অনেকক্ষণ দুজনে চুপ করে রইলেন। তারপর ইতস্তত করে নীচু গলায় ক্যাপ্টেন বললেন, টিরা গ্রহে কোনও প্রাণের সন্ধান তো আমরা পাইনি, ডক্টর।
না, পাইনি। আর কেন পাইনি তারও একটা ব্যাখ্যা আমি অনুমানে খাড়া করেছি। ডক্টর শ্রীবাস্তব সশব্দে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন : টিরাকে আমরা যেরকম প্রাণহীন ভেবেছি সেরকম যদি না হয়, ক্যাপ্টেন? হ্যাঁ, আপনি হয়তো বলবেন পাগলের কল্পনা, কিন্তু তবুও ধরে নিন টিরা গ্রহে প্রাণ ছিল–চালাক, বুদ্ধিমান, চিন্তাশীল এবং শক্তিশালী প্রাণ। আমরা যখন টিরা গ্রহে নেমেছি তখন ওরা হয়তো তৈরি ছিল হয়তো ওরা আগে থেকেই টের পেয়েছিল আমরা টিরায় ল্যান্ড করতে চলেছি। তারপর থেকে সর্বক্ষণ ওরা আমাদের চোখে-চোখে রেখেছে। আমাদের পরীক্ষা নিরীক্ষা, অভিযান, খোঁজাখুঁজি যখন চলছিল তখন ওরা সবসময়েই ছিল আমাদের সঙ্গে, তবে অলক্ষ্যে, গোপনে। হয়তো ওরা আমাদের দেখা দিতে চায়নি, অন্য কোনও উদ্দেশ্য ছিল ওদের। যদি এমন হয়, টিরার যেসব অংশে আমরা অভিযান চালিয়েছি সেগুলো আমাদের জন্যে আগেভাবেই তৈরি করে রাখা হয়েছিল। ওরাই তৈরি করে রেখেছিল যাতে আমরা কিছু দেখতে না পাই, কিছু খুঁজে না পাই, কিছু জানতে না পারি টিরা সম্পর্কে, এবং ব্যর্থ হয়ে খালি হাতে ফিরে যাই পৃথিবীতে যেমন খালি হাতে আমরা রওনা হয়েছিলাম পৃথিবী থেকে।
সামনে ঝুঁকে এলেন ডক্টর শ্রীবাস্তব। দু-হাত নেড়ে জোর দিয়ে নিজের বক্তব্য প্রতিষ্ঠা করতে চাইলেনঃ এবারে তর্কের খাতিরে ধরে নিন, টিরার প্রাণীদের আমাদের মতো নির্দিষ্ট কোনও চেহারা নেই। হয়তো ওরা নিছকই এক ধরনের জেলির মতো প্রোটোপ্লাজম যে-কোনও ধরনের অবস্থার সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে পারে। হয়তো খুশিমতো ওরা যে-কোনও জিনিসকে নকল করতে পারে। এইরকম নকল কোনও চেহারা নিয়েই ওরা হয়তো আমাদেরই নাকের ডগায় বসে আমাদের প্রতিটি কার্যকলাপের ওপরে নজর রাখছিল। কে বলতে পারে, ওরা হয়তো পাথর, বালি, কিংবা জল সেজে আমাদের দেখছিল। এমনকী–।
এমনকী মানুষের চেহারাও নিয়ে থাকতে পারে! শ্রীবাস্তবের না-বলা কথাগুলোই উচ্চারণ করলেন ক্যাপ্টেন মিত্র। তাঁর মুখ দেখে মনে হচ্ছিল বিশ্বাস-অবিশ্বাস সম্ভব-অসম্ভবের সীমারেখার বাইরে চলে গেছেন তিনি।
ঠিক বলেছেন, ক্যাপ্টেন। ডক্টর শ্রীবাস্তব সমর্থন করলেন নীতীশমিত্রকে ও এবারে একটা প্রশ্ন করি আপনাকে। মনে করুন, টিরার প্রাণীরা আমাদের গ্রহ সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে চায়, আমাদের স্টাডি করে দেখতে চায়, পৃথিবীতে গিয়ে নানান পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতে চায় নিজেদের কৌতূহল মেটানোর জন্যে–তা হলে বলুন, কী করে এসব কাজ ওদের পক্ষে সহজে করা সম্ভব?
নীতীশ মিত্র নিশ্চপ। ডক্টর শ্রীবাস্তবের প্রশ্নের সুর শুনেই বোঝা যায় তার উত্তর সম্পর্কে একটা স্পষ্ট ধারণা তাঁর মনে রয়েছে। অতএব দু-এক মুহূর্ত অপেক্ষা করে উত্তরটা তিনিই দিলেন।
ক্যাপ্টেন, আমার অনুমান টিরার প্রাণীদের কেউ মানুষের চেহারা নিয়ে উঠে এসেছে আমাদের মহাকাশযানে। হয়তো টিরার পাথর-বালি ছড়ানো রুক্ষ প্রান্তরে ওরা খুন করেছে কমল সেনগুপ্তকে। তারপর তাকে নকল করে–চেহারায়, কথাবার্তায়, হাবভাবে, সবকিছুতে–ওদের একজন ঢুকে পড়েছে সোলারে। এই আশা নিয়ে ঢুকে পড়েছে যে, তাকে কমল সেনগুপ্ত মনে করে আমরা পৃথিবীতে নিয়ে যাব। কিন্তু ধরুন, নকল করতে গিয়ে কোথাও যদি গরমিল হয়ে গিয়ে থাকে। মানছি, ওই বিচিত্র প্রাণী কমলের স্মৃতি পর্যন্ত চুরি করেছে, নইলে আপনাকে বা আমাকে নকল কমল চিনতে পারল কেমন করে! কিন্তু তা সত্ত্বেও মানুষের শরীরে এমন কতকগুলো ব্যাপার আছে যা বিশেষজ্ঞ ছাড়া জানা সম্ভব নয়। অতএব সেই কারণেই নকল কমল জানতে পারেনি মানুষের রক্তের স্বাভাবিক রাসায়নিক গঠন কীরকম হয়। আর সেখানেই তার পা ফেলতে ভুল হয়েছে। নিজের আকৃতির পরিবর্তন ঘটিয়ে কমলকে নকল করতে প্রাণীটার সময় লেগেছে। বাইরের খোলসটা হুবহু নকল করে সে তাড়াহুড়ো করে সোলার-এ ঢুকে পড়েছে, কিন্তু তখন ভেতরটা পুরোপুরি বুঝে ওঠা হয়নি। সে পাগলের মতো তথ্য হাতড়ে চলেছে…দিশেহারা, বিভ্রান্ত…যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ভেতরটা সঠিক নকল করা দরকার। ঠিক এইরকম বিপদগ্রস্ত অবস্থায় তার শরীর থেকে ব্লাড স্যাম্পল টানা হল। অতএব স্বাভাবিক কারণেই যে-রক্ত আমরা পেলাম তা ভুলভাল, গোলমেলে, অবাস্তব, অসম্ভব। প্রাণীটা কিন্তু বসে নেই। তার মন ও অনুভবের অদৃশ্য অ্যান্টেনা দিয়ে সে প্রতিমুহূর্তে তথ্য সংগ্রহ করে চলেছে সোলারের অন্যান্য অভিযাত্রীর কাছ থেকে, মহাকাশযানের নানান নথিপত্র থেকে সকলের সম্পূর্ণ অজ্ঞাতে। এইভাবেই সে জানতে পারল মারাত্মক ভুলটা কোথায় হয়েছে। এও বুঝতে পারল ভুলটা মেডিক্যাল রিপোর্টে ধরা পড়েছে, এবং আমাদের চোখে পড়েছে। তখন আমাদের চোখে ধুলো দিতে, ভুল চাপা দিতে, সে খুন করল অশোক চিরিমারকে। তাকে নকল করল, তারপর মরে যাওয়ার ভান করল। ইচ্ছে করে রক্তে দেখিয়ে গেল কমল সেনগুপ্ত এর মতো গোলমাল। এর কারণ, আমরা ভাবব কোনও রহস্যময় রোগের জীবাণু আমাদের মধ্যে সংক্রামিত হয়েছে। আর বাড়ি ফেরার পথে সারাটা সময় এই রহস্যের সমাধান খুঁজে খুঁজে হয়রান হবে আমাদের মস্তিষ্ক। কিন্তু কোনওমতেই সঠিক উত্তর খুঁজে পাবে না। আমার এই ধারণা যদি সত্যি হয়, ক্যাপ্টেন?
