রক্ত ছিটকে আমার জামা-প্যান্টেও লেগেছে। কিন্তু তার জন্যে চিন্তার কোনও কারণ নেই। ওই যে বলেছি, ডবল জামা-প্যান্ট।
টনির ফ্ল্যাটের টয়লেটে ফিরে ওপরের রক্ত মাখা জামা আর প্যান্ট খুলে ফেলব। ওগুলো টাইম মেশিনের বাক্সের মধ্যে লুকিয়ে রাখব। তারপর মেশিনের সঙ্গে প্যাক করে নিয়ে সোজা বাড়ি।
এবারে আর জামা-প্যান্ট পোড়ানোর গন্ধ পেয়ে কেউ আমাকে বিরক্ত করতে আসবে না।
জিনিয়ার ডেডবডির দিকে তাকিয়ে হঠাৎ মনে হল, ওর নাচের প্রোগ্রামগুলোর এখন তা হলে কী হবে?
আর ঠিক তখনই মিয়াও-মিয়াও ডাক শুনতে পেলাম।
আচমকা ডাকে চমকে তাকিয়ে দেখি গিনিপিগ। কোথায় ছিল কে জানে! আদরের মালকিনের খোঁজে বেরিয়ে এসেছে। তারপর জিনিয়ার রক্ত মাখা ডেডবডির কাছে গিয়ে মাথা ঝুঁকিয়ে গন্ধ শুঁকছে আর মিয়াও-মিয়াও করে ডাকছে।
হঠাৎই বেড়ালটা মেঝেতে পড়ে থাকা রক্তের ওপরে মাথা নামাল। জিভ বের করে চাটতে শুরু করল।
আমার গা ঘিনঘিন করে উঠল। ওটাকে হুস-হুঁস করে তাড়াতে চেষ্টা করলাম।
বেড়ালটা সবুজ চোখে সরাসরি তাকাল আমার দিকে। এবং কথা নেই বার্তা নেই হঠাৎ হোয়াও করে বিকট ডেকে উঠে আমার বুক লক্ষ্য করে হিংস্রভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ল।
তারপরই হুউস।
.
টনির হলঘরে আমি সার্কাসের জোকারের মতো দাঁড়িয়ে রয়েছি। রক্ত মাখা জামাকাপড়ে একটা বেড়ালের সঙ্গে ধস্তাধস্তি করছি। আমাকে ঘিরে ঝকঝকে পোশাক পরা গেস্টের দল। পাগল করা ছন্দে ঝিনচ্যাক মিউজিক বাজছে। সেই তালে তাল মিলিয়ে সবাই এলোমেলো পা ফেলে নাচছে।
আমাকে দেখামাত্রই পলকে মিউজিক থেমে গেল। নাচ থামিয়ে সবাই যেন ফ্রিজ শট হয়ে গেল। আমাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে সবাই। তাদের অবাক গোল-গোল চোখে নীরব প্রশ্ন।
আমার মাথা কাজ করছিল না। শুধু বুঝতে পারছিলাম আমার বাড়ির মাস্টার বেডরুম থেকে বাইরে বেরিয়ে এসেছিলাম বলে ফিউচারে পৌঁছে আমার পজিশান বদলে গিয়েছিল। সেইজন্যে টাইম মেশিন আমাকে ঠিকঠাক টয়লেটের ভেতরে ফেরত নিয়ে আসার বদলে এই হলঘরে এনে হাজির করেছে।
এ ছাড়া সঙ্গে রয়েছে এই হতচ্ছাড়া পাগল বেড়ালটা। আঁচড়ে কামড়ে আমাকে অস্থির করে তুলেছে। আর আমার জামা-প্যান্টের এখানে ওখানে লেগে রয়েছে রক্ত–জিনিয়ার রক্ত।
ওদের সাফাই দেওয়ার চেষ্টা করে আর কোনও লাভ নেই। টয়লেটের দরজা ভাঙলেই টাইম মেশিনটা ওরা দেখতে পাবে। তারপর…।
সোনি হাঁ করে আমাকে দেখছিল। হঠাৎই ও তীক্ষ্ণ গলায় চিৎকার করে উঠল। তার সঙ্গে আরও দু-একজন মহিলা গলা মেলাল।
অপমানে, ক্ষোভে, লজ্জায় আমার চোখে জল এসে গেল। এরই নাম পারফেক্ট মার্ডার! ছিঃ!
তাই আপনাদের হাতজোড় করে একটা রিকোয়েস্ট করছি। টাইম মেশিন হাতে থাকলেও কখনও খুন করবেন না। প্লিজ!
টিরা গ্রহের ভয়ংকর (নভেলেট)
০১. প্রথম দুর্ঘটনা
অন্ধকার মহাকাশে মিটমিট করে জ্বলছে অসংখ্য নক্ষত্র। যেন দেওয়ালির উৎসব শুরু হয়েছে চারিদিকে। মহাকাশযান সোলার ছুটে চলেছে অন্ধকারের বুক চিরে। লক্ষ্য পৃথিবীর কক্ষপথ। সুদীর্ঘ অভিযান শেষ করে সোলার ঘরে ফিরে চলেছে।
অশোক চিরিমার নেভিগেশান প্যানেলের দিকে তাকিয়ে বসে ছিল। মুখ-চোখ ফ্যাকাশে। মহাকাশ-মানচিত্র খুঁটিয়ে দেখতে চেষ্টা করছে ও। হঠাৎই ওর গোটা শরীর থরথর করে কেঁপে উঠল। শরীরে কেমন একটা অস্বস্তি। বুকের ভেতরটা যেন মোচড় দিয়ে উঠছে।
ঠিক তখনই লম্বা-চওড়া চেহারার আর-একজন মানুষ নেভিগেশান রুমের খাটো দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল। অশোক চিরিমারের পিঠে আলতো থাপ্পড় মেরে হেসে বলল, যাক, শেষ পর্যন্ত তা হলে বাড়ি ফেরা হচ্ছে। ওই কাঠখোট্টা রুক্ষ গ্রহে দু-মাস কাটিয়ে আমার মেজাজটাই কাঠখোট্টা হয়ে যাচ্ছিল।
কথা বলতে-বলতে নেভিগেশান প্যানেলের টিভি-পরদায় চোখ রাখল ধনপত রাই। পরদায় একটা উজ্জ্বল লাল ফুটকি। পৃথিবী! সেদিক থেকে চোখ সরিয়ে পুরু প্লাস্টিকের স্বচ্ছ আবরণ দেওয়া জানলার দিকে তাকাল ধনপত রাই। অন্ধকার মহাকাশে অসংখ্য তারার ফুটকি জ্বলছে।
ঘরে ফেরার এত আনন্দ জানতাম না। ধনপত রাই বলল। তারপর অশোকেন্দুর পাশে ঝুঁকে পড়ে জিগ্যেস করল, চিরিমার, তোমার আনন্দ হচ্ছে না?
অশোক ফ্যাকাশে বিবর্ণ মুখে ধনপতের দিকে দেখল ও আনন্দ হচ্ছে–তবে শরীরটা ভীষণ খারাপ লাগছে।
সঙ্গে-সঙ্গেই একটা ঝটকা মেরে উঠল অশোকেন্দুর শরীর। চোখ বিস্ফারিত। ঘন-ঘন শ্বাস পড়ছে। ও ঝুঁকে পড়ল নেভিগেশান প্যানেলের ওপরে।
ধনপত রাই ওকে চেপে ধরল দু-হাতে। উত্তেজিত স্বরে বলল, চিরিমার, কী হয়েছে! শরীর কেমন লাগছে?
অতিকষ্টে ফিশফিশ করে জবাব দিল অশোক, রাই, শিগগির ডক্টর শ্রীবাস্তবকে খবর দাও। আমার বুকের ভেতরে খুব কষ্ট হচ্ছে। যন্ত্রণায় মাথা ছিঁড়ে পড়ছে। শিগগির–।
আবার ঝাঁকুনি খেল অশোকেন্দুর দেহ। প্যানেলের ওপরে ওর হাতের বাঁধন শিথিল হল। অশোক হুমড়ি খেয়ে পড়ল নেভিগেশান রুমের মেঝেতে।
ধনপত রাই তৎপর ভঙ্গিতে ওকে ধরতে চেষ্টা করল। চিত করে শুইয়ে দিল। জরুরি স্বরে বলল, ঘাবড়ানোর কিছু নেই, চিরিমার, এক্ষুনি ডক্টর শ্রীবাস্তবকে খবর দিচ্ছি।
কিন্তু ততক্ষণে অশোক চিরিমারের দেহ যন্ত্রণায় বেঁকে গেছে। কাশির দমকে মুখ লাল, দম আটকে চোখজোড়া ঠেলে বেরিয়ে আসছে, মুখের রং নীল। তীব্র আক্ষেপে শরীরটা ঝাঁকুনি খেতে খেতে হঠাৎই স্থির হয়ে গেল। সব শেষ।
