একুশটা। কথাটা বলে মনে হল এ-প্রশ্ন জিনিয়া কখনও আমাকে করেনি। ওর ধারণা, বিজ্ঞান করাটা আমার ভান। আবিষ্কারের কথা বলাটা আমার হিড়ন ডিজায়ার সংক্রান্ত একটা ম্যানিয়া।
সত্যি কথা বলতে কি, সেদিন সোনির সঙ্গে গল্পে আমি একেবারে ডুবে গিয়েছিলাম। মনে হচ্ছিল, আমাদের দুজনের চিন্তাভাবনা একই ফ্রিকোয়েন্সিতে বাঁধা।
সোনির সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেওয়ার জন্যে সুবীরকে বারবার কৃতজ্ঞতা জানালাম। এবং একটা বিচিত্র ঘোরের মধ্যে বাড়ি ফিরে এলাম।
রাতে খাওয়া-দাওয়ার পর মোবাইল ফোন সঙ্গে নিয়ে ছাদে চলে গেলাম। অন্ধকার রাত, বাঁকা উঁদ, এবং তারা আমাকে স্বাগত জানাল। একইসঙ্গে বাতাসের ঝাপটা আমাকে ছুঁয়ে গেল।
সোনিকে ফোন করলাম।
ওর সঙ্গে আলাপ গম্ভীর হওয়ার সেটাই শুরু।
.
মিথ্যে কথা বলব না, সোনির প্রতি আমার একটা টান তৈরি হয়ে যাচ্ছিল। না, আপনারা যা ভাবছেন তা নয়। সোনি যে রূপসি সেটা এই টানের মেজর কারণ নয়। আসল কারণটা হল, আমার কাজকে ও ভীষণ রেসপেক্ট দিচ্ছিল। একজন ইনভেন্টর হিসেবে এরকম আন্তরিক অ্যাপ্রিসিয়েশান আর রেসপেক্ট আমি কখনও পাইনি। আমার নানান আবিষ্কার নিয়ে ওর কত যে কৌতূহল আর প্রশ্ন!
সোনি আমাকে ফোন করত। আমিও করতাম। প্রথম-প্রথম সময়ে–তারপর অসময়ে। প্রায় মাসখানেক ধরে এরকম চলল। ও আমার ল্যাব দেখার জন্যে প্রায় রোজই বলত, কিন্তু আমি নতুন সমস্যা তৈরির ভয়ে ব্যাপারটা এড়িয়ে যেতাম। ফোনেই টেকনোলজি আর ইনভেনশান নিয়ে প্রচুর কথা বলতাম।
এই অতিরিক্ত ফোনের ব্যাপারটা জিনিয়ার নজর এড়ায়নি। কিন্তু ওর সরু চোখে সন্দেহের কাজল যে ধীরে-ধীরে আঁকা হয়ে যাচ্ছে সেটা বুঝতে আমার সময় লেগেছিল।
আমি মোবাইল হাতে কখনও ছাদে গেলে একটু পরে জিনিয়াও টবের গাছগুলো দেখাশোনার ছুতোয় সেখানে চলে আসে। কিংবা আমার ল্যাবে–যেখানে ও বলতে গেলে কখনও পদার্পণ করে না–সেখানেও কোনও-না-কোনও অজুহাতে চলে আসে। কখনও ওর কোলে আদরের মিষ্টি, আবার কখনও-বা একা।
ব্যাপারটা প্রায় গোয়েন্দাগিরির লেভেলে গিয়ে দাঁড়াল। যেন কোনও ডিটেকটিভ মরিয়া হয়ে একটা কংক্রিট এভিডেন্সের খোঁজ করে চলেছে। সেটা হাতে পেলেই…!
বেশ বুঝতে পারছিলাম, জিনিয়ার মধ্যে দ্রৌপদী সিনড্রোম আবার মাথাচাড়া দিয়েছে।
জানি, কমবেশি সন্দেহবাতিকে ভোগা স্ত্রী-ধর্ম, কিন্তু জিনিয়ার বাতিকটা এবার বোধহয় অসুখের দিকে টার্ন নিচ্ছিল। আর তাতে আমার পড়াশোনা, নতুন নতুন চিন্তা, আর যন্ত্রপাতি নিয়ে রোজকার কাজকর্ম ভীষণ ডিসটার্ড হতে লাগল।
সবমিলিয়ে সে এক অসহ্য পরিস্থিতি। আমার গবেষণা আর ইনভেনশান প্রায় লাটে ওঠার জোগাড়।
এরকম একটা অবস্থায় একদিন হঠাৎ মনে হল, সোনিকে বাড়িতে ডেকে জিনিয়ার সঙ্গে আলাপ-টালাপ করিয়ে দিলে কেমন হয়! এতে জিনিয়া হয়তো খানকটা নরমাল হতে পারবে। আর সোনিও আমার ল্যাব দেখার সুযোগ পাবে। ল্যাব দেখে যে ও কী খুশি হবে সেটা কল্পনা করে আমার মনটা ভালো হয়ে গেল।
আর দেরি করলাম না। সোনিকে একদিন বাড়িতে আসতে বললাম।
সোনির ব্যাপারে জিনিয়াকে আগেই সব বলে রেখেছিলাম। মিথ্যে করে বলেছিলাম, ও আমার বন্ধু সুবীরের কাজিন। এবং সুবীরকেও সোনির সঙ্গে আসার জন্যে বারবার করে বলেছিলাম।
তুই যদি আমার সুইসাইড ঠেকাতে চাস তা হলে সোনির সঙ্গে অবশ্যই আসবি। প্লিজ! আর মনে রাখবি সোনি তোর কাজিন।
উত্তরে সুবীর একটা নোংরা ঠাট্টা করে কথা দিয়েছিল, আসবে।
ওরা এল। জিনিয়ার সঙ্গে ওদের আলাপ-পরিচয় হল। জিনিয়া বেশ হাসিমুখে ওদের আপ্যায়ন করল।
খানিকক্ষণ আড্ডার পর ওদের ল্যাব দেখাতে নিয়ে গেলাম। জিনিয়া আসতে চাইছিল না, কিন্তু আমি জোরাজুরি করে ওকেও ডেকে নিলাম। গিনিপিগও ওর পেছন-পেছন গ্যারাজে চলে এল। গিনিপিগ নামে বেড়ালটার পরিচয় করিয়ে দিতেই সোনি আর সুবীরের কী হাসি!
সুবীর বলল, ইনভেনশানের ইতিহাসে গিনিপিগ অমর হয়ে গেল।
সোনি বলল, গিনিপিগ কী কিউট নেম!
জিনিয়া তাড়াতাড়ি বলে উঠল, ওর কথা ছাড়ুন তো! এই মেনিটার আমি নাম দিয়েছি মিষ্টি। তারপর বেড়ালটাকে মিষ্টি মিষ্টি! বলে আদুরে গলায় ডেকে কোলে নেওয়ার জন্যে হাত বাড়াল। সঙ্গে-সঙ্গে হতভাগা বেড়ালটা মেঝে থেকে একলাফে জিনিয়ার কোলে চড়ে বসল। মিঁউ-মিঁউ করতে লাগল।
নেহাত আমার এক্সপেরিমেন্টে প্রায়ই মালটাকে কাজে লাগে তাই। নইলে এটাকে আমি লাথি মেরে বাড়িছাড়া করতাম। যখন তখন বাড়ির যেখানে সেখানে নোংরা করে!
গ্যারাজের এককোণে রয়েছে একসেট টেবিল-চেয়ার আর একটা ল্যাপটপ কম্পিউটার। এ ছাড়া বাকি স্পেসটা একেবারে ছন্নছাড়া। ছুরি, হাতুড়ি, ভ্রু ড্রাইভার, সলডারিং আয়রন আর হাজাররকম যন্ত্রপাতি এখানে সেখানে ছড়ানো। সোনি আমার যন্ত্রগুলো দেখে গৌরী বালিকা হয়ে গেল। ওর সে কী আনন্দ, সে কী খুশি!
ও প্রশ্নে-প্রশ্নে আমাকে পাগল করে তুলল। জিনিয়া সামনে থাকায় আমি মনের উজ্জ্বল আবেগ চেপে বিজ্ঞানীর গাম্ভীর্য বজায় রেখে ছোট-ছোট জবাব দিতে লাগলাম। কোথা দিয়ে সময় গড়িয়ে গেল টেরই পেলাম না।
সুবীর আর সোনি যখন চলে গেল তখন রাত দশটা। সন্ধেটা কী দারুণ কাটল ভেবে আমি তৃপ্তির নেশায় ডুবে গেলাম। অনেক রাতে সোনিকে ফোন করলাম।
