মাতালটা কেঁদে কঁকিয়ে আমার পা জড়িয়ে ধরতে যাচ্ছিল। কিন্তু তার আগেই একমিনিট পূর্ণ হল। ওর ঝাপসা চোখের সামনে আমি ভ্যানিশ হয়ে গেলাম।
দ্বিতীয়বারের চেষ্টায় আমি সাকসেসফুল হলাম। এন্টার বোতাম টেপার পরই দেখলাম, আমি আমার দোকানের ভেতরে ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছি।
অন্ধকার যে থাকবেই সেটা আগে থেকেই আমার মাথায় ছিল। তাই চট করে পকেট থেকে ছোট একটা টর্চলাইট বের করে নিলাম। ক্যাশবাক্সের চাবি সঙ্গে ছিল। বাক্স খুলে ক্যাশের টাকা গুছিয়ে নিতে পনেরো সেকেন্ডের বেশি লাগল না। তারপর একমিনিট পুরো হতেই…হুউস। দোকান থেকে আমি ভ্যানিশ হয়ে গেলাম। পলকে চলে এলাম আমার ল্যাবরেটরিতে। পকেটে হাত ঢুকিয়ে দেখি টাকার গোছা ঠিকমতোই রয়েছে।
এই পরীক্ষাটা সাকসেসফুল হতেই আমার কনফিডেন্স লেভেল বেড়ে গেল। এবং আমি বড়লোক হওয়ার কাজে নামলাম।
প্রথমেই বলে রাখি, ব্যাংক-ট্যাংক-কে আমি আমার টার্গেট লিস্টের মধ্যে রাখিনি। কারণ, ব্যাংকে সব কিছু ভল্ট বা সিন্দুকে নিরাপদে রাখা থাকে। ওগুলোর তালা ভাঙা আমার এলেমের বাইরে। আবার ব্যাংকিং আওয়ার্স-এ যখন নোটের বান্ডিল ছড়ানো-ছেটানো থাকে তখন গাদাগুচ্ছের লোকজনও তার সামনে দারোয়ান হয়ে হাজির থাকে।
সুতরাং, আমার টার্গেট হল ছোটখাটো দোকান। যাদের ক্যাশবাক্স খোলা থাকে এবং হাঁটকালে অল্পবিস্তর টাকা পাওয়া যায়।
আমি জানতাম যে, আমার সামনে অঢেল সময়–কোনও তাড়াহুড়ো নেই। সপ্তাহে দুটো কি তিনটে অপারেশান করলেই চলবে। তা ছাড়া ক্যাশ সরে যাওয়ার ব্যাপারটা নিয়ে দোকানদাররা যাতে থানা-পুলিশ বা হইচই না করে সেজন্যে আমি খুব সুক্ষ্মভাবে কাজ করে চললাম। অর্থাৎ, এক-একটা দোকান থেকে মাত্র দুশো-পাঁচশো কি হাজার টাকা সরাতে লাগলাম। এতে বেশিরভাগ মালিকই ভাববে, ব্যাপারটা তাদের গোনার ভুল।
নির্বিঘ্নে কাজ চালাতে লাগলাম। মাসে আট-দশহাজার টাকা বাড়তি ইনকাম হতে লাগল। আমি জানি, অতি লোভ না করে ধৈর্য ধরে কাজ করে গেলে আরও সুযোগ আসবে–আয়ও অনেক বাড়বে।
সুতরাং, ধৈর্য–শুধু ধৈর্য।
এইসব অপারেশান করার আগে আমাকে যথেষ্ট হোমওয়ার্ক করতে হত। দোকানের লোকেশান, ক্যাশ কোথায় রাখে, কটায় দোকান খোলে, কটায় বন্ধ হয়, দোকানের ভেতরে কেউ রাতে শুয়ে থাকে কিনা, সম্ভব হলে মালিক কোথায় থাকে–এসব তথ্য জোগাড় করে আমাকে রীতিমতো স্টাডি করতে হত।
এইভাবে কাজ করতে করতে আমার সামনে একটা বড় সুযোগ এসে গেল। একটা প্রিমিয়াম কাপড়ের দোকান থেকে সাড়ে এগারো লাখ টাকা সরানোর সুযোগ পেলাম। চোখের সামনে অতগুলো টাকা দেখে আমার নিয়ত খারাপ হয়ে গেল। সূক্ষ্ম ব্যাপার-ট্যাপার সব ভুলে গিয়ে পুরো টাকাটাই লোপাট করে দিলাম। মনে-মনে ঠিক করলাম, যদি এই মিস্টিরিয়াস চুরি নিয়ে খুব হইচই হয় তা হলে আমি থামব। এক-দু-বছর চুপচাপ থাকব। তারপর সব থিতিয়ে গেলে আবার আমি বড়লোক হওয়ার প্রজেক্টে হাত দেব।
তাই করলাম। এবং একটা ছোট্ট গণ্ডগোল হওয়ায় আমাকে থামতেই হল।
টাকাটা পরিমাণে বেশি ছিল বলে আমার গায়ের জামা খুলে নোটগুলো পুঁটলি বাঁধতে হয়েছিল। তখনই কীভাবে যেন আমার পকেটের রুমালটা স্পটে পড়ে যায়। আর জামার একটা বোতাম খসে পড়ে। সেগুলো নিয়ে প্রচুর ঝামেলা হয়। পুলিশ কুকুর লাগানো হয়। খবরের কাগজে লেখালেখি হয়। আমি ভয়ে জামাটা পুড়িয়ে ফেলি।
কিন্তু একটা ঘটনা থেকে আর-একটা ঘটনা যে কীভাবে গড়ায় সেটা কেউ জানে না।
একদিন রাতে যখন শার্টটা পোড়াচ্ছি তখন জিনিয়া সেই পোড়া গন্ধ পেল। ও ছুটে এল ড্রইং-ডাইনিং-এর টয়লেটের কাছে।
এই মাঝরাতে কী করছ? ভুরু কুঁচকে ও জানতে চাইল।
এই…ইয়ে…শার্টটা পোড়াচ্ছি…। আমতা-আমতা করে বললাম।
সে তো দেখতেই পাচ্ছি। কিন্তু পোড়াচ্ছ কেন?
আমার..আমার একটা এক্সপেরিমেন্ট-এ লাগবে। চট করে যা মাথায় এল বলে দিলাম।
এক্সপেরিমেন্ট? নাকি লিপস্টিকের দাগ লেগেছিল?
লিপস্টিক? লিপস্টিক কোথা থেকে আসবে? দু-চোখ কপালে তুললাম আমি।
জিনিয়া ওর গালের পাশ থেকে চুল সরিয়ে বেশ খোঁচা দেওয়া গলায় বলল, কোথা থেকে আবার আসবে? যেখান থেকে আসে–কোনও দুশ্চরিত্র ছেনাল মেয়ের ঠোঁট থেকে…।
এ-মন্তব্য আমি কল্পনাও করিনি। এতটাই অবাক হয়ে গেলাম যে, আমার মুখ দিয়ে কোনও কথা বেরোল না।
জিনিয়া আমাকে এখনও সন্দেহ করে? আশ্চর্য! দ্রৌপদীর ব্যাপারটা তা হলে ও ভোলেনি!
.
বিয়ের বছর-পাঁচেক পর একবার একটা গায়ে-পড়া মেয়ের সঙ্গে আমার সামান্য ইয়ে হয়েছিল। ওর নাম ছিল দ্রৌপদী। ইলেকট্রনিক কম্পোনেন্ট কিনতে প্রায়ই আমার দোকানে আসত। তারপর কথাবার্তায় বুঝতে পারে যে, এ-বিষয়ে আমার অভিজ্ঞতা এবং দক্ষতা আছে। তখন দোকানে ওর আসা-যাওয়া বাড়ে। দরকার পড়লেই আমাকে মোবাইলে ফোন করতে থাকে। শেষ পর্যন্ত ও দরকার ছাড়াই ফোন করা শুরু করে।
এরপর একদিন দ্রৌপদীকে একটা সার্কিটের অপারেশান দেখানোর জন্যে আমি বাড়িতে নিয়ে আসি। জিনিয়ার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিই। জিনিয়া ওকে বন্ধুর মতো মেনে নেয়।
দিন যায়। দ্রৌপদীর সঙ্গে বন্ধুত্বটা আমার বাড়তে থাকে। না, ওটা কখনও প্রেম-টেম-এর দিকে টার্ন নেয়নি। কিন্তু জিনিয়ার কয়েকটা খোঁচা দেওয়া কথায় একদিন বুঝলাম ব্যাপারটা ওর ভালো লাগছে না। ও একটা ইনফিরিয়ারিটি কমপ্লেক্স-এ ভুগছে। তার ওপর বাচ্চাকাচ্চা হয়নি বলে কমপ্লেক্সটা হাইপারবোলিক এক্সপ্যানশান হয়ে বীভৎস চেহারা নিয়েছে।
