মোহন শ্রীবাস্তব কোনও কথাই শুনছিলেন না। চোখ বন্ধ করে রিল্যাক্সারে হেলান দিয়ে কী একটা বিষয় মনে করার চেষ্টা করছিলেন। খুব কাছাকাছি এসেও ব্যাপারটা তার মনের পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে। অশোক..অশোক চিরিমার..অশোক চিরিমার…মনে পড়েছে!
রিল্যাক্সার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন শ্রীবাস্তব। লম্বা কাঠামো ঋজু করে নিশ্চিত পদক্ষেপে এগিয়ে গেলেন দেওয়ালে আঁটা একটা ক্যাবিনেটের দিকে। মহাকাশযানের যাবতীয় মেডিক্যাল রিপোর্ট থাকে ক্যাপ্টেনের ঘরে, এই ক্যাবিনেটে।
উইথ ইয়োর কাইন্ড পারমিশান, ক্যাপ্টেন– বলে ক্যাবিনেট খুললেন। নতুন-পুরোনো নানা কম্পিউটার প্রিন্টআউট নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি শুরু করলেন। কতকগুলো রিপোর্ট বেছে নিয়ে সেগুলো মিলিয়ে দেখলেন। বারবার চেক করলেন। তারপর থমথমে কালো মুখে ক্যাপ্টেনের দিকে ফিরে গম্ভীর গলায় বললেন, আমি জিতেছি, ক্যাপ্টেন–তবে না জিতলেই বোধহয় ভালো হত…।
নীতীশ মিত্র অবাক জিজ্ঞাসু চোখে চেয়ে রইলেন শ্রীবাস্তবের দিকে।
রিপোর্টগুলো আবার ক্যাবিনেটে ঢুকিয়ে রেখে মোহন শ্রীবাস্তব ক্যাপ্টেনের কাছে এসে দাঁড়ালেন। স্পষ্ট উচ্চারণে বললেন, অশোক চিরিমার একবারের জন্যেও টিরার বুকে পা দেয়নি। গত দু-মাসের ওপর ও সোলারের সিক রুমে ছিল। টিরা থেকে রওনা হওয়ার দুদিন পরে ও সেরে ওঠে। গতকাল ওকে আমি লাস্ট ইঞ্জেকশান দিয়েছি। অর্থাৎ, যখন আমরা সবাই টিরার জমি চষে বেড়াচ্ছি তখন ও ছিল বিছানাবন্দি। ওর ইনফেকশাস মনোনিউক্লিওসিস হয়েছিল। একবারের জন্যেও অশোক চিরিমার মহাকাশযান ছেড়ে মাটিতে নামেনি।
ক্যাপ্টেন মিত্রের চোখে-মুখে দিশেহারা উৎকণ্ঠা। পরাজিত কোণঠাসা মানুষের মতো নিরুপায় সুরে তিনি বললেন, এসবের কারণ কী? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না, ডক্টর!
রিল্যাক্সারে আবার বসলেন শ্রীবাস্তব। তারপর বললেন, মনে হয় আমি বুঝতে পেরেছি। টিরা গ্রহের কোনও অদ্ভুত অজ্ঞাত প্রাণী আমাদের কয়েকজন অভিযাত্রীর দেহে ঢুকে পড়েছে।
.
০৪. অনুমান, আলোচনা, সিদ্ধান্ত
অতিকায় মহাকাশযান সোলার ছুটে চলেছে মহাশূন্যের শরীর ভেদ করে। পৃথিবীর হিসেবমতো চতুর্থ রাত শুরু হয়েছে। পঞ্চম দিনের শুরুতেই সোলার স্পেস জাম্প দেবে হাইপারস্পেসের মধ্যে দিয়ে। সুতরাং মহাকাশযান পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ সব কাজ সাময়িকভাবে শেষ করে নীতিশ মিত্র এসেছেন শ্রীবাস্তবের কেবিনে।
দুজনের আলোচনা চলছিল। একসময় আলোচনায় ছেদ টেনে কফি তৈরি করতে উঠলেন ডক্টর শ্রীবাস্তব। কেবিনের একপাশে টেবিলে বসানো মাইক্রোওয়েভ কুকারে কফি তৈরি করে কাপে ঢাললেন। একটা কাপ এগিয়ে দিলেন ক্যাপ্টেনের দিকে, অন্যটায় নিজে চুমুক দিলেন।
ক্যাপ্টেন মিত্র পায়চারি করছিলেন। কফির কাপ নিয়ে একটা রিল্যাক্সারে শরীর এলিয়ে বসলেন। তার চোখে-মুখে স্পষ্ট উত্তেজনার ছাপ।
মোহন শ্রীবাস্তব নরম সুরে বললেন, কুল ডাউন, ক্যাপ্টেন, উত্তেজিত হবেন না।
কফিতে চুমুক দিয়ে নীতীশ মিত্র জবাব দিলেন, উত্তেজিত না হয়ে উপায় কী! এই মহাকাশযানের প্রতিটি মানুষের দায়িত্ব আমার–আমি এই স্পেসশিপের ক্যাপ্টেন। এমনিতেই আমাদের টিরা অভিযান সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। দেশের মানুষের কোটি-কোটি টাকা খরচ করে শূন্য হাতে আমি ঘরে ফিরছি। টিরাতে কোনওরকম প্রাণের সন্ধান আমরা পাইনি, কোনও উদ্ভিদ সেখানে নেই, দামি খনিজ পদার্থের টিকিও দেখা যায়নি। তবুও আমরা প্রাণপণ খেটেছি। স্যাম্পল নিয়েছি পাথরের, মাটির, বাতাসের। ফটো তুলেছি, রিপোর্ট লিখেছি, তারপর কাগজপত্র গুটিয়ে রওনা হয়েছি বাড়ির দিকে। এ যেন পরীক্ষায় ফেল করে মার্কশিট হাতে নিয়ে বাড়ি ফেরার মতো।…আর এখন, বাড়ি ফেরার পথে রওনা হওয়ার তিনদিন পর আপনি আমাকে ভয়ঙ্কর কথাগুলো শোনালেন। টিরার অদ্ভুত অজ্ঞাত প্রাণী! কফির কাপ টেবিলে নামিয়ে গলার স্বর স্বাভাবিক করে বললেন, বিশ্বাস হতে চায় না, অথচ অশোক চিরিমার যে মারা গেছে তাতে কোনও সন্দেহ নেই। আর ওই বিচিত্র মেডিক্যাল রিপোর্টগুলোকেও তো উড়িয়ে দেওয়া যায় না!
রিল্যান্সার টেনে নিয়ে ক্যাপ্টেনের মুখোমুখি বসলেন ডক্টর শ্রীবাস্তব ও ক্যাপ্টেন, একটা ব্যাপারে আমি নিঃসন্দেহ। অশোক চিরিমার আর কমল সেনগুপ্তের শরীরে যে-অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা গেছে তা কোনও মানুষের শরীরে হওয়া অসম্ভব। আমাদের বডির মেটাবলিজম নানান অবস্থার মধ্যে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেয়। কিন্তু কতকগুলো জিনিস আছে যা হিউম্যান মেটাবলিজম-এর পক্ষে অসম্ভব : যেমন, জিরো ব্লাড সুগার, একশো তিরিশের ওপর ক্রিয়েটিনিন আর এন পি এন ভ্যালু, অথচ মানুষটা বেঁচে আছে!
হতে তো পারে টিরা গ্রহের কোনও কোনও রোগজীবাণু।
না, হতে পারে না! এক ঝটকায় মোহন শ্রীবাস্তব সোজা হয়ে উঠে দাঁড়ালেন। কফি চলকে পড়ল তার হাতে ধরা কাপ থেকে : কতবার একই কথা আপনাকে বলতে হবে, ক্যাপ্টেন? এটা নতুন কোনও রোগজীবাণুর ব্যাপার নয়, এটা সম্পূর্ণ অসম্ভব একটা ঘটনা। হিউম্যান মেটাবলিক সিস্টেমে এ-ধরনের ঘটনা কোনওদিন ঘটতে পারে না, পারে না, পারে না!
নীতীশ মিত্রের মুখ বিবর্ণ হয়ে গেল। কফির কাপ টেবিলে রেখে আবার রিল্যাক্সরে বসলেন শ্রীবাস্তব। তার হাত কাঁপছে থরথর করে। কাঁপছে কপালের নীল শিরা।
