ধনপত রাই সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে এগিয়ে গেল নেভিগেশান প্যানেলের শেষ প্রান্তে। এক ঝটকায় তুলে নিল টেলিফোনের রিসিভার। দ্রুত হাতে ডায়াল ঘুরিয়ে ব্যস্ত গলায় বলে উঠল, সেন্ট্রাল কন্ট্রোল? নেভিগেশান রুম থেকে বলছি! শিগগিরই ডক্টর শ্রীবাস্তবকে এখানে পাঠিয়ে দিন। মনে হচ্ছে…।
কী মনে হচ্ছে? ও-প্রান্ত থেকে উৎকণ্ঠিত প্রশ্ন ভেসে এল।
মনে হচ্ছে… মেঝেতে পড়ে থাকা নিথর নিস্পন্দ দেহটার দিকে ভয়ার্তভাবে একবার দেখল ধনপত রাই। তারপর বলল, মনে হচ্ছে নেভিগেশান রুম সুপারভাইজার অশোক চিরিমার এইমাত্র মারা গেছে।
.
০২. সন্দেহের সূত্রপাত
নিউম্যাটিক রিল্যাক্সার-এ আধশোয়া ভঙ্গিতে বসেছিলেন ডক্টর মোহন শ্রীবাস্তব। পলিথিনের ব্যাগে বাতাস ঠেসে তৈরি বিচিত্র এই নিউম্যাটিক রিল্যাক্সার–আধুনিক আরামকেদারা। হেলান দিয়ে বসলেই চোখে ঘুমের আমেজ জড়িয়ে আসে। কিন্তু এখন, এই মুহূর্তে, ডক্টর শ্রীবাস্তবের চোখে ঘুমের আমেজ নেই, বরং দুশ্চিন্তায় মাথাটা ভার হয়ে আছে। সামনে পা ছড়িয়ে থমথমে মুখে তিনি তাকিয়ে আছেন অবজারভেশান পোর্টের স্বচ্ছ আবরণ ভেদ করে বাইরের অন্ধকারের দিকে। অভিব্যক্তিহীন শূন্য দৃষ্টি। মাথার চুল এলোমেলো। ডান হাতের সরু-সরু আঙুলের ফাঁকে ধরা একগোছা কাগজ। সোলার মহাকাশযানে উপস্থিত একাশি জন অভিযাত্রীর মেডিক্যাল রিপোর্ট। একটু আগেই কম্পিউটার রুম থেকে রিপোর্টগুলো তাঁর হাতে এসেছে। রিপোর্টগুলো দেখার পরই ভীষণ ক্লান্ত লাগছে, একা লাগছে, আর ভয় করছে।
ডক্টর শ্রীবাস্তব রিল্যাক্সার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। মাথার অগোছালো চুলে হাত চালিয়ে পায়চারি করতে লাগলেন। তাঁর দশাসই লম্বা কাঠামো সামান্য ঝুঁকে পড়েছে। শক্ত চোয়ালের ওপর খোঁচা-খোঁচা দাড়ি। সরু গোঁফ। মাথার সামনের দিকে চুল পাতলা হয়ে কপাল অনেকটা বড়। কপালে একটা নীল শিরা দপদপ করছে। দুশ্চিন্তার স্পষ্ট ইশারা।
ডক্টর শ্রীবাস্তব ধীরে ধীরে কথা বলেন, মার্জিত তার আচরণ, সকলের সঙ্গে মানিয়ে চলতে চেষ্টা করেন, সবসময় সকলের শরীর-স্বাস্থ্যের খোঁজখবর করেন, বুদ্ধি খুব তীক্ষ্ণ না হলেও তিনি পরিশ্রমী, কর্তব্য ও দায়িত্ব সম্পর্কে বেশি সচেতন। হয়তো এই কারণেই টিরা গ্রহের দীর্ঘ অভিযানে বিশজন চিকিৎসকের মধ্যে থেকে তাঁকে বেছে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু তার অতিরিক্ত দায়িত্বজ্ঞানের জন্য সঙ্গী অভিযাত্রীরা তাকে ঠাট্টাও করে। বলে, ডক্টর, আপনি বড় বেশি ডাক্তারি করেন।
ডক্টর শ্রীবাস্তব হেসে উড়িয়ে দেন সেকথা। তিনি জানেন, এইসব গুরুত্বপূর্ণ অভিযানে সাবধান হওয়াটা কত জরুরি। আর সাবধান ছিলেন বলেই না মেডিক্যাল রিপোর্টের মারাত্মক গরমিলটা তার নজরে পড়েছে। এর আগে তিন-তিনটে গুরুত্বপূর্ণ অভিযানে মেডিক্যাল চেকআপে ঢিলেমির জন্যে পৃথিবীতে ফিরে আসা মহাকাশযানে গ্রহান্তরের মারাত্মক জীবাণুর সন্ধান পাওয়া গেছে।
টিরা গ্রহের অভিযান ব্যর্থ হয়েছে। শুধু ব্যর্থ বললে অনেক কমই বলা হয়। সৌরজগৎ থেকে ৮.২৬ আলোকবর্ষ দূরের তারা ম্যাক্সিমা সেন্টরি। আধুনিকতম মহাকাশযান সোলার হাইপারস্পেসের মধ্যে দিয়ে স্পেস জাম্প করে অনেক কম সময়ে অতিক্রম করেছে ৮.২৬ আলোকবর্ষের সুবিশাল দূরত্ব। পৃথিবীর অভিযাত্রী দল সেখানে পৃথিবীর হিসেবে প্রায় দুমাস সময় কাটিয়েছে। তন্নতন্ন করে অভিযান চালিয়েছে টিরা গ্রহের রুক্ষ জমিতে। কিন্তু সমস্ত পরিশ্রমই ব্যর্থ হয়েছে। টিরা সম্পর্কে মানুষের এত আশা ছিল, এত উত্তেজনা ছিল, অথচ শেষপর্যন্ত নিট ফল হল শূন্য। শুরু থেকে শেষপর্যন্ত শুধুই হতাশা। এই অভিযানের ফলাফলে কোনও কৃতিত্ব নেই, কোনও যশ নেই, কোনও আবিষ্কার নেই, কিচ্ছু নেই।
অন্তত একঘণ্টা পর্যন্ত ফলাফল সেইরকমই ছিল। কারণ তখনও মেডিক্যাল রিপোর্টগুলো মোহন শ্রীবাস্তবের হাতে আসেনি, সেগুলো পরীক্ষা করে দেখা হয়নি। কিন্তু রিপোর্টগুলো খুঁটিয়ে স্টাডি করার পর অবয়বহীন বিকৃত এক আতঙ্ক জমাট বেঁধেছে ডক্টর শ্রীবাস্তবের মনে।
পায়চারি থামিয়ে বাইরে করিডরে এলেন। আঁধারি করিডরের শেষে ক্যাপ্টেন মিত্রের কেবিন। কেবিনের খাটো দরজার ওপরেই একটা ছোট্ট আলো জ্বলছে। ক্যাপ্টেন মিত্র ঘরেই আছেন তা হলে! দৃঢ় পায়ে সেদিকে এগোলেন ডক্টর। কলিংবেলে চাপ দিলেন। ক্যাপ্টেন কি বিশ্বাস করবেন তার কথা? বিশ্বাস করুন আর নাই করুন, আর কোনও পথ খোলা নেই মোহন শ্রীবাস্তবের সামনে।
ডক্টর শ্রীবাস্তব ঘরে ঢুকতেই ক্যাপ্টেন নীতীশ মিত্র ঘুরে তাকালেন। হেসে বললেন, আসুন ডক্টর, কী খবর বলুন।
মোহন শ্রীবাস্তব ক্যাপ্টেনের টেবিলের কাছে এগিয়ে গেলেন। ক্যাপ্টেনের পাশে একটা রিল্যাক্সার টেনে নিয়ে বসলেন। বললেন, খবর খারাপ, ক্যাপ্টেন। একটা বিপদের আঁচ পেয়েছি আমি।
বিপদ! কীসের বিপদ? হালকা মেজাজে হাসলেন নীতীশ মিত্র, এই নিষ্ফলা অভিযানে বিপদটা আসবে কোত্থেকে?
তা জানি না, তবে এসেছে। গম্ভীরভাবে বললেন শ্রীবাস্তব, আমাদের মহাকাশযানে একজন বিচিত্র মানুষ রয়েছে, ক্যাপ্টেন।
ক্যাপ্টেন মিত্রের হালকা হাসি মিলিয়ে গেল : বিচিত্র মানুষ!
বিচিত্র শুধু নয়, অবিশ্বাস্য। মানুষটা দিব্যি হেঁটে-চলে বেড়াচ্ছে, সুস্থ, জোয়ান–অথচ তার মরে যাওয়ার কথা।
