ঝামেলার ভাষায় আজকে মানে এখনই। আর কম্বলের জুতো মানে যে কেস জুতো সেটা ঝালাপালা স্পষ্ট বুঝতে পারল। ওরা ঝামেলাকে অনেক করে বোঝাল যে, ফুটবলের মতো বাজে খেলা আর হয় না। ফুটবল খেলায় বিপদের অনেক ঝুঁকি। যে-কোনও সময় হাত-পা ভাঙতে পারে।
এতসব ভয়ংকর কথা শোনার পরেও ঝামেলার সেই এক গোঁ : পেলে যদি নির্ভয়ে খেলিস্যান্তি তা হলে আমিও পারন্তি। অর্থাৎ, পেলে যখন নির্ভয়ে খেলতে পেরেছে তখন আমিও পারব।।
ঠিক আছে, ছোটকা অফিস থেকে বাড়ি ফিরুক, তখন একটা ব্যবস্থা করব। ইন্দ্ৰকান্ত ঝামেলার ন্যাড়া মাথায় হাত বুলিয়ে বোঝাতে চেষ্টা করল।
চন্দ্রকান্ত ওকে ক্যাডবেরি খাওয়াবে বলে আশ্বাস দিল।
অনেক বাবা-বাছা করার পর ওরা ঝামেলাকে রাজি করিয়ে রাস্তায় বেরোল। ওদের সঙ্গে হেলেদুলে যেতে-যেতে ঝামেলা বারবারই জিগ্যেস করতে লাগল, ছোটকাবাবু কব আয়েগা? তাঁহাকে অফিসে টেলিফোন করিয়া দাও।
.
যখন ওরা ফুটবল খেলার মাঠের প্রায় কাছাকাছি এসে গেছে তখন ঝামেলা হঠাৎ একটা লাফ দিয়ে উঠল। ওর কপালের লাল-নীল-হলুদ বাতিগুলো জ্বলতে নিভতে শুরু করল। ও হাততালি দেওয়ার চেষ্টা করে মিহি গলায় উল্লাসের সুরে বলতে লাগল, ফুজিয়ামা! ফুজিয়ামা! ব্রায়ান লারা একটি ফোর আঘাত করিয়াছে!
ঝালাপালা বুঝতে পারল লারা এইমাত্র একটা বাউন্ডারি মেরেছেন। আজ ওয়েস্ট ইন্ডিজ আর অস্ট্রেলিয়ার ওয়ানডে খেলা। টিভিতে তারই লাইভ টেলিকাস্ট চলছে। আশপাশের কোনও বাড়ির টিভির ধারাবিবরণী নিশ্চয়ই ঝামেলার কানে এসে পৌঁছেছে। ওর কান এমনভাবে তৈরি যে, বহুদূরের শব্দ ও স্পষ্ট শুনতে পায়, আর আলট্রাসনিক শব্দও ওর কান এড়িয়ে যেতে পারে না। এ ছাড়া ওর চোখ দুটো পুঞ্জাক্ষি–দেখে মনে হয় কাচের তৈরি টেনিসবল–ঠেলে বেরিয়ে এসেছে বাইরে। অনেক জটিল লেন্স জুড়ে তৈরি এই চোখ দিয়ে ও প্রায় একমাইল দূর পর্যন্ত দেখতে পায়।
ঝামেলার এই অদ্ভুত ক্ষমতাকে দু-ভাই হিংসে করে। একদিন ইন্দ্ৰকান্ত ছোটকাকে বলেছিল ওদের কান আর চোখ ঝামেলার মতো পাওয়ারফুল করে দিতে। তাতে ছোটকা হেসে গড়িয়ে পড়েছিল, বলেছিল, তা কখনও হয়! তোরা হলি মানুষ, আর ঝামেলা হল মেশিন। তা ছাড়া তোদের ওইরকম কান আর চোখ করে দিলে সুবিধের চেয়ে অসুবিধেই বেশি হবে।
মাঠে পৌঁছে ঝালাপালা দেখল খেলা শুরু হয়ে গেছে। ওদের বন্ধুর দল একটা ফুটবল নিয়ে দিব্যি পেটাপিটি করছে আর নিজেদের মধ্যে হইচই চিৎকার করছে।
মাঠের একপাশে সুন্দর ফুলের গাছ। তার গা ঘেঁষে সরু পিচের রাস্তা। অনেকে সেখানে পায়চারি করছে। কেউ-কেউ বসে আছে ঘাসের ওপরে। বেশ কয়েকজন তাদের পোষা রোবট সঙ্গে করে বেড়াতে বেরিয়েছে।
চন্দ্রকান্ত ঝামেলাকে বলল, তুমি অন্য রোবটদের সঙ্গে খেলা করো। দেখো, আবার যেন কোনও ঝামেলা পাকিয়ো না।
ঝামেলা তৎক্ষণাৎ হেলেদুলে হাঁটতে শুরু করল। সামনেই একটা লম্বা রোবট ঝুঁকে পড়ে ফুলের গন্ধ শোঁকার চেষ্টা করছিল। সে সোজা হয়ে দাঁড়াতেই ঝামেলা অবাক হয়ে তার মাথার দিকে তাকিয়ে রইল। কী লম্বা রোবটরে বাবা! মনে-মনে ভাবল ঝামেলা।
কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর ঝামেলা লম্বা রোবটটাকে প্রশ্ন করল, তুই এত লং কেন রে?
রোবটটা তার ধাতব ঠোঁট চওড়া করে বোধহয় হাসতে চেষ্টা করল। তারপর বলল, আমার বাড়ি শিলং, তাই। কিন্তু তুই এরকম ন্যাড়া কেন?
ঝামেলাকে কেউ ন্যাড়া বললে ও ভীষণ চটে যায়। ও খেপে গিয়ে কী একটা জবাব দিতে যাচ্ছিল। কিন্তু ঠিক তখনই ফুটবল খেলার মাঠের দিক থেকে একটা প্রচণ্ড হইহই শোনা গেল।
ঝামেলার সব ব্যাপারেই কৌতূহল বড় বেশি। সুতরাং ঝগড়া মুলতুবি রেখে ও হেলেদুলে রওনা হল ঝালাপালার দলবলের দিকে।
মাঠে তখন একটা বিচিত্র কাণ্ড শুরু হয়ে গেছে। ঝালাপালাদের ফুটবলটা মাঠে একনাগাড়ে ড্রপ খেয়ে চলেছে।
ফুটবল যে শূন্যে উঠলে আবার মাটিতে পড়বে, ড্রপ খেয়ে আবার শূন্যে লাফিয়ে উঠবে, এর মধ্যে আশ্চর্য হওয়ার মতো কিছু নেই। আর এটাই স্বাভাবিক যে, ফুটবলটার লাফ ক্রমশ কমে আসবে এবং একসময় তার লাফালাফি একেবারে থেমে যাবে।
কিন্তু ঝালাপালাদের ফুটবলটার বেলায় সেরকম কিছু হচ্ছে না। ফুটবলটা ঠিক যতটা উঁচু থেকে নীচে এসে পড়ছে, ড্রপ খেয়ে আবার ঠিক ততটাই শূন্যে লাফিয়ে উঠছে।
ঝামেলা অবাক হয়ে এই অদ্ভুত কাণ্ড দেখতে লাগল।
লাফানো বলটাকে ঘিরে তখন ভিড় জমে গেছে। খেলতে আসা ছেলের দল তো বটেই, এ ছাড়া রয়েছে নানানবয়েসি লোকজন–সবাই একজোট হয়ে হাঁ করে বলটার কীর্তিকলাপ দেখছে। কয়েকটি মেয়ে নিজেদের মধ্যে হাত নেড়ে উত্তেজিতভাবে কীসব বলাবলি করছে। বোধহয় বলটাকে নিয়েই আলোচনা করছে।
চারপাশের চিৎকার, গুঞ্জন, হাসাহাসি মিলেমিশে এক জটপাকানো কোলাহল তৈরি হয়েছে বলটাকে ঘিরে।
ওই ডামাডোলের মধ্যে চন্দ্রকান্ত আর ইন্দ্ৰকান্ত কী করে যে ঝামেলাকে খুঁজে বের করল কে জানে! ওদের ডাক শুনে ফিরে তাকিয়েই ঝামেলা দ্যাখে দু-ভাই ওর ঠিক পিছনেই দাঁড়িয়ে।
ওদের কাছেই পুরো ব্যাপারটা শুনল ঝামেলা।
দিব্যি নাকি ফুটবল খেলা চলছিল। হঠাৎই ওদের এক বন্ধু বুবু জোরে একটা স্কাই শট মারে। তাতে বলটা প্রায় তিনতলার সমান শূন্যে উঠে যায়। বলটা মাটিতে নেমে আসার সময় ওদের আর একজন বন্ধু অপু ছুটে যায় বলটাকে শট মারতে। কিন্তু কীভাবে যেন ওর শট ফসকে যায়। তখন সবাই অবাক হয়ে দ্যাখে যে, বলটা আবার তিনতলার সমান উঁচুতে উঠে গেছে। এই ব্যাপার দেখে সবাই বেশ ভয় পেয়ে যায়। কে একজন বলে যে, বছর পনেরো আগে একজন ফুটবল খেলোয়াড় মাঠের ধারের একটা বকুলগাছে গলায় দড়ি দিয়েছিল। এ নাকি তারই প্রেতাত্মার কারসাজি। এ কথা শুনে সবাই সরে যায়, আর বলটা আপনমনে তিনতলার সমান লাফাতে থাকে। এখন কী করা হবে কেউ ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না।
