আমার ফোন চলতে লাগল। সোনির আসা-যাওয়াও। আমার আবিষ্কার নিয়ে ওর এথুর দেখলাম শেষ নেই। ওর কাছে আমার গ্যাজেটগুলোর মেকানিজম এক্সপ্লেইন করতে করতে আমি কখনওই ক্লান্ত হতাম না। কোথা থেকে যেন অফুরান এনার্জি আমার শরীর আর মনে ঢুকে পড়ত।
সোনি আমার ল্যাবের সব যন্ত্রপাতিগুলো দেখতে-দেখতে প্রায়ই বলত, ইনভেন্টর, ইউ আর আ জিনিয়াস!
ওর ইনভেন্টর সম্বোধনে আমি খুশি হতাম। জিনিয়াস বলাতেও। কিন্তু জিনিয়াস-এর মধ্যে জিনিয়া অংশটুকু আমার মনে কাটার মতো খচখচ করত।
সোনি আর সুবীরকে আমার সব মেশিন দেখালেও টাইম মেশিনটা দেখাইনি। আমার বড়লোক হওয়ার স্বপ্ন সাকার হয়ে গেলে তারপর হয়তো দেখাব। আর মেশিনটা দেখিয়ে জিনিয়াকে বহু আগেই বলে দিয়েছি, এই উদ্ভট বেআক্কেলে যন্ত্রটা চিরকালের জন্যে অকেজো হয়ে গেছে।
সোনির সঙ্গে আমার বন্ধুত্বের ধরনটা জিনিয়া ঠিক বুঝতে পারেনি। আমার বিজ্ঞান নিয়ে ওর অ্যাপ্যাথি যেমন অবিচল, তেমনই সোনির ব্যাপারটা ও সবসময় দ্রৌপদী সিনড্রোমের আলোকে বিশ্লেষণ করতে লাগল। ওর নৃত্যকলা আর নৃত্যনাট্য চর্চার ফাঁকে-ফাঁকে আমাকে ও হুল ফুটিয়েই চলল।
এক-একসময় ব্যাপারটা আমার কাছে অসহ্য হয়ে উঠত। তখন সেই পুরোনো বাজে চিন্তাটা মাথায় ধাক্কা মারত।
একদিন ঝোঁকের মাথায় ঠিক করেই ফেললাম, একটা খুন করব। এটা হবে আমার মার্ডার সিরিজের প্রথম এক্সপেরিমেন্ট।
আমি বেচারা সতুকে বেছে নিলাম। না, খুন করার জন্যে নয়। মানে, ওর বাড়িকে টার্গেট করলাম।
এর প্রথম কারণ, ওর সোদপুরের বাড়িতে আমি দু-চারবার গেছি। ওর বোনের বিয়েতেও গিয়েছিলাম। সুতরাং বাড়িটার জিয়োগ্রাফিক্যাল ইনফরমেশান আমার জানা।
আর দ্বিতীয় কারণ, ও একটা টিয়াপাখি পোষে। ওই পাখিটাই হবে আমার প্রথম টার্গেট। ভিকটিম নাম্বার ওয়ান। কিন্তু পাখিটাকে খুন করতে পারব তো? উঁহু, কিন্তু কিন্তু করলে চলবে না। আমাকে পারতেই হবে।
আমার ইদানীংকার অ্যাক্টিভিটি সতু আর তারকের চোখে খুব একটা যে ভালো ঠেকছিল না সেটা স্পষ্টই বুঝতে পারছিলাম। দোকানে ঠিকমতো যাই না। মালপত্র পারচেজের ব্যাপারে গাফিলতি। এমনকী পাওনা টাকা তাগাদার ব্যাপারেও আগের মতো উৎসাহ দেখাই না।
কিন্তু আমি ওদের অবাক চোখকে আমল দিইনি।
আমি সতুর সঙ্গে দু-দিন ধরে গল্প জুড়ে দিলাম। দোকানে বসে তেলেভাজা-মুড়ি বা অন্য কিছু আনিয়ে আমি, সতু আর তারক সান্ধ্য টিফিন সারি আর গল্প করি। কখনও কখনও মান রোল-টোলও আনাই।
গল্প করে করে সতুর বাড়ির টোপোলজিটা ভালো করে ঝালিয়ে নিলাম। জেনে নিলাম, টিয়াপাখিটা কখন একা থাকে, রাতে খাঁচাটা কোথায় রাখা হয়, বেড়ালের ভয় আছে কি না, সদর দরজা রাতে কীভাবে বন্ধ করা থাকে, ভেতর থেকে তালা দেওয়া থাকে কিনা ইত্যাদি।
এইরকম খোঁজখবর করে টিয়াপাখির ইনফরমেশান ফাইল কমপ্লিট হওয়ার পর কাজে নামলাম।
একটা ছোট তোয়ালে আর টর্চলাইট সঙ্গে নিয়ে আমি একদিন রাতে দশমিনিটের জন্যে ভবিষ্যতে উধাও হলাম। সোজা গিয়ে হাজির হলাম সতুর বাড়ির উঠোনে।
খাঁচাটা উঁচুতে একটা হুকে ঝুলছিল। তার ওপরে একটা পুরোনো শাড়ি ঢাকা দেওয়া। আমি শাড়িটা সাবধানে সরালাম। তারপর বাঁ-হাতে টর্চ জ্বেলে তোয়ালেসমেত ডানহাতটা খাঁচার ভেতরে ঢোকালাম।
হঠাৎ আলোয় টিয়াপাখিটার চোখ ধাঁধিয়ে গিয়েছিল। আমি ওটাকে তোয়ালেসমেত সাপটে বাইরে বের করলাম।
পাখিটা একবার চাপা চিৎকার করে উঠল।
আমি ভয় পেয়ে গেলাম। কেউ যদি জেগে ওঠে।
একটা টিয়াপাখি খুন করতে এসে যে এত ভয় করতে পারে সেটা আগে বুঝিনি। আমার হাত কাঁপতে লাগল, বুকের ভেতরে ধড়াস ধড়াস শব্দ, কান ভেঁ-ভো করছে। সবকিছু কেমন যেন গুলিয়ে যাচ্ছে। যা করার জলদি করতে হবে। দশমিনিট শেষ হতে এখনও অনেক দেরি।
আমি আর দাঁড়ালাম না। সদর দরজার খিল-ছিটকিনি খুলে চট করে রাস্তায় বেরিয়ে এলাম। তোয়ালের ওপর দিয়েই পাখিটার গলা টিপে ধরলাম। কয়েক সেকেন্ডেই ওটার ছটফটানি শেষ। তোয়ালেসমেত পাখিটা রাস্তায় ফেলে দিলাম।
আমি বেশ অবাক হয়ে গেলাম। আমার মধ্যে এতটা হিংস্রতা লুকিয়ে ছিল আগে বুঝিনি। নিরীহ অবোলা জীবটাকে কী সহজেই না আমি নিকেশ করে দিলাম।
পথের একটা নেড়ি কুকুর আমাকে দেখতে পেয়ে ঘেউঘেউ করে উঠল। সঙ্গে-সঙ্গে আমার দশমিনিটের কোটাও শেষ হল। হুউস।
গ্যারাজের বদলে আমি বাড়ির ছাদে এসে ল্যান্ড করলাম।
সর্বনাশ করেছে! ছাদের দরজা তো বাড়ির ভেতর থেকে বন্ধ করা থাকে। তা ছাড়া বাড়তি সুরক্ষার জন্যে যে-কোলাপসি গেট আছে সেটাতেও তালা।
অগত্যা ছাদেই শুয়ে পড়লাম। সকালে জিনিয়ার সঙ্গে একপ্রস্ত লড়াইয়ের জন্যে মনে-মনে। তৈরি হলাম।
কিন্তু আশ্চর্য! লড়াইটাকে এমনভাবে এড়িয়ে যেতে পারলাম যে, আমার বিশ্বাস হতে চাইছে না।
সকালে ধাক্কাধাক্কি করে বাড়ি মাথায় করতেই জিনিয়া ঘুম-চোখে এসে দরজা খুলল। ওকে বললাম যে, রাতে টাইম মেশিন দিয়ে উলটোপালটা এক্সপেরিমেন্ট করতে গিয়েই আমার এই দুর্দশা। মেশিনটা সবসময় গণ্ডগোল করছে।
ও ঠান্ডা গলায় বলল, মেশিনের আর দোষ কী! যেমন ইনভেন্টর, তেমনই ইনভেনশান।
আমার সামনে অনেক বড় প্ল্যান। তাই খোঁচাটা হজম করে গজগজ করে আপনমনেই মন্তব্য করলাম, যদি আর একমাসের মধ্যে এটাকে ঠিকঠাক করে তৈরি করতে না পারি তা হলে হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে মডেলটাকে ডেসট্রয় করে ফেলব।
