মেশিনটা আবিষ্কার করার পর ওটা নিয়ে ছোটখাটো কয়েকটা টেস্ট করলাম। যখন দেখলাম, ব্যাপারটা মোটামুটি ঠিকঠাক আছে, তখন আনন্দে এক অদ্ভুত চিৎকার করে লাফিয়ে উঠেছিলাম। তাতে গ্যারাজের নিচু সিলিং-এ মাথা ঠুকে গিয়েছিল। কিন্তু বিশ্বাস করুন, এই প্রথম আনন্দের ঝলকটা ছিল নিখাদ আবিষ্কারের উল্লাস–জেনুইন বিজ্ঞানীদের যেমনটা হয়ে থাকে। তখন কিন্তু টাকা, বড়লোক–এসব ব্যাপার মাথায় ছিল না।
প্রায় দু-দিন এই মহান আবিষ্কারের ব্যাপারটা চেপে রাখলাম। বন্ধুবান্ধব, রিলেটিভ কাউকে বললাম না। এমনকী জিনিয়ার কাছেও ভাঙলাম না। কিন্তু দু-দিন পেরোনো পর এই খুশির খবরটা চেপে রাখতে গিয়ে আমার দম প্রায় বন্ধ হওয়ার জোগাড়।
শেষ পর্যন্ত, তিনদিনের দিন, সাড়ে আটটা নাগাদ ব্রেকফাস্ট সেরে চা খেতে-খেতে জিনিয়াকে বললাম, একটা দারুণ খবর দেব–।
ও টিভিতে কী একটা নাচের প্রোগ্রাম দেখছিল। তেরছাচোখে আমার দিকে একপলক তাকিয়ে বলল, কী খবর? এইমাত্র নিউজপেপারে পড়লে?
না, না। আমার একটা নতুন ইনভেনশান। একটা ইউনিক মেশিন। টাইম মেশিন। সারা পৃথিবী একেবারে চমকে যাবে। আমাদের…।
চা-টা একবার সিপ করে দ্যাখো তো, চিনি ঠিক আছে কি না। খবর পড়ার ঢঙে নিপ্রাণ গলায় জিনিয়া বলল।
না, ওর কোনও দোষ নেই। আমাদের বিয়ের পর দশবছর ধরে আমার নানান আবিষ্কারের এক্সক্লসিভ খবর শুনে-শুনে ও ক্লান্ত।
প্রথম-প্রথম ও এইসব খবর শুনে খুশি হত। তারপর একসময় লক্ষ করলাম, ও বিরক্ত হয়। ওর রিঅ্যাকশানগুলো কেমন তিরিক্ষে, ব্যঙ্গের খোঁচায় খচিত। আর ইদানীং ওর প্রতিক্রিয়া নির্লিপ্ত, তিব্বতী ইয়াকের মতো।
আমি ওকে বললাম যে, চায়ে চিনি ঠিক আছে এবং আমি একটা অভিনব আবিষ্কার করেছি।
ও আবেগহীন গলায় বলল যে, আবিষ্কারটা অবশ্যই অভিনব, সবাইকে চমকে দেওয়ার মতো, এবং নোবেল প্রাইজ পাওয়ার সম্ভাবনায় প্রেগন্যান্ট। এটার জন্যে ও আমাকে হার্দিক অভিনন্দন জানাচ্ছে।
কথাগুলো বলেই ও চায়ের কাপ হাতে টেবিল ছেড়ে উঠে গেল। একটা সোফায় গা এলিয়ে টিভির নাচে এবং চায়ে মনোযোগ দিল।
আমি ওর মুখের দিকে একবার তাকালাম। তারপর সামনের খোলা বারান্দায় চোখ রাখলাম। সকালের রোদ, বাইরের গাছপালার সবুজ, নীলচে আকাশ–সব সত্যি। আমার টাইমে মেশিনও। কিন্তু জিনিয়া শেষের সত্যিটা অ্যাকসেপ্ট করতে পারছে না। অবশ্য সব তাবড়-বড় বিজ্ঞানীর কপালেই এইরকম হেনস্থা জুটেছে।
এমনিতে জিনিয়া খুব ভালো মেয়ে। দেখতে ভালো। ফিগার চমৎকার। সর্বাঙ্গে প্রচুর হাতছানি। তা ছাড়া গুণও আছে। একসময় নাচের চর্চা করত। এখন প্রায়ই ছোট-ছোট ছেলেমেয়েদের নিয়ে নৃত্যনাট্যের রিহার্সাল করায়। রবীন্দ্র-জয়ন্তী আর নজরুল-জয়ন্তীতে সেগুলো প্রদর্শিত হয়। প্রশংসাও পায় প্রচুর। স্বীকার করতে লজ্জা নেই, এসব ব্যাপারে ও সত্যিই মাহির।
শুধু ইনভেন্টর স্বামীর ব্যাপারে ও একটু বেশি টায়ার্ড।
নিজের পাগলামোয় টায়ার্ড আমিও ছিলাম। কারণ, গত পনেরোবছরে বেশ কয়েকটা ছোটখাটো আবিষ্কার করতে পারলেও আমার অসমাপ্ত কিংবা ব্যর্থ আবিষ্কারের তালিকা ক্রমাগত দীর্ঘ হয়েছে। কিন্তু তিনদিন আগে টাইম মেশিনটা আবিষ্কারের পর আমি আবার টগবগিয়ে উঠেছি। এটাই পৃথিবীর প্রথম সফল বাস্তবের টাইম মেশিন। এটা কল্পবিজ্ঞান নয়–বিজ্ঞান। এর আবিষ্কারকের নাম দেবদত্ত রায়চৌধুরী। আমি।
এবারে মেশিনটার কথা একটু বলা যাক।
ব্যাপারটা ব্যাপক কমপ্লিকেটেড হলেও আমি সিপ্ল টাম্স-এ বোঝানোর চেষ্টা করছি।
মেশিনটার মাপ একটা ছোট টিভির মতো। তার সঙ্গে লাগানো একটা একফুট বাই একফুট মেটাল প্ল্যাটফর্ম। টাইম ট্রাভেল করতে হলে এই প্ল্যাটফর্মের ওপরে দাঁড়াতে হয়, বা কোনও জিনিস রাখতে হয়। তারপর ডায়াল সেট করে, কিবোর্ডে একগাদা বোম ঠুকে, নব ঘুরিয়ে, এন্টার বাটুন টিপে মেশিনটাকে অ্যাক্টিভেট করতে হয়।
মেটাল প্ল্যাটফর্মটা ভাঁজ করা যায়। ওটা সমেত মেশিনটার ওজন সাড়ে চার কেজি। সুন্দর নীল রঙের একটা চৌকোনা ক্যাবিনেটের মধ্যে ঢোকানো। বাইরে থেকে শুধু কয়েকটা ডায়াল, এলসিডি প্যানেল, একটা কিবোর্ড, আর চারটে নব ছাড়া কিছুই দেখা যায় না। একটা রিচার্জে ব্যাটারি মেশিনটার শক্তি জোগায়। মোবাইল ফোনের মতো। চারঘণ্টা চার্জ দিয়ে নিলে মেশিনটা প্রায় ঘণ্টাদুয়েক অ্যাক্টিভ থাকে।
টাইম স্কেলে আমার মেশিনটা সরাসরি পেছনদিকে যেতে পারে না। মানে, অতীতে যাওয়ার ব্যাপারে ওটার কিছু রেট্রিশান আছে। যেমন, ধরা যাক, আমি পাস্ট-এ যেতে চাই। যদি আমি পাঁচবছর আগের একটা সময়ে কোনও পারটিকুলার লোকেশানে হাজির হতে চাই, তা হলে সেই সময়ে আমি সেখানে ঠিক যে-অবস্থায় ছিলাম সেই অবস্থায় তৈরি হয়ে মেশিনটা অপারেট করলে তবেই মেশিনটা আমাকে সেখানে নিয়ে যেতে পারবে। মানে, আমার সবকিছুই সেই পাঁচবছর আগেকার মতো হুবহু এক হতে হবে–এমনকী পোশাক-আশাকও। যাকে বলে জেরক্স কপি। তা না হলে মেশিনটা এলসিডি প্যানেলে মিসম্যাচ ফেলিয়োর এরার মেসেজ দেখিয়ে দেবে।
সোজা কথায়, একমাত্র বয়েসটাকে মেশিনটা মিসম্যাচ এরার বলে ধরে না। বাকিগুলোকে ধরে।
এই সমস্যাটির কারণ হল স্পেস-টাইম। অর্থাৎ, অতীতকে কখনও কেউ পালটাতে পারে না। একই বস্তু একই সময়ে দু-জায়গায় থাকতে পারে না।
