সব কথা শোনার পর বুকে হাত ঠুকে ঝামেলা বলল, একটি লক্ষ্যমান ফুটবলকে ভয় পাওয়ার যে কী কারণ থাকিতে পারে তাহা কিছু বুঝতে পারছি না। রবিঠাকুর বলে গেছেন, বিপদে মোরে রক্ষা করো এ নহে মোর প্রার্থনা। তোমরা কি তাহা জানো না?
ইন্দ্ৰকান্ত ঝামেলার রণং দেহি ভাবসাব দেখে বলল, তুমি কি জানো, কে যেন বলে গেছেন, হাতি-ঘোড়া গেল তল/মশা বলে কত জল?
আমাকে ব্যঙ্গ করিয়া কোনও প্রফিট হইবে না। ঝামেলা গম্ভীরভাবে মন্তব্য করল এবং হাঁটা দিল লম্ফমান ফুটবলের দিকে।
হাঁটতে হাঁটতেই পিছন ফিরে ও চন্দ্র-ইন্দ্রকে বলল, দেশের কাজে যাচ্ছি। দয়া করে যেন ঝামেলা, স্ট্যাচু বলে আমাকে বাধা দিয়ো না। তোমাদিগকে ভরসা করা বড়ই কঠিন।
এই কথা বলে এঁচোড়ে পাকা রোবট রওনা দিল বলের দিকে, আর ঝালাপালা ওকে অনুসরণ করল। এই অদ্ভুত বিপদে কী করবে ওরা কিছুতেই ভেবে পাচ্ছিল না। এই সময় ছোটকা থাকলে খুব ভালো হত! ওরা মনে-মনে ভাবল।
ভিড় ঠেলে চক্রব্যুহের ভেতরে ঢোকার সময় লোকজনের নানান মন্তব্য শোনা যাচ্ছিল।
মনে হচ্ছে কোনও ফুটবল প্লেয়ারের প্রেতাত্মা ফুটবলটার ওপরে ভর করেছে।
বলটার ভেতরে কোনও স্প্রিং ফিট করা নেই তো!
বলটার ভেতরে মনে হয় কোনও বাচ্চা ক্যাঙারু ঢুকে পড়েছে।
ওরা তিনজনে মাঝের গোল কঁকা জায়গাটায় পৌঁছে থমকে দাঁড়াল। ঝামেলা লক্ষ করল, নানান মানুষজনের ভিড়ে বেশ কয়েকটা রোবটও দাঁড়িয়ে আছে। তারাও হাঁ করে লাফানো বলের কাণ্ডকারখানা দেখছে।
হঠাৎই ষোলো-সতেরো বছরের একটা মোটাসোটা ছেলে ছুটে গেল বলটার দিকে। বলটা তখন নীচে নেমে আসছিল। বলটা ড্রপ খাওয়ামাত্রই ছেলেটা একটা চিৎকার করে বলটাকে জাপটে ধরল।
আর সঙ্গে-সঙ্গেই অদ্ভুত একটা কাণ্ড হল।
ছেলেটাকে সঙ্গে নিয়েই বলটা লাফিয়ে উঠল শূন্যে। আগের মতোই তিনতলার সমান উচ্চতায় পৌঁছে গেল অনায়াসে।
মাঠের কৌতূহলী দর্শর্করা প্রচণ্ড চিৎকার করে উঠল। সেই চিৎকার ছাপিয়ে কে যেন ডেকে বলল, পল্টু, ভয় পাস না। বলটাকে চেপে ধরে রাখ।
পল্টু আকাশ থেকে এই পরামর্শ শুনতে পেল কি না বোঝা গেল না। তবে স্পষ্ট দেখা গেল, ওর মুখ ভয়ে সাদা হয়ে গেছে। আর ও প্রাণপণে বলটাকে আঁকড়ে ধরে আছে।
এইবার বলটার নেমে আসার পালা।
পল্টুসমেত বলটা নেমে আসতে লাগল।
অত উঁচু থেকে মাটিতে এসে পড়লে পল্টু যে আর আস্ত থাকবে না সেটা সকলেই বুঝতে পারল। এমনকী ঝামেলাও। তাই বাচ্চা রোবটটা কখন যেন এগিয়ে গেছে লাফিয়ে ওঠা বলটার ঠিক নীচে। তারপর বল এবং পল্টু যখন নেমে এল তখন পঞ্চাশ কেজি ওজনের ঝামেলা ওর ইস্পাতের লিকলিকে হাত পেতে ক্যাচ লোফার মতো লুফে নিল পল্টুকে।
চারপাশ থেকে এমন চিৎকারের রোল উঠল যেন শচীন তেন্ডুলকর শোয়েব আখতারের ছবলে ছটা ছক্কা হাঁকিয়েছে।
ঝামেলা পল্টুকে বাঁচাল বটে কিন্তু বলটাকে ধরে রাখতে পারল না। বল ওর হাতের বাঁধন ছাড়িয়ে আবার উঠে গেছে শুন্যে।
ছ-সাতজন ছেলে ছুটে গেল পল্টুর কাছে। ও তখন মাটিতে অসাড় হয়ে শুয়ে আছে–বোধহয় এত ভয় আর টেনশনে অজ্ঞান হয়ে গেছে।
ঝামেলা শুন্যে লাফানো বলটাকে কয়েকপলক দেখল। তারপর হেলেদুলে ফিরে এল ঝালা পালার কাছে। ন্যাড়ামাথা এপাশ-ওপাশ নেড়ে মিহি গলায় বলল, কেস একেবারে নটবর। কিছু করার নেই। ছোটকাবাবুকে দ্রুত অফিসে ফোন করিয়া দাও। আমি লক্ষ্যমান বলের নিকটে হার মানিলাম।
ঝালাপালাও বুঝল গতিক সুবিধের নয়। তাই ওরা ঝামেলাকে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে বলে ছুটল ছোটকাকে ফোন করতে।
.
একটা পেল্লায় মাপের জিপে চড়ে ছোটকা যখন অকুস্থলে এসে হাজির হল তখন বিকেলের আলো মরে এসেছে। কিন্তু লক্ষ্যমান ফুটবল তার গুরুত্বপূর্ণ কাজে এতটুকুও ক্ষান্তি দেয়নি।
ছোটকার সঙ্গে নানান যন্ত্রপাতি নিয়ে এসেছে একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট। কালো রোগা চেহারার ছোটখাটো মানুষ। ছোটকা তাকে বর্মন বলে ডাকছিল।
চন্দ্র আর ইন্দ্র টেলিফোনেই গোটা ব্যাপারটা ছোটকাকে জানিয়েছিল। ছোটকা সব শুনে ওদের সাবধান করে দিয়ে বলেছে, তোরা সবাই চুপচাপ একপাশে দাঁড়িয়ে থাক। বলটাকে মোটেই ডিসটার্ব করবি না। আমি অফিস থেকে লোকজন আর যন্ত্রপাতি নিয়ে যাচ্ছি। ব্যাপারটা খুব পিকিউলিয়ার ফেনোমেনন।
ছোটকাকে লটবহর নিয়ে এগিয়ে আসতে দেখে ভিড় করে থাকা লোকজন গলা ফাটিয়ে হইহই করে উঠল।
ঝামেলা ফুজিয়ামা! ফুজিয়ামা! বলে হেলেদুলে লাফাতে লাগল। ওর কপালের লাল-নীল হলুদ বাতিগুলো দপদপ করে জ্বলতে-নিভতে লাগল। খুব খুশি হলে অথবা উত্তেজিত হলে ঝামেলা
এইরকম করে। জাপানের আগ্নেয়গিরির সঙ্গে ওর উল্লাসের যে কী সম্পর্ক তা ও-ই জানে!
ছোটকার নানান সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ চলতে লাগল। সকলে একরাশ উৎকণ্ঠা নিয়ে ছোটকার কার্যকলাপ খুঁটিয়ে লক্ষ করতে লাগল।
ছোটকা একটা যন্ত্র চোখে দিয়ে বলটাকে ভালো করে দেখল। সবুজ রঙের কী একটা রশ্মি ফেলল বলটার গায়ে। তারপর সেটাকে লক্ষ করে খুদে-খুদে এক ঝক মিসাইলের মতো কী যেন ছুঁড়ে দিল।
কিন্তু কোনওটাতেই কোনও ফল হল না। বলটা একরোখাভাবে লাফাতেই লাগল।
ঝামেলা ভেবেছিল ছোটকা বলটাকে থামাতে পারবে। কিন্তু ছোটকাকে ব্যর্থ হতে দেখে সে ফেসফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ফেলতে লাগল আর বিড়বিড় করে বলতে লাগল, আমার বুকফাটা দীর্ঘশ্বাসগুলি যথেষ্ট সুদীর্ঘ হইতেছে না।
