হাসল জিনিয়া : চলে এসো। অভিনয় যখন করছ ভালো করেই করো।
অভিনয়? ঠাট্টা করে বললাম, এক্ষুনি তোমার কাছে যাচ্ছি। দেখাচ্ছি মজা।
আমার ডায়লগগুলো আপনারা দয়া করে খেয়াল করবেন।
জিনিয়া খুন হলে পুলিশ অফিসাররা ওর মোবাইল ফোন নিয়ে পড়বে। ওর কল লিস্ট দেখবে। এমনকী কথাবার্তার রেকর্ডও শুনবে। তখন ওরা যাতে নিশ্চিত প্রমাণ পায় যে, খুন হওয়ার পাঁচ-সাত মিনিট আগেও আমার আর জিনিয়ার মধ্যে অন্তত বিশ কিলোমিটার ফারাক ছিল, সেইজন্যেই আমার ওই কথাগুলো বলা। আর এ তো জানা কথা, ওয়াইফ মার্ডার হলে সমস্ত সন্দেহের তির আগে ছোটে বেচারা হাজব্যান্ডের দিকে।
আর দেরি করলাম না। ফ্ল্যাটের চারদিকে চোখ বুলিয়ে দেখলাম সবাই নাচে, গানে আর গ্লাসে মত্ত। আমার দিকে কারও নজর নেই। তাই টুক করে টাইম মেশিন হাতে টয়লেটে ঢুকে পড়লাম। দরজা বন্ধ করে দিলাম ভেতর থেকে।
কোথায় যেন প্লাগ পয়েন্টটা? ওই তো!
মেশিনটাকে তাড়াতাড়ি সেখানে নিয়ে গেলাম। সুইচ অন করলাম। প্ল্যাটফর্মটা পেতে তার ওপরে উঠে দাঁড়ালাম।
আমার বুকের ভেতরে ডুগডুগি বাজছিল। দমবন্ধ হয়ে আসতে চাইছিল।
মেশিনের ডায়াল সেট করলাম, কিবোর্ডে বোতাম ঠুকতে লাগলাম।
এত ঘামছি কেন কে জানে! আমার মার্ডার স্কিমে তো কোনও ফাঁকফোকর নেই! পারফেক্ট মার্ডার। পারফেক্ট।
এবার নব ঘোরালাম। এন্টার বোতাম টিপলাম।
.
আমাকে দেখে জিনিয়া চমকে উঠল।
হাই, জিনি!
তু-তুমি! ম্যাগাজিনটা ওর হাত থেকে খসে পড়ে গেল। ও ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসল।
হ্যাঁ, আমি হেসে ওর কাছে এগিয়ে গেলাম : বললাম যে, এক্ষুনি তোমার কাছে যাচ্ছি। দেখাচ্ছি মজা।
তুমি পার্টিতে যাওনি? সন্তোষপুরে?
উত্তরে ঝুঁকে পড়ে ওকে জড়িয়ে ধরলাম। কপালে একটা চুমু খেলাম। বললাম, আমার টাইম মেশিনের ব্যাপারটা গল্প নয় সত্যি, জিনি। এই দ্যাখো সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে দু-পাশে দু-হাত ছড়িয়ে দিলামঃ আমি রিয়েল আমি। রক্ত-মাংসের দেবদত্ত রায়চৌধুরী।
বিছানায় সেই জায়গাটার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। তোশকের নীচে হাত ঢুকিয়ে হাতুড়িটা বের করলাম।
বেশ ভারী হাতুড়ি। মুণ্ডুটা প্রায় পাঁচশো গ্রাম হবে। কারও মুণ্ডু গুঁড়ো করার পক্ষে বেশ নির্ভরযোগ্য হাতিয়ার।
জিনিয়া হাঁ করেছিল। বোধহয় চিৎকার করবে বলে। কিন্তু সেটা করে ওঠার আগেই আমি শূন্যে হাত ঘুরিয়ে সাংঘাতিক মোমেন্টামে হাতুড়িটা ওর মাথায় নামিয়ে আনলাম।
কিন্তু রিফ্লেক্স যাবে কোথায়!
শেষ মুহূর্তে জিনিয়া মাথাটা ইঞ্চিচারেক সরাতে পেরেছিল। তাই আমি ব্ৰহ্মতালু তাক করলেও হাতুড়িটা শেষ পর্যন্ত ওর মাথার বাঁ-দিক ছুঁয়ে কান ঘেঁষে কাঁধে গিয়ে পড়ল।
ও বাঁ-দিকে কাত হয়ে গেল। দেবু, কী করছ, কী করছ! বলে যন্ত্রণায় ককিয়ে উঠল। তারপরই আমাকে অবাক করে দিয়ে ঘরের দরজা লক্ষ্য করে ছুট লাগাল।
এটা আমার ছকের মধ্যে ছিল না। ও যে দৌড়ে পালাতে পারবে সেটা ভাবিনি।
আমি একমুহূর্ত হকচকিয়ে গেলেও পরক্ষণেই ওকে পাগলের মতো তাড়া করলাম। ডবল জামা-প্যান্টের জন্যে ছুটতে বেশ অসুবিধে হচ্ছিল। কিন্তু প্রচণ্ড গোঁ আমাকে ছুটিয়ে নিয়ে চলল। বেশ বুঝতে পারছিলাম, আমার ভেতরের ঠান্ডা খুনিটা আবার জেগে উঠেছে।
দরজার বাইরে বেরিয়ে ও ড্রইং-ডাইনিং-এর দিকে দৌড়তে শুরু করেছিল। তার সঙ্গে-সঙ্গে একটা চিৎকারও শুরু করেছিল।
কিন্তু আমি অদ্ভুত ক্ষিপ্রতায় হাত বাড়িয়ে ওর ঘাড়ের গোড়ায় হাতুড়ি বসিয়ে দিলাম। ছুটন্ত জিনিয়া এবং চিৎকার–দুটোকেই মাঝপথে থামিয়ে দিলাম।
আঁক শব্দ করে জিনিয়া মুখ থুবড়ে পড়ল মেঝেতে।
জিনিয়া উপুড় হয়ে পড়েছিল। ওকে আর চিত হওয়ার সুযোগ দিলাম না। চট করে ওর পাশে হাঁটুগেড়ে বসে পড়লাম। হাতুড়ি নিয়ে এলোপাতাড়ি কাজ করে চললাম। ওর নাচ, সন্দেহ, দ্রৌপদী সিনড্রোম, ফিগারসব একসঙ্গে থেঁতো হয়ে যাচ্ছিল।
আমার ভেতরে বোধহয় একটা জন্তু ঢুকে পড়েছিল। কারণ, বেশ টের পাচ্ছিলাম, অন্ধ আক্রোশ, রাগ, ঘৃণা, হিংসা–সব আমার মাথার ভেতরে টগবগ করে ফুটছিল। আমি ফোঁস-ফোঁস করে হাঁপাচ্ছিলাম। জিনিয়াকে কখনও মনে হচ্ছিল টিয়াপাখি, কখনও-বা তুলতুলে কুকুর।
কিন্তু একইসঙ্গে আমি ঠান্ডা মাথায় ভাবছিলাম। বাড়ির সদর দরজা বন্ধ। বাড়িতে আর কেউ নেই। বারান্দার দরজা ভেতর থেকে বন্ধ খিল ছিটকিনি আঁটা। সুতরাং জিনিয়ার মার্ডার মিস্ট্রির সমাধান করতে পুলিশ হিমসিম খেয়ে যাবে। ইমপসিল ক্রাইম। লড রুম মিস্ত্রি। খুনি বাড়িতে ঢুকল কী করে, আর বেরোলই বা কী করে? ঢোকার সময় জিনিয়া যদিও বা দরজা খুলে দিয়ে থাকে, খুন করে চলে যাওয়ার পর জিনিয়ার পক্ষে তো আর দরজা বন্ধ করে খিল-ছিটকিনি এঁটে দেওয়া সম্ভব নয়।
মনে-মনে হাসি পেয়ে গেল আমার। পুলিশ আমাকে সন্দেহ করে প্রচুর জিজ্ঞাসাবাদ করবে, কিন্তু কিছুই করতে পারবে না। আমি হাতুড়িটা হাতে নিয়ে হাঁফাতে হাঁফাতে উঠে দাঁড়ালাম। পকেট থেকে রুমাল বের করে ওটার হাতলটা ঘষে ঘষে মুছে দিলাম। তারপর ওটাকে একপাশে ফেলে দিলাম।
জিনিয়ার বডিটা মেঝেতে উপুড় হয়ে লেপটে রয়েছে। ওর মাথা থেকে রক্ত চুঁইয়ে-চুঁইয়ে মেঝেতে গড়িয়ে যাচ্ছে। দু-তিনটে মাছি কোথা থেকে যেন এসে ওড়াউড়ি শুরু করেছে। ডিসগাস্টিং মেস।
