খেলনাটা মেঝেতে বসিয়ে রেখে আবার মিসেস ব্যানার্জির কাছে এসে বসে পড়লেন কল্যাণ। বললেন, মিসেস ব্যানার্জি, আপনাকে আমি একজন থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বারের গল্প শোনাতে এসেছি। মিসেস ব্যানার্জির বিমূঢ় চোখের দিকে কয়েক পলক তাকিয়ে থেকে কল্যাণ আবার বললেন, আপনার স্বামীর গল্প। অনমিতা আর নয়নের বাবার গল্প। না কি ওরা আবার ড্যাডি বলে ডাকত অচিন্ত্যকে?
মিসেস ব্যানার্জি তখনও ঠিক বুঝতে পারেননি কল্যাণ কী বলতে চাইছেন।
এমনসময় শীলা ট্রে-তে করে চা-বিস্কুট নিয়ে ঘরে এসে ঢুকল। কাচের টেবিলের ওপরে। কাপ-প্লেট সাজিয়ে দিয়ে ট্রে নিয়ে চলে গেল।
বানরটা তখনও করতাল বাজাচ্ছে, তবে তার বাজনার জোর কমে এসেছে। সেদিকে একপলক তাকিয়েই চোখ ফিরিয়ে নিলেন কল্যাণ। স্ফটিকের বলটা ওপর থেকে নেমে আসছে। এখনও সময় আছে লুফে নেওয়ার। কিন্তু…।
চা খান।
মিসেস ব্যানার্জির অনুরোধে চায়ের কাপ তুলে নিলেন কল্যাণ। কাপে পরপর কয়েকটা চুমুক দিয়ে সরাসরি তাকালেন ওঁর চোখের দিকে।
তারপর এক ঝটকায় মনস্থির করে নিয়ে হাত সরিয়ে নিলেন। স্ফটিকের বলটা মেঝেতে আছড়ে পড়ল। ঝনঝন শব্দে টুকরো হয়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে গেল চারদিকে। কল্যাণ সেই শব্দ স্পষ্ট শুনতে পেলেন।
কল্যাণ দুর্ঘটনা থেকে শুরু করে সব বলে গেলেন একে একে, কিছুই বাদ দিলেন না। অজন্তার মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকে আজকের এই মুহূর্ত পর্যন্ত সময়টা তার কাছে যেন একটা অন্ধকার টানেল। এই টানেলের মধ্যে দিয়ে এতদিন দৌড়ে এসেছেন কল্যাণ। এখন, পুরোনো কথা বলতে গিয়ে মনে হচ্ছিল, আবার সেই টানেলের মধ্যে দিয়ে তিনি দৌড় শুরু করেছেন।
কল্যাণ কথা বলার ফাঁকে ফাঁকে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছিলেন। কিন্তু একটা সময়ে আর চুমুক দিতে পারলেন না। তার ঠোঁট অকারণেই কাঁপছিল। গলার মধ্যে একটা রবারের বল ঢুকে পড়েছিল।
মিসেস ব্যানার্জি চায়ের কাপে প্রথম চুমুক দিয়েছিলেন। কিন্তু সেটাই হয়েছে প্রথম এবং শেষ চুমুক। তিনি মাথা নীচু করে কল্যাণের কথা শুনছিলেন। চোয়াল শক্ত করে কান্না চেপে রাখতে চেষ্টা করছিলেন। আর মনেপ্রাণে চাইছিলেন, অনি যেন এখন এ-ঘরে না আসে।
এক সময় কথা শেষ করলেন কল্যাণ। গলার কাছটায় কী একটা যেন বারবার আটকে যাচ্ছিল, গলা ধরে যাচ্ছিল–তাই কেশে গলা পরিষ্কার করে নিচ্ছিলেন। তবে নিজেকে কী অদ্ভুত হালকা লাগছিল, বুকের ভেতরটা যেন ফাঁকা হয়ে গেছে।
এই…এই আপনার জরুরি কথা! ভাঙাচোরা গলায় বললেন মিসেস ব্যানার্জি।
জরুরি কি না জানি না, তবে এই কথাগুলো আপনাকে আমি জানাতে চেয়েছিলাম। আমার মনে হয়েছিল, আপনার সঙ্গে আমার অবস্থার খুব একটা তফাত নেই। অবশ্য তখন তো আমি নয়ন বা অনমিতার কথা জানতাম না–
অচিন্ত্যর ব্যাপারটা আমি আঁচ করেছিলাম…খানিকটা জানতে পেরেছিলাম, তবে কোনও অশান্তি করিনি– শাড়ির আঁচল দিয়ে কান্না চাপতে চাইলেন মিসেস ব্যানার্জি, কিন্তু দু-একটা টুকরো ছিটকে বেরিয়ে এল বাইরে? আসলে আমি নয়ন আর অনির কথা ভেবেছিলাম…আমাদের কথা ভেবেছিলাম।
কল্যাণ তেতো হাসলেন, বললেন, জানেন, খুব নিশ্চিন্তে জীবন কাটাচ্ছিলাম আমি। ভেবেছিলাম, আমার জীবনে থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বারের কোনও জায়গা নেই। কিন্তু পরে বুঝেছি, এই থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বাররা সবসময় থেকে যায়…কোথাও না কোথাও থেকে যায়..হয় স্টেজের ওপরে, নয়তো উইংস-এর ফাঁকে, দর্শকদের মাঝে, অথবা গ্রিনরুমে। এরা থাকবেই।
মিস্টার চৌধুরী, এখন এ সব পুরোনো কথা তুলে কী লাভ! আমাকে আমার সংসার নিয়ে বাঁচতে হবে..আর আপনাকেও তো বাঁচতে হবে…আমাদের তো আর কিছু করার নেই কথার শেষ দিকটা কান্নায় মিশে গেল।
মিসেস ব্যানার্জির কষ্ট কল্যাণের মনে খুব একটা আচঁড় কাটতে পারছিল না। মিসেস ব্যানার্জির কথার জের টেনে তিনি বললেন, আপনার কি ধারণা আমি এখনও বেঁচে আছি! অজন্তার অ্যাকসিডেন্টের খবরটা শোনার পরই আমার স্বপ্ন শেষ হয়ে গেছে। সব শেষ হয়ে গেছে…
জীবনটা তো একটা স্বপ্ন। ঘুম ভাঙলেই সেই স্বপ্নের ইতি–মৃত্যু। স্বপ্ন শেষ হওয়ার মুহূর্ত থেকে কল্যাণ জীবনের মৃতদেহ কাঁধে করে ক্লান্ত পায়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। উদ্দেশ্যহীন সেই ঘুরে বেড়ানো হয়তো আজ শেষ হবে।
কাজলের লেখা চিঠিগুলো আমাকে একবার দেখাবেন? আর্ত খসখসে গলায় মহিলা অনুরোধ করলেন।
চিঠি! কল্যাণের মনে পড়ল কাজলের লেখা আন্তরিক চিঠিগুলোর কথা। কী সুন্দরভাবেই না কাজল আর অজন্তা নিজেদের আলাদা একটা ভালোবাসার জগৎ গড়ে নিয়েছিল। চোখের আড়ালে থাকা সেই জগতের কথা কেউ জানত না। সেই জগতে কল্যাণ মানে, মিস্টার চৌধুরি বা মিসেস ব্যানার্জির কোনও জায়গা ছিল না। ওঁরা ছিলেন বাইরের লোক। থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার।
কল্যাণের মুখের ভেতরটা তেতো হয়ে গেল আচমকা। তিনি চায়ের কাপের দিকে চোখ রেখে অসহায় সুরে বললেন, ওগুলো দেখে কী করবেন? শুধু শুধু কষ্ট পাবেন। ওদের ব্যক্তিগত ব্যাপার…আমাদের দেখা কি ঠিক হবে?
অজন্তাকে দেওয়া কাজলের ডায়েরিটার কথা মনে পড়ল কল্যাণের। ওদের ব্যক্তিগত বর্ণমালা কিছুই বোঝেননি ওঁরা। ওদের মনচিহ্নও বুঝতে পারেননি। একই চিহ্নের তো কতরকম মানে হয়। যেটা সাধারণ যোগচিহ্ন, সেটাকে সামান্য ঘুরিয়ে দিলেই হয়ে যায় গুণচিহ্ন অথবা কাটা চিহ্ন। কল্যাণ কল্পনায় নিজের মুখের ওপরে কুৎসিত এক কাটাচিহ্ন দেখতে পেলেন। মিসেস ব্যানার্জির মুখেও। অজন্তা আর কাজল যেন ওদের দুনিয়া থেকে গলাধাক্কা দিয়ে বের করে দিয়েছে এই দুটি প্রাণীকে, তারপর মুখের ওপরে দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। সেই অপমান আর গ্লানি নিয়ে ওঁরা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া চায়ের কাপ সামনে নিয়ে বসে আছেন।
