আমি ব্যাপারটা বুঝতাম। তাই কখনও পালটা আঘাত না দিয়ে ওকে বোঝাতে চেষ্টা করেছি। কিন্তু তাতে শেষরক্ষা হয়নি।
একদিন জিনিয়া আমাকে আর দ্রৌপদীকে সাউথ সিটি মল থেকে বেরোতে দ্যাখে। ব্যাপারটা একেবারেই নির্দোষ ছিল। দ্রৌপদী একটা হ্যান্ডব্যাগ কেনার জন্যে ওখানে যাচ্ছিল। আর আমার দুটো জি কেনার ছিল। তাই চাঁদনি থেকে দুজনে সাউথ সিটি মল-এ গিয়ে হাজির হয়েছিলাম। কিন্তু এই কাকতালীয় ব্যাপারটা বাড়িতে একটা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে দিল। সে-বিস্ফোরণ নাইন/ইলেভেন এর বিস্ফোরণের চেয়েও মারাত্মক।
আমাকে কদিন তুলোধোনা করার পর দ্রৌপদীকেও টেলিফোনে জঘন্য অপমান করেছিল জিনিয়া। সেসময়ে ওকে দেখে আমার মনে হয়নি ওর মধ্যে কোনও শিক্ষা-দীক্ষা কিংবা রুচি-সভ্যতার ছাপ আছে।
তখন আমার মনে একটা বাজে ইচ্ছে চেপেছিল। কিন্তু নানান অসুবিধের কথা ভেবে ব্যাপারটা মাথা থেকে বের করে দিই। কারণ, তখনও তো আমার টাইম মেশিন তৈরি হয়নি।
এরপর থেকে আমি বরাবর জিনিয়ার অকারণ সন্দেহের আওতায় থেকে গেছি। প্রায় বছরখানেক জিনিয়া নর্মাল ছিল। নাচের রিহার্সাল, নাচের প্রোগ্রাম–এসব নিয়ে ব্যস্ত ছিল। তাতে আমি ভেবেছিলাম, সন্দেহবাতিকটা অবশেষে গেছে। কিন্তু এখন বুঝলাম, ব্যাপারটা সহজে যাওয়ার নয়।
আমি কাতরভাবে বললাম, জিনিয়া, প্লিজ, তুমি ভুল ভাবছ। ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করো। আমি…।
তুমি যদি ক্লিন হও তা হলে আমাকেই শার্টটা পোড়ানোর দায়িত্ব দিতে পারতে। একা একা মাঝরাত্তিরে চুপিচুপি…ছিঃ!
জিনিয়া প্রবল চিৎকার করে কথা বলছিল। এখুনি আশেপাশের বাড়ির লোক না জেগে ওঠে!
জিনি, প্লিজ–আস্তে…আস্তে। পাড়ার লোকজন এবার জেগে উঠবে। প্লিজ। ওর কাছে এগিয়ে গেলাম আমি ও শোনো। তোমাকে সবটা খুলে বলছি। আমার এই নতুন এক্সপেরিমেন্টটা হল, কোনও জিনিসকে পুড়িয়ে ছাই করে সেই ছাই থেকে জিনিসটাকে আবার তৈরি করা। রিকনস্ট্রাকশন। বুঝলে? তারই ফাস্ট স্টেপ হিসেবে এই শার্ট…মানে…।
সে-রাতে ওকে ঠান্ডা করতে আমার প্রাণ বেরিয়ে গিয়েছিল। ওকে বলেছিলাম, যেহেতু ও আমার বিজ্ঞান-টিজ্ঞান করার ব্যাপারটা মোটেই পছন্দ করে না তাই ওকে লুকিয়ে মাঝরাতে শার্টটা পোড়াচ্ছিলাম।
অনেক ইনিয়েবিনিয়ে ঘ্যানঘেনিয়ে ওকে শান্ত করলাম। একেবারে শেষে কান্নাভাঙা গলায় বলেছি, আমার জীবনে শুধু বিজ্ঞান আর তুমি–এ ছাড়া আর কী আছে বলো? রোজ-রোজ দোকানে যেতে আমার একটুও ভালো লাগে না…।
যাই হোক, অনেক কষ্টে জিনিয়ার রোষ থেকে বাঁচলাম। কিন্তু পুরোনো বাজে ইচ্ছেটা আবার মাথাচাড়া দিল। এখন তো আর কোনও প্রবলেম নেই! আমার হাতে টাইম মেশিন আছে।
কিন্তু মনকে বোঝালাম। তোমার হাতে ক্ষমতা থাকলে তাকে সামলে রেখে ব্যবহার করতে হয়। সামান্য টাকাপয়সা হাতিয়ে নেওয়া পর্যন্ত ঠিক আছে–তার চেয়ে বেশি আর এগিয়ো না। নিজের ওপরে কাবু রাখো। ক্ষমতার অপব্যবহার কোরো না। লাগাম–লাগাম! লাগামের কথা কখনও ভুলবে না।
অন্ধকারে বিছানায় শুয়ে-শুয়ে এসব কথা ভেবেছিলাম। মনে-মনে অনেক ভালো-ভালো শপথ নিয়েছিলাম।
কিন্তু সেগুলো যে সাতদিন পরেই চটকে চচ্চড়ি হয়ে যাবে সেটা তখন বুঝতে পারিনি।
কী করেই-বা বুঝব? তখন তো সোনির সঙ্গে আমার আলাপ হয়নি!
আলাপটা করিয়ে দিয়েছিল সুবীর। ফলে এক অর্থে বলা যেতে পারে আমার অপকর্মের জন্যে সুবীরই দায়ী। ওই যে বলেছি, একটা ঘটনা থেকে আর-একটা ঘটনা যে কীভাবে গড়ায় সেটা কেউ জানে না। ফলে আমার মেন্টাল কন্ডিশান, সুবীরের সঙ্গে দেখা হওয়া, ওর অফিসের পার্টিতে আমার যাওয়া, সোনির সঙ্গে পরিচয়, তারপর…।
নাঃ, ব্যাপারটা শুরু থেকেই বলি।
একদিন রাতে খুব মুড অফ অবস্থায় সুবীরের সঙ্গে আড্ডা মারছিলাম।
হঠাৎই ও বলল, তোর কী হয়েছে বল তো?
কিছু হয়নি। নিজেকে জাস্ট ফালতু লাগছে…।
সুবীর সিগারেট খাচ্ছিল। সেটাতে লম্বা টান দিয়ে বলল, বস, বলো তো, কেসটা কী?
আমি মুখ খুলতে না চাইলেও সুবীর ভীষণ চাপাচাপি করতে লাগল।
ওর সঙ্গে বেশিক্ষণ পেরে উঠলাম না। শেষ পর্যন্ত জিনিয়ার কথা একটু-আধটু রেখে-ঢেকে ওকে বললাম।
জানিস, জিনিয়া সবসময় আমাকে সন্দেহ করে। সায়েন্টিস্ট হিসেবে আমাকে কোনও পাত্তাই দেয় না।
সুবীর গম্ভীরভাবে সিগারেটে টান দিয়ে বলল, দেবু, আমি সায়েন্সের কিছু বুঝি না, কিন্তু তোর কেরিয়ার তো আমি জানি! তা ছাড়া সেদিন তোর আর জেঠুর কথাবার্তা শুনেছি। আমার জেঠু ভীষণ স্নব টাইপের বিজ্ঞান নিয়ে সবার সঙ্গে কথা বলতে চায় না। হাইফাই সায়েন্টিস্ট হলে যা হয় আর কী! কিন্তু তোর সঙ্গে জেঠু যেভাবে কথা বলেছে তাতে আমি এটুকু বুঝেছি যে, তোর মধ্যে সামথিং হ্যাজ। আমি বিশ্বাস করি, তুই একদিন দুনিয়াকে চমকে দিবি…।
সুবীরের কথাগুলো আমার কানে সান্ত্বনার মতো শোনাচ্ছিল, কিন্তু একইসঙ্গে এও বুঝতে পারছিলাম, ওর কথাগুলো খুব জেনুইন। ও আমার খুব কাছের বন্ধু।
হঠাৎ আমাকে ছোট্ট একটা ধাক্কা মারল সুবীর। রকের খিস্তি দিয়ে বলল, ওসব ফালতু চিন্তা ছাড় তো! নে একটা সিগারেট ধরা– ও জোর করে একটা সিগারেট গুঁজে দিল আমার হাতে।
আমি এমনিতে স্মোক করি না। হয়তো ছমাসে নমাসে মুড খারাপ হলে একটা সিগারেটে টান দিই। যেমন এখন।
