ওদের দোষ যতই থাকুক, একটা গুণ বেশ তারিফ করার মতো। ওরা দুজনেই খুব অনেস্ট। দরকার হলে চেয়ে নেবে, কিন্তু লুকিয়ে ক্যাশবাক্সে হাত ঢোকাবে না।
পরের টেস্টটার জন্যে আমি সুপার ইলেকট্রনিক্স-কে বেছে নিলাম।
কিন্তু তার আগে থিয়োরিটা শেষবারের মতো খতিয়ে দেখার জন্যে আমি একজন সরল পণ্ডিত মানুষের খোঁজ করে চললাম। কারণ, একটা আউটডোর এক্সপেরিমেন্ট শুরু করার আগে ব্যাপারটা সম্পর্কে কিছু এক্সপার্ট কমেন্ট দরকার। আর সেই এক্সপার্টকে হতে হবে সরল–যাতে আমার কথায় তিনি সন্দেহ না করে বসেন। এবং পণ্ডিত–যাতে তার গুরুত্বপূর্ণ মতামতে কোনও ভেজাল না থাকে।
অনেক খোঁজখবর করে আমার পাড়ার বন্ধু সুবীরের এক জ্যাঠামশাইয়ের সঙ্গে আমার যোগাযোগ হল। ভদ্রলোকের নাম মণিমোহন সরখেল। ফিজিক্সের রিটায়ার্ড প্রফেসর। প্রেসিডেন্সির ছাত্র ছিলেন। পরে সেখানেই অধ্যাপক। তারপর আমেরিকায় চলে যান। বহুবছর ক্যালটেক-এ ছিলেন, আর তিনবছর স্ট্যানফোর্ড রিসার্চ ইন্সটিটিউটে। মানে, সিভি যাকে বলে ব্যাপক ঘ্যাম।
একদিন বিকেলে সুবীর আমাকে প্রফেসর সরখেলের কাছে নিয়ে গেল। পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলল, জেঠু আমার ছোটবেলাকার বন্ধু, দেবু–দেবদত্ত রায় চৌধুরী। ও খুব নামকরা ইয়ে… মাঝপথে আটকে গিয়ে সুবীর আমার দিকে তাকাল : কী বলে যেন তুই নিজের পরিচয় দিস?
আমি লজ্জা পেয়ে গিয়ে চোখ নামিয়ে বললাম, ওই ইনভেন্টর…মানে, বন্ধুবান্ধবের আড্ডায় মজা করে বলি আর কী!
প্রফেসর সরখেল ভুরু কুঁচকে কপালে ভাঁজ ফেলে গোরিলার ঢঙে আমার দিকে তাকালেন: ইনভেন্টর? অ। তা কী নিয়ে পড়াশোনা করেছ?
ব্যস, শুরু হল তার হামানছেচা জেরা। একেবারে সি. বি. আই.-এর বাবা। আমি কোত্থেকে পাশ করেছি। কতদূর লেখাপড়া করেছি। কী নিয়ে গবেষণা করেছি। কোন-কোন জার্নালে রিসার্চ পেপার পাবলিশ করেছি। ফরেনে গেছি কিনা। এবং, সবশেষে, এ পর্যন্ত আমি কী কী ইনভেন্ট করেছি।
ওঁর প্রশ্নের ধাক্কায় আমি ক্রমশ কুঁকড়ে যাচ্ছিলাম। নির্বিঘ্নে আমার সব প্রশ্নের উত্তর এই মানুষটার কাছ থেকে বের করতে পারব তো? নাকি এই বৃদ্ধই আমার পেট থেকে সব মতলব টেনে বের করে চারদিকে ছড়িয়ে ছত্রখান করে দেবেন?
আমি বৃদ্ধ বাঘা বিজ্ঞানীটিকে হাঁ করে দেখছিলাম।
ফরসা মোটাসোটা গাবলু চেহারা। মাথায় টাক, তাকে ঘিরে বাউন্ডারি ওয়ালের ঢঙে ধবধবে সাদা চুল। গালে খোঁচা-খোঁচা সাদা দাড়ি। চোখে হাই পাওয়ারের চশমা। চশমার কাচের ওপরে সাদা ভুরুর ঝালর উঁকি মারছে। দু-দিকের গাল বার্ধক্যের ভারে ঝুলে পড়েছে। গায়ে সাদা ফতুয়া, পায়ে পাজামা।
প্রফেসর সরখেল একটা মোটা বাঁধানো বইয়ের পৃষ্ঠা খুলে হাতে ধরেছিলেন। আমাকে জেরা করার কাজ শেষ হতে বইটা শব্দ করে সামনের টেবিলে রাখলেন। একটা হুম শব্দ করে চেয়ারে হেলান দিয়ে সরাসরি আমার দিকে তাকালেন : বলো, কী বলবে?
আমি কয়েকবার ঢোক গিলে বললাম, লাস্ট দু-চারবছর ধরে আমি একটা টাইম মেশিন ইনভেন্ট করার কথা ভাবছি। আমার কনসেপ্টগুলো…।
ধীরে-ধীরে আমার আইডিয়ার নিরীহ অংশগুলো ওঁকে বললাম।
সুবীর একফাঁকে অন্দরে চলে গিয়েছিল। বোধহয় চা-বিস্কুটের বন্দোবস্ত করতে। কারণ, ও ফিরে আসার একটু পরেই একটি অল্পবয়েসি মেয়ে আমাদের তিনজনের জন্যে চা ইত্যাদি টেবিলে সাজিয়ে দিয়ে গেল।
আমার সব কথা মন দিয়ে শোনার পর প্রফেসর সরখেল কিছুক্ষণ চোখ বুজে রইলেন। তারপর চোখ খুলে চশমাটা নাকের ওপরে ঠিক করে বসালেন। চায়ের কাপে শব্দ করে চুমুক দিয়ে বললেন, তোমার ব্যাপারটা আসলে টেলি-ট্রান্সপোর্টেশান অফ ম্যাটার। মানে, আই মিন, কোনও একটা জিনিসকে এক জায়গা থেকে আর-এক জায়গায় পাঠানো। মানে, ম্যাটারকে যেভাবেই হোক এনার্জিতে কনভার্ট করতে হবে। তারপর সেই এনার্জিকে লাইটের ভেলোসিটিতে আর-এক জায়গায় পাঠাতে হবে। সেখানে পৌঁছোনোর পর সেই এনার্জিকে, আই মিন, রিকনভার্ট করতে হবে ম্যাটারে। আর পুরো ট্রান্সপোর্টেশানটাই তোমার হবে গিয়ে হাইপারস্পেস দিয়ে…।
সুবীর অবাক হয়ে জিগ্যেস করল, জিনিসটা ভ্যানিশ হয়ে গিয়ে আবার ফিরে আসবে?
মণিমোহন গম্ভীরভাবে ভাইপোর দিকে তাকিয়ে বললেন, হ্যাঁ, আসবে। তোমার তাতে আপত্তি থাকতেই পারে। তুমি তো আর্টস-এর ছাত্র ছিলে–
সুবীর আর্টস-এর ছাত্র ছিল ঠিকই তবে এখন সিটিজেন ফিনান্স নামে একটা ঘ্যাম কোম্পানির একজিকিউটিভ ডায়রেক্টর। কিন্তু হলে কী হবে, বিজ্ঞানী জেঠুর কাছে ওর ওজন তিলতুল্য। তাই ও কাচুমাচু হয়ে মুখে কুলুপ আঁটার শপথ নিল বলে মনে হল।
প্রফেসর সরখেল আমার দিকে তাকিয়ে বলে চললেন, মানে, আইনস্টাইনের ইকুয়েশান। ম্যাটার টু এনার্জি, এনার্জি টু ম্যাটার। রিভারসিল প্রসেস। সবটাই হবে ফোর্থ ডায়মেনশান-আই মিন, ওই যে বললামহাইপারস্পেস দিয়ে…। শুধু কনভারশনটা হবে একটা লোকেশানের। আর রিকনভারশন হবে অন্য আর-একটা লোকেশানে। তবে লোকেশানের ডেটাগুলো ঠিকঠাক হওয়া দরকার…।
যদি ম্যাটার পাঠানোর সময় মেশিনটা হঠাৎ খারাপ হয়ে যায়? তার জন্যে কোনও প্রোটেকশান সাজেস্ট করতে পারেন? আমি এবারে আমার সমস্যার মধ্যে ঢুকে পড়লাম। সুপার ইলেকট্রনিক্স নিয়ে পরীক্ষায় নামার আগে নিরাপত্তার ব্যাপারগুলো খতিয়ে দেখা দরকার।
