মিসেস ব্যানার্জির মুখের দিকে তাকিয়ে কল্যাণের মায়া হচ্ছিল। কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেছে সেই ব্যক্তিত্ব। তার বদলে বসে আছে এক ভাঙাচোরা রমণী। অচিন্ত্য আর অজন্তাকে পাশ কাটিয়ে অনমিতা আর নয়নকে নিয়ে বাঁচার স্বপ্ন দেখছিলেন মিসেস ব্যানার্জি। কল্যাণ ওঁকে হয়তো পাশ কাটাতে দেননি, কিন্তু স্বপ্নটা কি পুরোপুরি কেড়ে নিতে পেরেছেন? অনমিতা আর নয়ন যে থেকে গেছে। ওদের চারটে চোখ দিয়ে এখন এই বিষণ্ণ দুটি চোখ স্বপ্ন দেখার চেষ্টা করবে।
কল্যাণের বুকের ভেতরটা কেমন চিনচিন করছিল। চাপা অথচ তীব্র যন্ত্রণা। তেতো হাসলেন কল্যাণ। দ্বিতীয়বার মরতে কে আর ভয় পায়! ঘরের মেঝেতে তৃতীয় ব্যক্তি হয়ে বসে থাকা বানরটার দিকে চোখ গেল তার। লোমশ প্রাণীটার কুতকুতে চোখে কি সামান্য হাসির ছোঁয়া?
ক্লান্ত পায়ে উঠে দাঁড়িয়ে বানরটার কাছে গেলেন কল্যাণ। ঝুঁকে পড়ে তুলে নিলেন খেলনাটা। এক অদ্ভুত জ্বালায় ওটাকে আচ্ছা করে কষে দম দিলেন। তারপর বাঁধন আলগা করতেই ঠনঠন শব্দে করতাল বাজতে শুরু করল। বাজতেই থাকল।
পায়ে পায়ে চায়ের টেবিলের কাছে চলে এলেন কল্যাণ। নিথর হয়ে বসে থাকা মিসেস ব্যানার্জির সামনে টেবিলের কাচের ওপরে বসিয়ে দিলেন খেলনাটাকে। তারপর ছোট্ট করে বললেন, আসি–
মিসেস ব্যানার্জি কোনও উত্তর দিলেন না।
কল্যাণ রবারের পা ফেলে বেরিয়ে এলেন ফ্ল্যাটের বাইরে। করতালের শব্দ তখনও শোনা যাচ্ছে।
অন্ধকার নির্জন রাস্তায় করতালের শব্দটা কল্যাণকে একঘেয়েভাবে অনুসরণ করে চলল।
ঝামেলা ও লম্ফমান ফুটবল
খেলতে-খেলতেই ঘটে গিয়েছিল আশ্চর্য ব্যাপারটা। ৬ কলকাতা শহরে তখন দি-ফাটা ঝা-ঝাঁ গরম। মাঠে-মাঠে ফুটবল, আর ঘরে-ঘরে টিভি তে ক্রিকেট। খেলা নিয়ে তুমুল হইচই নানা জায়গায়, সকলের মুখে শুধু খেলার কথা। এমনকী বাচ্চা রোবট ঝামেলাও খেলা নিয়ে মেতে উঠেছে।
একদিন সন্ধেবেলা বাড়িতে বসে ভারত-পাকিস্তানের একটা ওয়ানডে ম্যাচ দেখছিল যমজ দু-ভাই চন্দ্রকান্ত আর ইন্দ্রকান্ত–যাদের ডাকনাম ঝালাপালা। ওদের সবসময়ের সাথী তিনফুট হাইটের পিকিউলিয়ার রোবট ঝামেলা দু-ভাইয়ের গা ঘেঁষে বসে টিভির দিকে তাকিয়ে ছিল। শচীন তখন একটা ঝোড়ো ইনিংস খেলছিল। কোনও বলকে তোয়াক্কা না করে শুধু চৌকা আর ছক্কা লাগাচ্ছিল। ঝালাপালা বারবার খুশিতে চিৎকার করে উঠে হাততালি দিচ্ছিল।
ঠিক তখনই ঝামেলা ওর মিহি গলায় মন্তব্য করল, এই সাহসী ছেলেটা তোমাদিগের তুলনায় যারপরনাই উন্নত প্রাণী। বিবর্তনের পথে তিরবেগে ছুটে অস্বাভাবিক অগ্রসর হইয়াছে। আর কিঞ্চিৎ সুযোগ পেলে আমার ন্যায় সুপারম্যানকেও হয়তো বা স্পর্শ করিয়া ফেলিবে।
ঝামেলার এই এক দোষ। যখন-তখন জ্ঞান দিতে শুরু করে। ওর ধারণা, বানর থেকে এসেছে মানুষ আর মানুষ থেকে বিবর্তন হয়ে এসেছে রোবট। তাই ও নিজে হল সুপারম্যান। সেইজন্যই ও মাঝে-মাঝে ঝালাপালাকে শুনিয়ে দেয়, কোন আদ্যিকালে তোমরা পড়ে আছ ভাবিলে বড় সরো হয়। সরো মানে যে দুঃখ সেই তথ্যটি অবগত আছ তো!
ঝামেলার ভাষা ভারী অদ্ভুত। কথ্য ভাষা, সাধু ভাষা, ইংরেজি, হিন্দি, সংস্কৃত মিশিয়ে জগাখিচুড়ি পাকিয়ে ভুলভাল যা খুশি বলে যায়। আবার উচ্চারণ কঠিন হলে আটকেও যায়।
ঝামেলার জ্ঞানগর্ভ মন্তব্য শুনে ইন্দ্ৰকান্ত বলল, অতই যখন নিজেকে বড় ভাবো, তা হলে শচীনের বদলে ইন্ডিয়া টিমে ঢুকে পড়লেই পারো!
ঝামেলা এ-কথায় বিন্দুমাত্রও বিচলিত না হয়ে বলল, আমি ব্যাট ধরিলে ক্রিকেট হিস্টিরিয়া নূতন করিয়া লিখতে হবে।
ও বোধহয় হিস্ট্রি বলতে চাইছে। ইন্দ্ৰকান্ত বলল।
ঝামেলা রিনরিনে গলায় হেসে উঠল, তারপর চন্দ্রকে লক্ষ্য করে বলল, তোমাদিগকে লইয়া যে কী করি! এই সহজ ওয়ার্ডটিরও মানে জানো না!
ইন্দ্ৰ বিরক্ত হয়ে বলল, ঝামেলা স্ট্যাচু!
সঙ্গে-সঙ্গে ঝামেলা যেন পাথরের স্ট্যাচু হয়ে গেল।
ফোঁস করে শ্বাস ফেলে ইন্দ্র বলল, এ চিজকে ট্রেনিং দেওয়া কি সহজ কথা!
ঝামেলাকে জটিল প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি করেছে ঝালাপালার ছোটকা প্রসেনজিৎ চৌধুরী। ইলেকট্রনিক্সবিদ্যায় ছোটকার জুড়ি নেই। ছোটকা চাকরি করে ভারত সরকারের গোপন তদন্ত বিভাগে। নানান কাজে ওকে সবসময়েই দেশে-বিদেশে উড়ে বেড়াতে হয়। এখন, কিছুদিন হল, কলকাতার অফিসে আছে।
ঝালা-পালা ছোটবেলায় ভীষণ কান্নাকাটি চেঁচামেচি করত, সকলের কান একেবারে ঝালাপালা করে দিত। তাই ছোটকা আদর করে ওদের নাম দিয়েছে ঝালাপালা। আর উপহার দিয়েছে এই বাচ্চা রোবট ঝামেলা। ছোটকা বলেছে, তোরা রোবটটাকে ভালো করে ট্রেনিং দে। কিন্তু ট্রেনিং ওরা দেবে কী, উলটে ঝামেলার কাছেই ওদের ট্রেনিং নেওয়ার মতো অবস্থা দাঁড়িয়েছে।
গত কয়েকদিনেই ঝামেলা কী করে যেন খেলা-পাগল হয়ে উঠেছে। ঝালাপালা যখন বিকেলে মাঠে খেলতে বেরোয় তখন ঝামেলা বরাবরই হেলেদুলে ওদের সঙ্গ নেয়। কিন্তু কোনওদিনও খেলব বলে বায়না ধরেনি। আজ বিকেলে দু-ভাই যখন কেডস জুতো পরে ফুটবল খেলার জন্য তৈরি হচ্ছে, তখনই ঝামেলার আবদার শুরু হল।
আমিও ফুটবল ক্রীড়ায় অংশগ্রহণ করব। ছোটকাকে বলে আজকেই আমাকে তোমাদিগের ন্যায় কম্বলের জুতা কিনিয়া দাও।
