.
দ্বিতীয় মার্ডারের ভিকটিম হিসেবে আমি একটা লোমওয়ালা পোষা কুকুরকে বেছে নিলাম।
প্রথমে পাখি। তারপর কুকুর। তারপর…।
আমাদের বাড়ি থেকে বেশ খানিকটা দূরে একটা তিনতলা বড় বাড়ি আছে। বাড়ির নীচে একটা বড় মাপের ওষুধের দোকান। দোকানটার নাম মেডিকো। বাড়ি এবং দোকানের মালিক একই লোক। ভদ্রলোকের চেহারা বেশ ফুলবাবুর মতো। মাথায় বাবরি চুল, চোখে মেটাল ফ্রেমের চশমা, শৌখিন গোঁফ, কানে আতর মাখানো তুলো গোঁজা, পরনে সবসময় ধবধবে পাজামা-পাঞ্জাবি।
এই বাবুটির একটি শখের কুকুর আছে। গায়ে বড়-বড় সাদা লোম, ঝিরকুটে চেহারা। সবসময়েই এদিক-ওদিক চঞ্চলভাবে ঘুরঘুর করছে আর গন্ধ শুঁকছে।
আমি বাড়িটার খোঁজখবর নেওয়া শুরু করলাম। শুনলাম, রাতে কুকুরটা ছাড়া থাকে। ডবল তালা দেওয়া কোলাপসিবল গেটের ওপিঠের চৌকো চাতালে ওটা সারারাত পায়চারি করে।
প্ল্যান ছকে নিতে কোনও অসুবিধে হল না।
বড়বাজারে গিয়ে একটা ছইঞ্চি ফুলার ছুরি কিনলাম। তারপর দোকান থেকে শিককাবাব কিনে তাতে র্যাটকিলার আর ঘুমের ওষুধ গুঁড়ো করে বেশ ভালো করে মাখিয়ে দিলাম। এবং রাত ঠিক একটার সময়ে টাইম মেশিনের প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে রওনা হলাম।
আমি ভবিষ্যতে পাড়ি দিলাম মাত্র কুড়ি সেকেন্ডের জন্যে। আর সেটি ফ্যাক্টর বাড়ানোর জন্যে হালকা ছদ্মবেশ নিলাম। একটা পাওয়ার ছাড়া রেডিমেড চশমা কিনে এনেছিলাম। সেটা চোখে দিলাম। আর মাথায় পাগড়ির ধাঁচে একটা লাল গামছা জড়িয়ে নিলাম।
ছোট মাপের কুকুরগুলো লোক দেখলেই কেঁউকেঁউ করে চেঁচায়। তাই কুড়ি সেকেন্ডের বেশি সময় আমি কুকুরটার সামনে থাকতে চাইনি।
আমি অন্ধকার চাতালে আচমকা হাজির হতেই কুকুরটা হকচকিয়ে গেল। তার পরই একটা ছোট্ট চিৎকার করল। সঙ্গে সঙ্গে শিককাবাবের টুকরোগুলো সাদা প্রাণীটার সামনে ছড়িয়ে দিলাম। ওটা গন্ধ শুঁকতে মুখ নিচু করল। একটুকরো মাংস কপ করে মুখে তুলে চিবোতে শুরু করল।
আর দেরি করলাম না। আমার মধ্যে একটা কসাই জেগে উঠল। চোখের পলকে কুকুরটার গলায় ছুরি ঢুকিয়ে দিলাম। বাঁ-হাতে ওটার নরম শরীর চেপে ধরলাম মেঝেতে। ছুরিটা টেনে বের করে বসিয়ে দিলাম আবার। আর-একবার।
ছোট্ট একটা আর্তনাদ। রক্ত। সব শেষ।
বাড়ির মধ্যে কোথায় যেন একটা আলো জ্বলে উঠল।
ততক্ষণে আমার কুড়ি সেকেন্ডও শেষ। হুউস।
গ্যারাজে ফিরে দেখলাম আমার মাথায় গামছাটা নেই। কখন যেন খসে পড়ে গেছে। আর আমার জামা-প্যান্টে বেশ খানিকটা রক্তের ছিটে।
আমি উত্তেজনায় কাঁপছিলাম, হাঁপাচ্ছিলাম।
চশমাটা চোখ থেকে খুলে ফেললাম। একতলার গেস্ট রুমে ঢুকে রক্তের ছিটে লাগা জামা প্যান্ট ছেড়ে ফেললাম। তারপর বাথরুমে স্নান করতে ঢুকলাম। কাল চশমা আর জামা-প্যান্ট দুটোর চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করতে হবে। আগেরবারের শার্ট পোড়ানোর মতো বোকামি আর আমি করছি না।
ফেলে আসা গামছাটা নিয়ে আমার একটু দুশ্চিন্তা হয়েছিল। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই চিন্তাটাকে ঝেড়ে ফেলতে পারলাম।
.
দ্বিতীয় খুনটার পর বেশ টের পেলাম আমার ইগো আর কনফিডেন্স, দুটোই অনেক বেড়ে গেছে। আমি যেন এক নতুন আমি। কী সহজেই না আমি টিয়াপাখিটাকে গলা টিপে মেরে ফেলেছি। তুলতুলে কুকুরটার গলায় নৃশংসভাবে ছুরি বসানোর সময়েও আমি কী অদ্ভুতভাবে মাথা ঠান্ডা রেখেছিলাম। তা হলে কি আমার ভেতরে একটা ঠান্ডা খুনি ঘুম থেকে ধীরে-ধীরে জেগে উঠছে?
নতুন করে আবার মনে হল, আমি ভগবানের কাছাকাছি। এবং সেই হাই লেভেল থেকে আমি রোজ জিনিয়াকে লক্ষ করে চললাম। ওর হাঁটা-চলা, কথা বলা, নাচের রিহার্সাল, বাথরুম থেকে স্নান সেরে বেরিয়ে আসার ভঙ্গি–সবই এক অদ্ভুত তৃষ্ণা নিয়ে দেখতে লাগলাম। যেন এই শেষবারের মতো দেখছি।
সত্যিই তো তাই! কদিন পরই তো এগুলো আর দেখতে পাব না!
সোনিকে নিয়েও আমি নতুনভাবে ভাবতে শুরু করলাম। খুব ইচ্ছে হচ্ছিল ওকে টাইম মেশিনটার কথা বলি। এও ইচ্ছে হচ্ছিল, মাঝরাতে মেশিনে চড়ে ওর বেডরুমে হাজির হয়ে ওকে চমকে দিই। তারপর…।
নাঃ, ওসব বাজে চিন্তা থাক কাজের চিন্তা করি। মার্ডার নাম্বার থ্রি। দ্য পারফেক্ট মার্ডার।
তিনদিন চিন্তার পর দিনক্ষণ ঠিক করে ফেললাম। সুবীরকে বললাম, আমি একটা পার্টি থ্রো করতে চাই। কিন্তু আমি যে পার্টি দিচ্ছি সেটা জিনিয়ার কাছে সিক্রেট রাখতে হবে কারণ, ও এসব পছন্দ করে না।
পার্টি দেওয়ার কারণ একটা দেখাতে হয়। তাই সুবীরকে বললাম যে, লাস্ট দু-মাসে আমার ব্যাবসায় যাচ্ছেতাইরকমের মেগা প্রফিট হয়েছে। আর সোনির সঙ্গে পার্টিতে সময় কাটানোর সুযোগ পাওয়াটা একটা দারুণ ব্যাপার।
উত্তরে সুবীর আমাকে চোখ মারল, ভেংচে বলল, হুঁ–দারুণ ব্যাপার।
আমি ওর ঠাট্টাটা গায়ে মাখলাম না।
আমারই প্ল্যানমতো সুবীর আমাদের পাড়া থেকে বহুদূরে সন্তোষপুরে–ওর এক বড়লোক কোলিগের ফ্ল্যাট সাজেস্ট করল। বলল, শেয়ারে রিস্ক নিয়ে শালা প্রচুর টাকা করেছে। প্রায় তিনহাজার স্কোয়ার ফুটের নতুন এই ফ্ল্যাটটা রিসেন্টলি কিনেছে। তুই ওখানে ফুটবল খেলতে পারবি…।
সুবীরের সেই কোলিগের নাম তনুময়–ডাকনাম টনি। তো আমি, সুবীর আর টনি মিলে পার্টির সব ব্যবস্থা করতে লাগলাম। জনাপঁচিশ লোককে নেমন্তন্ন করলাম। তার মধ্যে সোনি অবশ্যই ছিল। ওর বাবা-মা-কেও আসতে বললাম। সুবীর আর টনিও ওদের ক্লোজ সার্কেলের ইমপরট্যান্ট বন্ধুদের নেমন্তন্ন করল।
