পার্টির চার-পাঁচদিন আগে থেকেই আমি জিনিয়ার সঙ্গে প্রেমিকের মতো ব্যবহার শুরু করলাম। যাতে কেউ বুঝতে না পারে আমাদের সম্পর্কটা আর ঠিকঠাক নেই। কোথাও একটা চোরা ফাটল ধরেছে।
জিনিয়া মাঝে-মাঝে ভুরু কুঁচকে আমাকে দেখত। কয়েকবার বলেও ফেলেছে, তোমার কী হয়েছে বলো তো? সকাল-বিকেল এত মিষ্টি কথা! নিশ্চয় এর পেছনে কোনও মতলব রয়েছে।
আমি হেসে বলেছি, মতলব আছে। তোমাকে বদলে দেওয়ার মতলব। পুরোনো দিনগুলো আবার ফিরে পেতে চাই আমি।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলেছে ও : সে কী কখনও হয়! দিন বদলায়, মানুষ বদলায়। সেটাই নিয়ম।
ওরে বাবা! এ যে একেবারে ফিলজফারের ডায়ালগ! যাকগে, হাতে তো আর মাত্র কটাদিন!
মার্ডার নাম্বার থ্রি-র পারফেকশানের কথা ভেবে আমি আরও একটা কাজ করেছিলাম। হুবহু একইরকম দেখতে দুটো জামা আর দুটো প্যান্ট কিনেছিলাম। দু-সেটই আমার জন্যে–তবে একটা সেটের সাইজ একটু ছোট, আর-একটা একটু বড়।
ঘটনার দিন জিনিয়াকে বললাম যে, আমার একটা পার্টিতে নেমন্তন্ন আছে–অনেক দুরে, এক্সট্রিম সাউথে। সুবীরের এক বন্ধুর বাড়িতে। ফিরতে রাত হবে।
জিনিয়ার চোখে সন্দেহের ছায়া ফুটে উঠবে জানতাম। তাই উঠল।
আমি হেসে বললাম, যখন খুশি আমাকে ফোন কোরো। যতবার খুশি। আমিও তোমাকে ফোন করব।
জিনিয়া অবাক হল। খুশিও হল।
ও তো আর জানে না, এই ফোন করার ব্যাপারটাও আমার অ্যালিবাই এস্টাবলিশ করার একটা প্ল্যান!
জিনিয়াকে খুন করার জন্যে আমি এমন একটা দিন বেছে নিয়েছিলাম যেদিন ওর কোনও নাচের রিহার্সাল থাকে না। কারণটা খুবই সহজ। আমি খুনের কোনও সাক্ষী চাই না। খুনের যদি কোনও আই উইটনেস থাকে তা হলে টাইম মেশিনের বাবাও আমাকে বাঁচাতে পারবে না।
আসল দিনটা দেখতে-দেখতে এসে গেল।
সকালবেলা আমি জিনিয়ার চোখ এড়িয়ে একটা হাতুড়ি আমাদের মাস্টার বেডরুমে তোশকের নীচে লুকিয়ে রাখলাম।
বিকেল হতে-না-হতেই টাইম মেশিনটাকে বাক্সে ঢুকিয়ে ভালো করে প্যাক করলাম। তারপর নতুন কেনা ডবল জামা-প্যান্ট পরে প্যাক করা মেশিনটা নিয়ে ট্যাক্সি করে রওনা দিলাম।
টনির বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছে ফোনে সুবীরকে ধরলাম। শুনলাম, ও আর টনি খানাপিনার আয়োজন অনেকটা এগিয়ে নিয়েছে।
টনির ফ্ল্যাট তিনতলায়। মেশিনটা সঙ্গে করে লিফটে তিনতলায় উঠলাম। তারপর ফ্ল্যাটের খোলা দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকলাম। আমার সামনেই টনি আর সুবীর।
প্যাক করা বাক্সটা দেখে ওরা খুব অবাক হল। একগাল হেসে বললাম যে, এর ভেতরে একটা হাই পাওয়ার জেনারেটার আছে। আমার লেটেস্ট ইনভেনশান। আজকের পার্টিতে এই যন্ত্রটার আবিষ্কার আমি অ্যানাউন্স করব।
টনির অনুমতি নিয়ে যন্ত্রটা আমি টয়লেটের কাছাকাছি একটা কোণে রাখলাম। বললাম, যন্ত্রটা এখানে থাক। ওটাতে মাঝে-মাঝে জল ঢালার দরকার হয়–ব্যাটারির মতো। সেরকম কেস হলে ওটা নিয়ে টয়লেটে ঢুকে পড়তে আমার সুবিধে হবে।
ওঃ, কত মিথ্যেই না বলতে হচ্ছে! একটা পারফেক্ট মার্ডারের ঝক্কি কি কম! লাস্ট দশদিন ধরে শুধু মনে-মনে হাজার একটা প্ল্যান ভেঁজে চলেছি। চলেছি আর চলেছি। অবশেষে…।
সুবীর হঠাৎ বলল, অ্যাই, তোর সেই টাইম মেশিনের খবর কী? কদ্দূর এগোলি?
পলকে আমার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল। সামনে আয়না থাকলে নিশ্চয়ই দেখতে পেতাম মুখের সব রক্ত উধাও হয়ে গেছে।
কয়েক সেকেন্ড মরিয়া চেষ্টার পর গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোল।
ওটা থিয়োরিতেই বস্ আটকে গেছি। মালটা এখনও তৈরি করতে পারিনি। তোর জেঠুর কাছে আমাকে আবার যেতে হবে।
আমি ঘামতে শুরু করেছিলাম। একে খাপছাড়া বর্ষার গুমোট, তার ওপর ডবল জামা ডবল প্যান্ট। আমার হাঁটতে-চলতেও বেশ অসুবিধে হচ্ছে।
দমবন্ধ করে আমি সময় কাটাতে লাগলাম। কখন সাতটা-আটটা বাজবে তার অপেক্ষা করতে লাগলাম। অন্যান্য গেস্ট তখন এসে পড়বে। বোতলের ছিপি খোলা হবে। পার্টির হইহই তখন তুঙ্গে উঠবে। আমার দিকে ততটা কেউ আর খেয়াল করবে না। সেই সুযোগে আমি…।
সময় গড়িয়ে সন্ধে হল। সন্ধে আরও গম্ভীর হল। অতিথির ভিড়ে টনির ফ্ল্যাট একেবারে হাটবাজার হয়ে উঠল। সোনিও ওর বাবা-মায়ের সঙ্গে এসে পড়েছে। সুবীর আমাকে ওদের কাছে নিয়ে গেল, পরিচয় করিয়ে দিল গ্রেট ইনভেন্টর বলে। আর সোনি আমার নামে ওর বাবা-মায়ের কাছে এত প্রশংসা করতে লাগল যে, আমি লজ্জা পেয়ে গেলাম।
সোনিকে দেখে আমার বারবার মনে হচ্ছিল, যে-পথে আমি পা বাড়িয়েছি সেই পথটাই একমাত্র সঠিক পথ।
এর মধ্যে জিনিয়া আমাকে তিনবার ফোন করেছে। দু-পাঁচমিনিট করে কথা বলেছে। আমিও ওকে পালটা দুবার রিং করেছি। সুবীরের সঙ্গে কথা বলিয়ে দিয়েছি। পার্টির নেশা ধরানো মিউজিক নিশ্চয়ই জিনিয়ার কানে গেছে। ও বুঝেছে, আমি ওকে পার্টির ব্যাপারটা মোটেই ব্লাফ দিইনি।
রাত নটার সময় জিনিয়াকে ওর মোবাইলে আবার ফোন করলাম।
কী করছ?
হঠাৎ জানতে চাইছ?
এমনি জানতে ইচ্ছে হল।
শুয়ে আছি। ম্যাগাজিন পড়ছি।
আমি জানি, জিনিয়া অনেক সময় বিছানায় শুয়ে-শুয়ে নানান পত্রপত্রিকা পড়ে। তারপর সাড়ে দশটা নাগাদ আমরা একসঙ্গে খেতে বসি।
আমি বললাম, তোমার কাছে যেতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু তুমি কোথায় সল্টলেকে নিজের বাড়িতে শুয়ে-শুয়ে আয়েস করছ, আর আমি সন্তোষপুরে তনুময় বোসের ফ্ল্যাটে পার্টি করছি। বিলিভ মি, ভীষণ বোর লাগছে। এক্ষুনি তোমার কাছে চলে যেতে পারলে হত।
