দ্যাখো, যদি এরকম কোনও মেশিন কখনও তৈরি করা যায় তা হলে তাতে টেলি ট্রান্সপোর্টেশান-এর ব্যাপারটা ঘটবে আলোর গতিতে। বলতে গেলে একপলকে। ধরো, লাইটের ভেলোসিটি সেকেন্ডে প্রায় তিনলক্ষ কিলোমিটার। আর আমাদের পৃথিবী পরিধি হল চল্লিশহাজার কিলোমিটার। মানে, একসেকেন্ডে আলো পৃথিবীকে সাড়ে সাতবার পাক মেরে আসবে। সুতরাং, তুমি সেফলি বলতে পারো, ট্রান্সপোর্টেশান-এর ওই পারটিকুলার মোমেন্টে তোমার মেশিনটা খারাপ হওয়ার চান্স প্র্যাকটিক্যালি জিরো। নাঃ, থিয়োরিটিক্যালি আমি তো কোনও প্রবলেম দেখছি না। মাথা নেড়ে শ্রাগ করলেন বৃদ্ধ বিজ্ঞানী।
ধরুন, কোনও অবজেক্টকে অন্য জায়গায় পাঠালাম। তারপর যদি মেশিন ব্রেকডাউন হয়?
এর আনসার খুব সিম্পল — দু-হাত ঘুরিয়ে নাড়ু পাওয়ার ভঙ্গি করলেন মণিমোহন? জিনিসটা ওখানেই থেকে যাবে–মেশিন ঠিক না হওয়া পর্যন্ত। মেশিন ঠিক হলেই সেটা ফেরত আনা যাবে। আই মিন, থিয়োরিটিক্যালি এটাই লজিক্যাল…।
মেশিন যদি আর কোনওদিন ঠিক না হয়? কেউ যদি হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে ওটাকে চিরকালের জন্যে বিকল করে দেয়? কিংবা ওটার সুইচ অফ করে শাট ডাউন করে দেয়?
সে কথা আর সুবীরের জেঠুকে জিগ্যেস করলাম না। তবে একটা ছোট্ট ভয় আমার মনে দানা বাঁধল।
মণিমোহন জিগ্যেস করলেন, যন্ত্রটা নিয়ে তুমি কদ্দূর এগিয়েছ?
এগোইনি। থিয়োরিটিক্যাল কনসেপ্টগুলো নিয়ে নাড়াচাড়া করছি।
বেশ, বেশ। তোমার ব্যাপারটায় আমার ইন্টারেস্ট রইল। চায়র কাপে শেষ চুমুক দিয়ে একটা শব্দ করে উঠে দাঁড়ালেন: কিছু মাইন্ড কোরো না। একটু প্রেশার আসছে টয়লেটে যেতে হবে।
আমি আর দেরি করলাম না। সুবীরকে মেনি-মেনি থ্যাংকস জানিয়ে বিদায় নিলাম।
বাড়িতে এসে মেশিন নিয়ে প্রবল প্র্যাকটিস শুরু করলাম। জিনিয়া যখন বাড়িতে থাকে তখন সদর দরজা বন্ধ করে নিজে মেশিনের পাটাতনে দাঁড়িয়ে মেশিন চালু করে নিজেকে যেখানে-সেখানে পাঠাতে লাগলাম। কখনও দোতলায় হুস করে হাজির হলাম, কখনও ছাদে গেলাম, কখনও মাস্টার বেডরুমে গেলাম রান্নাঘর, বাথরুম কিছুই বাদ রাখলাম না।
প্রতিক্ষেত্রেই আমি একমিনিট বা দু-মিনিট টাইম সেট করে রওনা হয়েছিলাম। ফলে একবার ছাড়া প্রত্যেকবার গ্যারাজের ভেতরেই ফিরে এলাম। শুধু লোকেশান সেট করার সময় জিয়োগ্রাফিক্যাল ইনফরমেশান আর ফিগারেটিভ ডেটায় কিছু অ্যাক্সিমেশান থাকায় একেবারে সঠিক জায়গায় হাজির হচ্ছিলাম না। একটু-আধটু এদিক-সেদিক হয়ে যাচ্ছিল। আর ফিউচারে অন্য লোকেশানে পৌঁছে যদি আমি সেখানে হাঁটাহাঁটি করে পজিশান শিফ্ট করি তা হলে টাইম মেশিনের প্ল্যাটফর্মে ফিরে না এসে দু-দশহাত দূরে অন্য জায়গায় ফিরে আসছিলাম। একবার তো গ্যারাজের বাইরে করিডরে এসে ল্যান্ড করলাম!
তখনই ঠিক করলাম, ফিউচারে অন্য লোকেশানে পৌঁছে আমি পজিশান সম্পর্কে সবসময় অ্যালার্ট থাকব।
সাতদিনের অক্লান্ত চেষ্টায় টাইম মেশিনের টার্গেট ডেস্টিনেশানের পজিশান বা কো-অর্ডিনেট এরারকে মিনিমাইজ করে ফেললাম। তারপর স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। এইবার সুপার ইলেকট্রনিক্স এর পরীক্ষায় নামা যায়।
পরীক্ষাটা খুবই সামান্য, তবে আমার দ্রুত বড়লোক হওয়ার প্রজেক্টের এটাই প্রথম মেজর স্টেপ।
এক শনিবার জরুরি কাজ আছে বলে সতু আর তারককে দোকানে রেখে আমি বেরিয়ে গেলাম। ওদের বললাম, বিক্রিবাটার টাকা ঠিকমতো গুনে-গেঁথে ওরা যেন ক্যাশবাক্সেই রেখে দেয়। তারপর দোকান বন্ধ করে চাবির গোছা যেন আমার বাড়িতে বউদি-র কাছে পৌঁছে দেয়। আমি পরে যা ব্যবস্থা করার করব।
ব্যাপারটা মালিকের নির্দোষ নির্দেশ বলে মনে হলেও আসলে তা নয়। ওদের চাকরিজীবনে ওরা কখনও এরকম নির্দেশ আগে পায়নি। আমি জানতাম, ওরা আমার কথামতো কাজ করবে। তাই গভীর রাতে নিশ্চিন্তে আমার টাইম মেশিনে চড়ে বসলাম। তারপর ডায়াল, কিবোর্ড, নব– হুউস।
প্রথম চেষ্টায় আমি হাজির হলাম আমার দোকানের বাইরের রাস্তায়। আমি টাইম সেট করেছিলাম একমিনিট। যদি দোকানের ভেতরে ঠিকমতো হাজির হতে পারতাম তা হলে ক্যাশবাক্স খুলে ক্যাশ নিয়ে আমার গ্যারাজে ফিরে আসার পক্ষে সময়টা যথেষ্ট। কিন্তু নির্জন রাস্তায় হঠাৎ গজিয়ে উঠে একমিনিট ধরে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকার পক্ষে সময়টা যথেষ্টর চেয়েও একশোগুণ বেশি। তা ছাড়া এতে বিপদও অনেক।
তো সেই বিপদে পড়লাম।
আমাকে ম্যাডান স্ট্রিটের মাঝখানে হঠাৎই শূন্য থেকে গজিয়ে উঠতে দেখে ফুটপাতে আধশোয়া অবস্থায় পড়ে থাকা একটা মাতাল আনন্দে চেঁচিয়ে লাফিয়ে উঠল। আমি কিছু করে ওঠার আগেই ছুটে এসে আমার পায়ের কাছে হাঁটুগেড়ে বসে পড়ল। হাউমাউ করে বলতে লাগল, এতদিনে দর্শন দিলে, ভোলেবাবা! কিছু মালকড়ি দাও, প্রভু। তোমার নির্দেশমতো রোজ মাল-টাল খাই। ওই মাল টানার জন্যেই কিছু মালপানি দাও, বস্। জয় ভোলেনাথ!
আমার পজিশান চেঞ্জ করলে যদি টাইম মেশিনে আবার ফিরে যেতে না পারি! শুধু এই ভয়ে আমি মাতালটার কাছ থেকে ছুটে পালাতে পারছিলাম না।
শুনশান রাস্তায় সে এক কেলেঙ্কারি! ফুটপাতে এখানে-ওখানে আর যারা সব শুয়ে আছে। তারা না জেগে ওঠে।
এদিক-ওদিক তাকালাম।
দূরে চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউ দিয়ে একটা গাড়ি ছুটে গেল। রাস্তার লাইটগুলো নীরব সাক্ষী হয়ে জেগে বসে আছে। মাঝে-মাঝে কুকুরের চিৎকার শোনা যাচ্ছে। রাত দুটোয় রাস্তাঘাটের অবস্থা যেমন হয়।
