্বাস করি না!
দুজনে পরস্পরের চোখে চোখ রাখলেন। মোহন শ্রীবাস্তবকে শ্রান্ত দেখাচ্ছে। ইঞ্জিনের চাপা গুনগুন শব্দ কেবিনের নিস্তব্ধতাকেও আরও প্রকট করে তুলেছে। ক্যাপ্টেন মিত্রের হাত ঘামছে। সোলারের একাশি জন মানুষ নাকি উনআশি জন?… শুধু তাই নয়, টিরার ভয়ংকর প্রাণী যদি একবার পৃথিবীতে পৌঁছোয় তা হলে গোটা মানবজাতির সর্বনাশ নেমে আসবে। ডক্টরকে সে কথাই জিগ্যেস করলেন তিনি।
প্রাণীটার উদ্দেশ্য কোনওরকমে একবার পৃথিবীতে পৌঁছোনো, তাই না?
হ্যাঁ–ভয়ংকর মনে হলেও কথাটা সত্যি।
যদি আমরা এক্সপ্লোসিভ দিয়ে সোলার-কে মহাশূন্যে উড়িয়ে দিই? উত্তেজনায় দপদপ করছে নীতীশ মিত্রের মুখ।
তাই দেব–যদি না ফাঁদ পেতে ধরতে পারি।
আমাদের হাতে সময় বেশি নেই, ডক্টর–।
জানি। সোলার-কে বিস্ফোরণে উড়িয়ে দিলে এতগুলো মানুষের প্রাণ যাবে, তা ছাড়া, ধুলো হয়ে যাবে কোটি-কোটি টাকার এই মহাকাশযান। সুতরাং শেষ চেষ্টা আমি করবই, ক্যাপ্টেন। এ পর্যন্ত এমন কোনও জালিয়াতি বা নকলের কথা আমি শুনিনি যা ধরা পড়েনি। সুতরাং টিরার প্রাণীকেও ধরা পড়তেই হবে। আমি হাতেনাতে প্রমাণ করে দেব যেকমল সেনগুপ্ত আমাদের মহাকাশযানে এখন রয়েছে সে টিরার প্রাণী–একটা নকল পুতুল! এমন ফাঁদ পাতব যা আন্দাজ করা সেই ভয়ংকর প্রাণীর কল্পনার বাইরে।
রিল্যাক্সার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন শ্রীবাস্তব ও খুব ঘুম পাচ্ছে, ক্যাপ্টেন। আপাতত গুড নাইট। একটা কথা, আমাদের আলোচনার ব্যাপারটা একটু গোপন থাকলে ভালো হয়।
শুভরাত্রি জানিয়ে নীতীশ মিত্র বেরিয়ে এলেন শ্রীবাস্তবের কেবিন থেকে। দুশ্চিন্তার ঢেউ ঘুরপাক খাচ্ছে মাথার ভেতরে। মাথা দপদপ করছে। তবুও কোথায় যেন একটা কৌতূহল খোঁচা মারছে? কী ফাঁদ পেতেছেন ডক্টর শ্রীবাস্তব? সেই ফাঁদে টিরা গ্রহের প্রাণী পা দেবে তো? কে জিতবে এই বুদ্ধির খেলায়?
.
০৫. হার-জিত
মানুষটা বাঙ্কে শুয়ে ছিল। নিশ্চল। ঘুমন্ত। তার মাথার ভিতরে, নিমীলিত দু-চোখের পিছনে অন্য একটা মন নড়ে উঠল–পিছল সরীসৃপের মতো। তারপর চিন্তা ও অনুভূতির অদৃশ্য অ্যান্টেনা ছড়িয়ে দিয়ে আর-একটা মনের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করল। ভিনগ্রহী দুটো শয়তান মন কথা বলতে লাগল। মহাকাশযানের দু-প্রান্তের দুটো কেবিনের মধ্যে যেন তৈরি হয়ে গেল অদৃশ্য টেলিফোন যার অন্য নাম টেলিপ্যাথি। একটা মন নৃশংস, নিষ্ঠুর, প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। আর অন্যজন ভয়ার্ত, সন্ত্রস্ত, দিশেহারা।
আমাদের ফিরে যেতে হবে। আমরা ধরা পড়ে গেছি। ডক্টর শ্রীবাস্তব আমাদের ধরে ফেলেছে…!
কক্ষনো না! তীব্র স্বরে উত্তর দিল দ্বিতীয় মন।
এখনও ফিরে যাওয়ার সময় রয়েছে! সোলার স্পেস জাম্প দেওয়ার পর আমরা অনেক দূরে চলে যাব। তখন আর ফিরে যাওয়ার পথ থাকবে না।
ভীতু! বিশ্বাসঘাতক! দ্বিতীয় মন রাগে গর্জে উঠল। সরীসৃপের মতো কিলবিল করে ফুঁসতে লাগল ও এসব চিন্তা করার আগে তোমার মরে যাওয়া উচিত!
কিন্তু আমাকে সন্দেহ করছে যে! …ডক্টর আমাকে ফাঁদে ফেলতে চাইছে। এত নিখুঁতভাবে নকল করেছি যে, কোথাও কোনও গরমিল নেই, অথচ…ডক্টর মনে-মনে কী মতলব ফেঁদেছে কে জানে…।
ঘৃণা মেশানো শাসনের সুর ভেসে উঠল নীরব কণ্ঠে : ডক্টর শ্রীবাস্তব একটা গদর্ভ, বুন্ধু! ও কিছুতেই আমাদের ধরতে পারবে না।
কিন্তু আমাকে যে কোণঠাসা করতে চাইছে! আতঙ্ক আরও গাঢ় হয়েছে, তীব্র হয়েছে প্রথম মনে ও ডক্টরের মতলব আমি আঁচ করতে পারছি না। জানি না নকল করতে গিয়ে কোথাও কোনও ভুল করে ফেলেছি কি না।
মনঃসংযোগে শোনা গেল নিষ্ঠুর ব্যঙ্গের হাসি : ডক্টর আমাকে সন্দেহ করে না বরং বিশ্বাস করে। ভয় পেয়ো না। ডক্টর শ্রীবাস্তব একটা আস্ত বোকা। আর কয়েকদিনের মধ্যেই ওরা পৃথিবীতে নামবে। সেখানে এরকম কত তাজা মানুষ রয়েছে একবার ভাবো তো। সেখানে আমরা দিব্যি লুকিয়ে কাজ সারতে পারব– নির্লজ্জ প্রত্যাশায় যেন লালা ঝরছে দ্বিতীয় মন থেকে : তারপর ওদের শেষ করে ওদেরই মহাকাশযান নিয়ে আমরা ফিরে আসব আমাদের দেশে। মহাকাশযান বোঝাই করে আর সবাইকে নিয়ে যাব পৃথিবীতে। ওঃ, তখন সেখানে হবে আমাদের নতুন বসতি..। আনন্দে উল্লাসে টগবগ করে উঠল নীরব কণ্ঠস্বর।
