টেবিলে রাখা ইন্টারকম টেলিফোন বেজে উঠল। নীতীশ মিত্র রিসিভার তুললেন। ও-প্রান্তের ধাতব স্বর ব্যস্তভাবে কী সব বলল। নীতীশ জবাব দিলেন, ঠিক আছে, এক্ষুনি যাচ্ছি।
রিসিভার নামিয়ে রেখে ঝটিতি ঘুরলেন ডক্টরের দিকে ও ডক্টর শ্রীবাস্তব, নেভিগেশান রুমে আরও বড় বিপদ হয়েছে। সুপারভাইজার অশোক চিরিমার এইমাত্র মারা গেছে।
.
০৩. ভয়ংকরের সূচনা
মানুষটার দেহে প্রাণ নেই।
মোহন শ্রীবাস্তব মৃতদেহের পাশ থেকে উঠে দাঁড়ালেন। মাথার চুলে আঙুল চালিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তারপর ধনপত রাইয়ের বাহুতে হাত রেখে বললেন, ধনপত, তোমার কিছু করার ছিল না। তুমি ফোনে খবর দেওয়ার আগেই অশোক মারা গেছে।
দীর্ঘকায় স্বাস্থ্যবান ধনপতের চুল উশকোখুশকো, চোখ লালচে, ডানহাত মুঠো, করছে আর খুলছে। রুদ্ধস্বরে ধনপত বলল, আজ সকালবেলা ওকে দারুণ মেজাজে দেখেছি। সারাদিন ধরে আমার সঙ্গে কাজ করেছে, একটিবারের জন্যেও মনে হয়নি ও অসুস্থ। হঠাৎই কী করে যে এমনটা হল…!
দু-পকেটে হাত ঢুকিয়ে ক্যাপ্টেন বললেন, কী মনে হচ্ছে, ডক্টর?
ইশারায় ধনপতকে নেভিগেশান রুমের বাইরে যেতে নির্দেশ দিলেন মোহন শ্রীবাস্তব। তারপর ঘুরে দাঁড়ালেন ক্যাপ্টেনের মুখোমুখি। বললেন, অশোক চিরিমারের ব্লাড টেস্ট না করে আমি কিছু বলতে চাই না।
দুজনেই চুপচাপ পরস্পরের দিকে তাকিয়ে। চোখে-চোখে অনেক কথাই যেন হয়ে গেল। অবশেষে ডাক্তারি ব্যাগ খুলে সিরিঞ্জ বের করলেন শ্রীবাস্তব। অ্যালকোহল দিয়ে সিরিঞ্জ পরিষ্কার করে ঝুঁকে পড়লেন অশোকেন্দুর মৃতদেহের ওপর।
ক্যাপ্টেন মিত্র দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলেন। শ্রীবাস্তবের চোয়ালের রেখা কঠিন। সেখানে দৃঢ় প্রতিজ্ঞার ছাপ এঁকে দিয়েছে কেউ।
কাজ শেষ করে মোহন শ্রীবাস্তব উঠে দাঁড়ালেন। বললেন ক্যাপ্টেন, দশ মিনিটের মধ্যে টেস্ট রিপোর্ট নিয়ে আমি আপনার ঘরে হাজির হচ্ছি।
দুজনেই বেরিয়ে এলেন নেভিগেশান রুমের বাইরে। ধনপত করিডরের একপাশে দাঁড়িয়েছিল। ক্যাপ্টেন বললেন, রাই, এখন থেকে তুমি হলে নেভিগেশান রুম সুপারভাইজার।
থ্যাঙ্ক য়ু, ক্যাপ্টেন। ধনপত কাছে এগিয়ে এল।
উইশ য়ু লাক। একটু থেমে আবার বললেন নীতীশ, চিরিমারের বডিটা সাব জিরো রুমে পাঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করছি। তুমি একটু হেল্প কোরো।
ও.কে., ক্যাপ্টেন। ধনপত রাই নেভিগেশান রুমে ঢুকে পড়ল।
আবছায়া করিডর ধরে ওঁরা দুজনে ফিরে চললেন। মোহন শ্রীবাস্তবের মুখে নতুন আশঙ্কার ছাপ বেশ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
পনেরো মিনিট পরে ক্যাপ্টেনের ঘরে আশঙ্কা পরিণত হল আতঙ্কে।
ব্লাড সুগার জিরো, ক্রিয়েটিনিন লেভেল একশো তিরিশের বেশি, আর এন. পি. এন. একশো পঞ্চাশ! অবসন্ন সুরে উচ্চারণ করলেন ডক্টর শ্রীবাস্তব, অশোক চিরিমারের পক্ষে বেঁচে থাকা সম্ভব ছিল না।
এন. পি. এন… ক্যাপ্টেন একটু অবাক হয়ে তাকালেন।
নন-প্রোটিনাস নাইট্রোজেন। ক্রিয়েটিনিনের সঙ্গেই তৈরি হয়। নরমাল লেভেল প্রতি একশো সি সি রক্তে আট থেকে দশ মিলিগ্রাম। ক্রিয়েটিনিন বাড়লে এন পি এন-ও বাড়ে। পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়ার জন্যে এন পি এন-টাও চেক করেছি, কিন্তু বুঝতে পারছি না…।
ডক্টরকে বাধা দিয়ে নীতীশ মিত্র বলে উঠলেন, তা হলে অশোক চিরিমারই সেই বিচিত্র মানুষ! কিন্তু আপনি না বললেন তার রক্ত আবার স্বাভাবিক হয়ে গেছে?
শ্রীবাস্তব দু-হাতের আঙুলে জট পাকালেন। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, সেটাই তো অবাক কাণ্ড, ক্যাপ্টেন! আমি যার কথা বলেছিলাম সে অশোক চিরিমার নয়।
নীতীশ মিত্র স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। কয়েক মুহূর্ত পরে অস্ফুটে বললেন, অশোক চিরিমার নয়!…তা হলে কে সে?
কমল সেনগুপ্ত। প্রেসার চেম্বারের মেইনটিনান্সে আছে। চিরিমারের রিপোর্ট এর আগে পুরোপুরি নরমাল ছিল।
ডক্টর, কোথাও একটা ভুল হচ্ছে। আমাদের স্টেরিলাইজেশানকে ফাঁকি দিয়ে কোনও জীবাণু হয়তো পৃথিবী থেকেই ঢুকে পড়েছে মহাকাশযানের ভেতরে।
অসম্ভব! অবাস্তব! উত্তেজিত স্বরে বলে উঠলেন ডক্টর, রিল্যাক্সার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন : মহাকাশযান থেকে টিরার মাটিতে পা দেওয়ার আগে প্রত্যেকটি অভিযাত্রীর মেডিক্যাল চেকআপ করা হয়েছে। তখন কোনও গোলমাল ধরা পড়েনি। পৃথিবীর আবহাওয়ার সঙ্গে টিরার মিল থাকায় কোনওরকম স্পেস স্যুট ছাড়াই আমাদের লোকজন টিরা গ্রহের বুকে ঘুরে বেড়িয়েছে। দু-মাস ধরে তারা নানা অভিযান চালিয়েছে। তারপর যখন তারা মহাকাশযানে ফিরে আসে তখন। ডিসইনফেক্ট করার জন্য প্রত্যেককে আলট্রাভায়োলেট রেডিয়েশানের মধ্যে দিয়ে পাঠানো হয় সোলার এর ভেতরে। তখন তো রোগজীবাণুর হদিস আমরা পাইনি! দুমাসেও কারও কোনও রোগ হয়নি, অথচ এখন হঠাৎ– ক্যাপ্টেনের খুব কাছে মুখ এনে শ্রীবাস্তব প্রশ্ন করলেন, এটাকে আপনার কি কোনও রোগ বলে মনে হচ্ছে, ক্যাপ্টেন?
নীতীশ সামান্য শিউরে উঠলেন। বাতানুকূল পরিবেশে তার শীত-শীত করতে লাগল। তিনি চেষ্টা করে যুক্তি খুঁজে পেতে চাইলেন : ডক্টর বহু স্পেসশিপকে আমি রোগের কবলে পড়তে দেখেছি। যেমন গত মাসে টাইটান উপগ্রহ থেকে যে স্পেসশিপটা ফিরে আসে তাতে প্লেগ-এর মারাত্মক জীবাণু পাওয়া গিয়েছিল। কোনও উপায় না দেখে শেষপর্যন্ত মহাকাশযানটিকে জ্বালিয়ে দিতে হয়। ওই জীবাণু প্রতিটি যাত্রীর ফুসফুস অ্যাটাক করেছিল–এবং মাত্র ছঘণ্টার মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল গোটা মহাকাশযানে। অতএব, আবারও ভেবে দেখুন, ডক্টর–।
