ধীরে-ধীরে সন্ধের ছায়া নেমে এল মাঠে।
ছোটকা বর্মনকে যন্ত্রপাতি গুছিয়ে নিয়ে জিপে উঠতে বলল। তারপর জমায়েত মানুষজনকে লক্ষ করে চেঁচিয়ে বলল, আপনারা যে যার বাড়ি চলে যান। এ-লাফানি সহজে থামবে না। নিজে থেকেই যেমন আচমকা শুরু হয়েছিল, দেখবেন, নিজে থেকেই হঠাৎ থেমে যাবে।
তা বলে সারা রাত ধরে বলটা একা-একা অমন লাফাবে? ইন্দ্ৰকান্ত জিগ্যেস করল।
তাতে তোর কী! ওর দিকে তাকিয়ে হেসে বলল ছোটকা।
ওরা যখন দল বেঁধে বেরিয়ে আসছিল তখন মাঠের চারপাশে নানা জায়গায় লাগানো ল্যাম্পপোস্টের বাতিগুলো জ্বলে উঠেছে।
সেই মলিন আলোয় ফুটবলটা দিব্যি একমনে লাফিয়ে চলেছে।
.
ঝালাপালা আর ঝামেলাকে নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে ছোটকাকে ভীষণ আনমনা দেখাচ্ছিল। বোধহয় বল লাফানোর রহস্যের উত্তর খুঁজে বেড়াচ্ছিল।
ঝামেলা হঠাৎই ছোটকার দিকে মুখ তুলে বলল, বল উল্লউল্ল–উল্ল–।
উল্লম্ফন। ছোটকা ওকে ধরিয়ে দিল।
হ্যাঁ, বল উল্লম্ফনের পশ্চাতে প্রেতাত্মার কোনওরূপ ইয়ে নাই তো?
এ-প্রশ্নে ছোটকা হাসল না। বরং বেশ সিরিয়াস মুখে বলল, এইভাবে লাফানোর একটাই মাত্র কারণ থাকতে পারে…।
কী কারণ? ঝালাপালা একসঙ্গে প্রশ্ন করল।
কোথাও থেকে এনার্জি এসে ঢুকে পড়ছে বলটার ভেতরে। তোরা তো জানিস, একটা বল লাফাতে শুরু করলে ক্রমশ তার লাফের মাপ কমতে থাকে। এইভাবে লাফানোর উচ্চতা কমে যাওয়ার অনেক কারণ আছে? যেমন, ঘর্ষণ, মাধ্যাকর্ষণ, বাতাসের বাধা। ফলে, শুরুতে যে-শক্তি নিয়ে বলটা লাফাতে শুরু করে, এইভাবে শক্তি খরচের জন্যে ক্রমেই তার লাফানোর শক্তি কমতে থাকে। যদি বাইরে থেকে কোনওভাবে ক্ষয়ে যাওয়া শক্তিটুকু সাপ্লাই করা যায়, তা হলে বলটার লাফের উচ্চতা আর একটুও বদলাবে না। শুধু ওটার কাইনেটিক এনার্জি পালটে যাবে পোটেনশিয়াল এনার্জিতে, আবার পোটেনশিয়াল এনার্জি পালটে যাবে কাইনেটিক এনার্জিতে। এইভাবে গতিশক্তি আর স্থিতিশক্তির রূপবদল হয়। তবে লাফানোর সময় যে-কোনও পজিশনে বলটার গতিশক্তি আর স্থিতিশক্তির যোগফল একই থাকে।
বলটাকে ক্ষয়ে যাওয়া এনার্জির জোগান দিচ্ছে কে? চন্দ্রকান্ত প্রশ্ন করল।
ছোটকা খানিকটা আনমনাভাবে বলল, ফানেল দিয়ে যেমন তেল ঢালে, সেইরকমভাবে বলটার মধ্যেও কেউ এনার্জি ঢেলে দিচ্ছে। যেহেতু ব্যাপারটা আমরা দেখতে পাচ্ছি না, সেহেতু মনে হচ্ছে, ফোর্থ ডায়মেনশনের কোনও একটা বিন্দু থেকে আমাদের থ্রি ডায়মেনশনের দুনিয়ায় একটা এনার্জি টানেল তৈরি হয়ে গেছে। ঠিক আইনস্টাইন-রোজেন ব্রিজের মতো ব্ল্যাক হোল আর হোয়াইট হোলকে যে-ব্রিজ জুড়ে দেয়। যাক গে, বাদ দে-ওসব বিজ্ঞানের কচকচি তোরা বুঝবি না। শুধু এটুকু বুঝে নে, সেই অদৃশ্য এনার্জি টানেলের একমাথায় আছে একটা উৎস, আর এই মাথায় রয়েছে এই ফুটবলটা। বলটা ফোর্থ ডায়মেনশন থেকে এনার্জি সাপ্লাই পেয়ে চলেছে। তবে টানেলের এ-প্রান্তে বলটা যে কী করে হঠাৎ জুড়ে গেল তা বলতে পারব না। যখন টানেলটা আবার বল থেকে সরে যাবে, তখন এনার্জি সাপ্লাই বন্ধ হয়ে যাবে–তা হলেই বলটা স্বাভাবিক নিয়ম মেনে থামবে। তার আগে নয়।
ওঃ ব্বাবা! একটা বল লাফানোর পেছনে এত কাণ্ড! ইন্দ্ৰকান্ত অবাক হয়ে বলল।
ছোটকা গালে হাত বোলাতে-বোলাতে বলল, সত্যি-সত্যি এত কাণ্ড আছে কি না জানি না। আমি শুধু সায়েন্সের দিক থেকে একটা ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করলাম।
ঠিক তখনই ঝামেলা মিহি গলায় চেঁচিয়ে উঠল, এইমাত্র একটি চারের সাহায্যে ব্রায়ান লারার সেঞ্চুরি পূর্ণ হইল। ফুজিয়ামা! ফুজিয়ামা!
টাইম-কিলার (নভেলেট)
লেখার শুরুতেই শ্রীহার্বার্ট জর্জ ওয়েল্স-কে আমার প্রণাম জানাই। যাকে আপনারা সবাই এইচ. জি. ওয়েল্স নামে বেশি চেনেন। ডি. এসসি., ডি. লিট. ইত্যাদি ডিগ্রিওয়ালা মস্ত পণ্ডিত ছিলেন তিনি। কল্পবিজ্ঞানের গল্প লিখে প্রচুর নাম-টাম করেছিলেন। আজও ওঁর লেখার জবাব নেই।
কিন্তু আমি ওঁকে গুরু বলে মানি ওঁর দ্য টাইম মেশিন গল্পটার জন্যে। কারণ, ওই গল্পের আইডিয়া থেকেই এনার্জি পেয়ে আমি শুধু একটা টাইম মেশিন তৈরি করার জন্যে তেরোবছর ধরে লড়ে গেছি।
শেষ পর্যন্ত সেটা তৈরি করতে পেরেছি। তবে ওয়েল্স-এর মেশিনের চেয়ে আমার মেশিনটা একটু অন্যরকম। আর যে কাজে আমার মেশিনটাকে লাগাতে চলেছি সেটাও ওয়েল্স-এর টাইম ট্রাভেলার-এর চেয়ে অন্যরকম।
মানে, আমার টাইম মেশিনটা কাজে লাগিয়ে আমি একটা খুন করতে চলেছি। নিখুঁত খুন। পারফেক্ট মার্ডার। তবে সে-কথায় পরে আসছি।
এই দুনিয়ায় টাকার দরকার কার নেই! আমারও আছে। আর সেই দরকারটা চাগিয়ে উঠেছে। গত পনেরোবছর ধরে হাজারোরকমের যন্ত্রপাতি তৈরি করার নেশায় পাগলের মতো খরচ করার জন্যে। তাই আমার টাইম মেশিন তৈরির পেছনে একনম্বর মোটিভেশান ছিল টাকা। দু-নম্বরে যশ, খ্যাতি এটসেট্রা। তারপর…।
মোটের ওপর আর যা-ই থাক, মার্ডারটা আমার প্ল্যানে ছিল না। সেটা আচমকা মাথায় ঢুকে পড়েছিল। তা ছাড়া যখন আপনি জানেন যে, খুন করলেও পুলিশ আপনার চুলের ডগাও স্পর্শ করতে পারবে না–আপনি সৎ-সাচ্চা নাগরিকের মতো বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াতে পারবেন, তখন তো সাহস বাড়বেই!
