মরে যাওয়ার কথা! অবাক বিস্ময়ে ডক্টর শ্রীবাস্তবকে দেখলেন ক্যাপ্টেন, আপনি একজন ডাক্তার হয়ে এসব কী বলছেন!
মেডিক্যাল রিপোর্টের কম্পিউটার আউটপুটগুলো ক্যাপ্টেনের দিকে এগিয়ে দিলেন মোহন শ্রীবাস্তব ও এই মেডিক্যাল রিপোর্টগুলো একবার দেখুন। আপনি তো জানেন, টিরা থেকে রওনা হওয়ার পরদিনই আমি প্রত্যেকের থরো মেডিক্যাল চেকআপের নির্দেশ দিয়েছিলাম। তাতে সোলার এর একাশি জন যাত্রীর প্রত্যেককে মেডিক্যাল বোর্ডের মুখোমুখি হতে হয়েছে–আপনি আমি কেউই বাদ যাইনি। কোনও অভিযান থেকে ফেরার পর এটাই সাধারণ নিয়ম-অভিযাত্রী দলের কেউ যে কোনও জীবাণু বা অন্য কিছু থেকে ইনফেক্টেড হয়নি সে-সম্পর্কে নিঃসন্দেহ হওয়ার জন্যেই এত নিয়ম-কানুন। একটু থেমে ডক্টর শ্রীবাস্তব যোগ করলেন, মেডিক্যাল চেকআপের যে-রিপোর্ট পাওয়া গেছে তা ভারী অদ্ভুত।
ক্যাপ্টেন মিত্র একটা সিগারেট ধরালেন। তার মুখে দুশ্চিন্তা ও উদ্বেগের রেখা ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছিল।
ডক্টর বলে চললেন, একাশি জনের মধ্যে আশি জনের কোনও গোলমাল নেই। তারা সসম্মানে পাস করেছে পরীক্ষায়। কিন্তু একজন– কথা থামিয়ে সেই বিশেষ রিপোর্টটি বের করলেন তিনি এ-মানুষটির সবকিছুই স্বাভাবিক ব্লাড কাউন্ট, ক্লোরাইড, ক্যালসিয়াম, অ্যালবুমিন– গ্লোবিউলিন রেশন, সবকিছু। কিন্তু ব্লাড সুগার পরীক্ষা করে আমরা হোঁচট খেলাম– সামনে পা ছড়িয়ে দিলেন ডক্টর। মেঝের দিকে তাকালেন। কিছুক্ষণ পরে মুখ তুলে নীতীশ মিত্রের চোখে সরাসরি চোখ রেখে বললেন, এই লোকটার বডিতে ব্লাড সুগারের কোনও নামগন্ধ নেই! ব্লাড সুগার জিরো।
ক্যাপ্টেন মিত্রের মুখ কঠিন হল, চোখ বিস্ফারিত অবিশ্বাসে? কী বলছেন, ডক্টর! আমি ডাক্তার নই, তবে আমিও জানি যে ব্লাড সুগার ছাড়া কোনও মানুষ।
বাঁচতে পারে না। ক্যাপ্টেনের কথা কেড়ে নিয়ে শেষ করলেন শ্রীবাস্তব। তারপর মাথা নাড়লেন সম্মতি জানিয়ে : ঠিকই বলেছেন আপনি। তবে এখানেই শেষ নয়–আরও আছে। ব্লাড সুগারের কোনও হদিস না পেয়ে আমরা ব্লাড ক্রিয়েটিনিন পরীক্ষা করে দেখলাম। ক্রিয়েটিনিন তৈরি হয় শরীরের প্রোটিন ভেঙে। কিডনি এটাকে চটপট ছেকে বের করে দেয় রক্ত থেকে, আর ক্রিয়েটিনিন শরীর থেকে বেরিয়ে আসে ইউরিনের সঙ্গে। ক্রিয়েটিনিন ছেকে রক্ত থেকে বের করে না দিতে পারলে বিপদ নেমে আসে খুব তাড়াতাড়ি। একশো সিসি রক্তে সাধারণত ক্রিয়েটিনিন থাকে এক থেকে চার মিলিগ্রাম। এর পরিমাণ দশ মিলিগ্রামের ওপরে গেলেই রোগীর পক্ষে তা মারাত্মক। কখনও যদি এটা কুড়ি-পঁচিশের ওপরে চলে যায় তা হলে ডায়ালিসিস ছাড়া রোগীকে বাঁচানো অসম্ভব। ক্রিয়েটিনিন ভ্যালু কুড়ি-পঁচিশের কাছাকাছি নিয়ে কোনও মানুষ সুস্থভাবে হাঁটা-চলা তো দূরের কথা, বেঁচে থাকতেই পারে না। অথচ এক মুহূর্ত থামলেন মোহন শ্রীবাস্তব। কপালের কাল্পনিক ঘাম মুছলেন : পরীক্ষায় এই লোকটার ক্রিয়েটিনিন ভ্যালু বেরিয়েছে একশো পঁয়তিরিশ!
অপলকে ডক্টর শ্রীবাস্তবের দিকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে রইলেন ক্যাপ্টেন মিত্র। তারপর মেডিক্যাল রিপোর্টগুলো নিয়ে টেবিলে ঝুঁকে পড়লেন। চুপচাপ সেগুলো উলটেপালটে দেখতে থাকলেন।
দেখা শেষ হলে অনেকটা আপনমনেই বললেন, স্যাম্পল নেওয়ার সময় যদি কোনও ভুল হয়ে থাকে…অথবা ল্যাবরেটরির টেস্টে যদি কোনও বাজে কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয়ে থাকে…। আচমকা মুখ তুলে শ্রীবাস্তবের দিকে তাকালেন। বেশ জোরের সঙ্গেই বললেন, ..তা ছাড়া, কম্পিউটারও তো ক্যালকুলেশনে ভুল করতে পারে–মানে, প্রোগ্রামে যদি কোনও গোলমাল হয়ে গিয়ে থাকে।
মোহন শ্রীবাস্তব হেসে ফেললেন : ক্যাপ্টেন, পরিষ্কার বুঝতে পারছি আপনার সন্দেহগুলো আপনার নিজের কানেই বেসুরো ঠেকছে। তবুও বলি, না, আপনি যেরকম ভাবছেন সেরকম কোনও গোলমাল হয়নি। আমার মেডিক্যাল রিপোর্টগুলো হান্ড্রেড পার্সেন্ট কারেক্ট। একটু থেমে আবার বললেন, ওই বিচিত্র মানুষটির ব্লাড সুগার ও ক্রিয়েটিনিন ভ্যালু পাওয়ার পর আমি তাকে ডেকে পাঠিয়েছিলাম। সে হাসিমুখে ল্যাবরেটরিতে এসে হাজির। সুস্থ-সবল চেহারা, অসুস্থতার ছায়া পর্যন্ত নেই। আমি আবার তার শরীর থেকে রক্ত নিলাম। তারপর অ্যানালিসিস করলাম আমি নিজেই। দ্বিতীয়বারে যে-রিপোর্ট পেলাম তাতে আবার দুশ্চিন্তা কমে না গিয়ে উলটে বেড়ে গেল। কারণ দ্বিতীয়বারের রক্ত একেবারে স্বাভাবিক হাত বাড়িয়ে একটা মেডিক্যাল রিপোর্ট দেখিয়ে দিলেন শ্রীবাস্তব, এই যে, দুবারের রিপোর্টই এতে আছে।
ক্যাপ্টেনের আঙুল কেঁপে উঠল। অস্বাভাবিক গলায় তিনি বললেন, কোনও মানুষের রক্তের কেমিক্যাল কম্পোজিশন কি এভাবে নিজে থেকে পালটে যেতে পারে–এরকম আচমকা?
না, পারে না। কাকতালীয়, দুর্ঘটনা, যা-ই বলুন না কেন, কোনওমতেই এটা সম্ভব নয়। অথচ এক্ষেত্রে তাই ঘটেছে। দু-বার রক্ত নেওয়ার মধ্যে সময়ের ব্যবধান ছিল মাত্র কুড়ি ঘণ্টা। না, স্যাম্পল ওলটপালট হয়নি। কারণ প্রত্যেক স্যাম্পল-এর সঙ্গে ছিল নির্দিষ্ট নম্বর এবং যার স্যাম্পল তার আঙুলের ছাপ। আমরা সেগুলো চেক করে দেখেছি। একই লোকের শিরা থেকে দুটো ব্লাড স্যাম্পল নেওয়া হয়েছে।
