বাঁচা যাবে। বলে জিনিয়া সিঁড়ি নামতে শুরু করল।
আমি তখন প্রথম খুনের সাফল্যে ভেতরে-ভেতরে টগবগ করে ফুটছি।
.
সতু পরদিন আমাকে টিয়াপাখি হত্যার করুণ কাহিনি শোনাল। বলল, বাড়ির কোনও জিনিস চুরি যায়নি–শুধু পাখিটাকে গলা টিপে মেরে বাইরের রাস্তায় কে যেন ফেলে দিয়ে গেছে। পাখিটার পাশে একটা বাদামি রঙের নতুন ভোয়ালে পাওয়া গেছে।
খুনি কী করে বাড়িতে ঢুকল সেটা কারও মাথায় ঢুকছে না। আর কেনই-বা বেচারি পাখিটাকে গলা টিপে মারল সেটাও এক রহস্য।
আমি সতুর কাহিনি শুনছিলাম আর মনে-মনে ফুলছিলাম। ইগো বুস্ট বোধহয় একেই বলে! ক্ষমতায় নিজেকে ভগবানের কাছাকাছি মনে হচ্ছিল। আমার প্রথম মার্ডার সাকসেসফুল।
ঠিক করলাম, সিরিজের দ্বিতীয় খুনটা দিন-সাতেক পরে করব। তবে এবারে আর পাখি টাখি নয় বরং চারপেয়ে কিছু। আসলে একটু-একটু করে এগোনো দরকার। তারপর…।
সোনি আমাকে এক রবিবার সন্ধেবেলা ফোন করল।
হাই, ইনভেন্টর! কেমন আছেন?
ভালো। আপনি কেমন আছেন?
ফাইন। এখন কী করছেন?
আমি বেডরুমে বিছানায় বসে খবরের কাগজের সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির পাতাটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়ছিলাম। আমার আবিষ্কারগুলোর কথা যেদিন সবাইকে অফিশিয়ালি জানাব সেদিন এই পৃষ্ঠাতেই আমার ফটোগ্রাফ থাকবে, নিউজ থাকবে। টিভির নানান চ্যানেলে আমার ইন্টারভিউর লাইভ টেলিকাস্ট হবে।
আমি একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলাম। সোনি প্রশ্নটা আবার করতেই ঘোর কাটল। বললাম যে, আমি খবরে কাগজ পড়ছি।
বলুন না, নতুন কী ইনভেন্ট করছেন–মানে, কী নিয়ে এখন রিসার্চ করছেন।
একটা ইনসেক্ট রোবট তৈরি করার চেষ্টা করছি–যেটা সাইজে সাবান-টাবানের মতো হবে, আর টুকিটাকি জিনিস কুড়িয়ে নিয়ে আসতে পারবে। যেমন, বোতলের ছিপি, খুচরো পয়সা, পেনের ক্যাপ বা কাগজের টুকরো– মেঝেতে পড়ে এসব জিনিস উড়ে গেলে বা ছিটকে গেলে মেশিনটা সেটা কুড়িয়ে নিয়ে আসবে। মানে, মেঝেতে জিনিসটা প্রথম যেখানে পড়ছে সেই ইমপ্যাক্ট পয়েন্টে জিনিসটাকে পৌঁছে দেবে।
ওঃ, গ্রেট! খুশিতে ফেটে পড়ল সোনি ও এই রোবটটা দারুণ কাজের জিনিস হবে।
আপনি এখন কী করছেন?
কী আর করব, ফিস্ক্যাল পলিসি নিয়ে স্টাডি করছি। এত বোরিং টপিক ভাবা যায় না।
বোর হয়ে গেলে অন্য কোনও বই পড়ুন–ল্যাপটপ খুলুন, নয়তো টিভি দেখুন।
দুর! ওসব ভাল্লাগে না। আপনাকে আমার হিংসে হয়।
কেন?
আপনার কাজটা কী ইন্টারেস্টিং। আমাকে আপনার ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্ট করে নিন না।
সোনি হালকাভাবে কথাটা বললেও আমার বুকের ভেতরে মেঘ ডেকে উঠল। জিনিয়া।
তখনই মনে পড়ে গেল, পাশের ঘরে–মানে ড্রইং-ডাইনিং-এ-জিনিয়ার রিহার্সাল চলছে। চারটে ছেলেমেয়ে এসেছে। সামনের মাসে কী একটা যেন জয়ন্তী টাইপের আছে। তার জন্যে প্রবল প্র্যাকটিস চলছে।
এসব কথা মুখেও আনবেন না, সোনি। আপনি আমার অ্যাসিস্ট্যান্ট হলে আমার বাড়িতে আগুন জ্বলে যাবে। আপনাকে তো আগেই বলেছি–জিনিয়া-ম্যানিয়া…।
কিছুক্ষণ চুপ করে রইল সোনি। তারপর বেশ সিরিয়াস গলায় বলে উঠল, আগুনে একটু হাত-টাত দিতে শিখুন। আপনি তো আর ছোট নেই!
তারপরই রাখছি বলে ফোন কেটে দিল।
এটা কী কথা বলল সোনি?
আগুনে একটু হাত-টাত দিতে শিখুন। আপনি তো আর ছোট নেই!
আমার মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল। এভাবে কখনও আমি ভাবিনি। সোনি আমার খুব ভালো বন্ধু। আমার সব আবিষ্কারের জেনুইন অ্যাডমায়ারার। ওর সঙ্গে কথা বলে আমি কাজে নতুন উৎসাহ পাই। ও যেভাবে বলে দেখবেন, আপনি একদিন ওয়ার্ল্ড ফেমাস হয়ে যাবেন সেটা সত্যি-সত্যি বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে। তার সঙ্গে সোনি অবশ্য এও বলে, সেদিন আমাকে ভুলে যাবেন না তো?
তাই তো ওকে টাইম মেশিনটার কথা এখনও বলিনি! শুনলে ওর একেবারে তাক লেগে যাবে। দুনিয়ার লোককে বলে বেড়াবে।
হঠাৎ জিনিয়া এসে ঘরে ঢুকল। বোধহয় কংক্রিট এভিডেন্সের খোঁজে।
কী ব্যাপার? আমার পায়ের আওয়াজ পেয়েই ফোন কেটে দিলে?
আমি যেন ঘুম থেকে জেগে উঠলাম। মাথাটা কেমন ফাঁকা লাগছিল। জিনিয়ার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে রইলাম। কোনও উত্তর দিতে পারলাম না।
চমৎকার অভিনয় করতে পারো তো! জিনিয়া নাচের বিভঙ্গে একটা হাতের ভর কোমরের নীচে রাখলঃ আমি ও-ঘরে রিহার্সাল করছি আর তুমিও বেডরুমে বসে রিহার্সাল চালিয়ে যাচ্ছ…?
আমি জিনিয়ার দিকে শূন্য চোখে তাকিয়েই রইলাম। পাশের ঘর থেকে টেপরেকর্ডারের মিউজিক ভেসে আসছিল। আর সেই তালে-তালে আমি তিন নম্বর মার্ডারটার কথা ভেবে চললাম। কবে, কখন, কী কায়দায় ফাইনাল মার্ডারটা এক্সিকিউট করব সেসবের মেজর পয়েন্ট হাতড়ে চললাম।
সোনি ঠিকই বলেছে। এবারে আগুনে সত্যি-সত্যি হাত দেব। আমি আর ছোট নেই।
…আর রিহার্সাল দিয়ে কী হবে? বহুদিন তো রিহার্সাল হল–এবার আসল কাজে নেমে পড়ো। তুমি তো জানো না…।
জিনিয়া কথা বলেই যাচ্ছিল–তবে গলার স্বর তোলেনি। চাপা, হিসহিসে। কারণ, পাশের ঘরে ওর নৃত্য-ছাত্ররা রয়েছে।
আমি উদাসীন সাধুর চোখে ওকে দেখতে লাগলাম। আশ্চর্য! কী সহজেই না ও নিজের শেষ সুনিশ্চিত করছে!
যখন ও ঘর থেকে বেরিয়ে গেল তখন আমার মনে আর কোনও দ্বিধা-দ্বন্দ্ব নেই।
নেক্সট স্টেপ, মার্ডার নাম্বার টু। সেকেন্ড রিহার্সাল। তারপর ফাইনাল স্টেপ, মার্ডার থ্রি। পারফেক্ট মার্ডার। ব্যস। নৃত্যনাট্যের যবনিকা।
